
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে লিখলেন তপশ্রী গুপ্ত
জীবন চলিয়া গেছে আমাদের, কুড়ি কুড়ি না হলেও সতেরো বছরের পার তো হবেই। সেই ২০০৮ সালে এসেছিলাম নম পেনে। আবার পা রাখলাম এবছর জুলাইতে। কম্বোডিয়ার রাজধানী শহর স্বভাবতই বদলে গেছে অনেক। অনেক না বলে বোধহয় আমূল বলা উচিত ছিল। উন্নতির পরিচিত মাপকাঠিতে নম পেন এগিয়ে গেছে বহু মাইল। আকাশছোঁয়া বাড়ি, বিলাসবহুল হোটেল, চোখধাঁধানো শপিং মল, এমনকী লাস ভেগাসের পুঁচকে সংস্করণ হলেও ক্যাসিনো পর্যন্ত। কোনো শহরের পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেলে এমনিতেই বাড়তি সৌন্দর্যের ছোঁয়া লাগে তার গায়ে। কলকাতার যেমন গঙ্গা আছে, নম পেনের তেমন আছে মেকং। তিব্বতের মালভূমি থেকে চীন, মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। নম পেনের বিখ্যাত রিভার ফ্রন্ট অবশ্য মেকং-এর শাখানদী টোনলে স্যাপের ধারে। একটু দূরেই মোহনা। বিকেল পড়তে না পড়তেই স্থানীয় মানুষ আর পর্যটকের ভিড়ে জমজমাট। উতল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে ক্রুজে চড়ে ঘুরতে পারেন, নদীর দিকে চোখ মেলে পেট ভরাতে পারেন ভারতীয় থেকে পাকিস্তানি, চাইনিজ থেকে কন্টিনেন্টালে, কিংবা এমনিই বসে থাকতে পারেন জলের ধারে বেঞ্চে, দেখবেন কেমন রংবেরংয়ের লম্বা লেজওয়ালা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে ছেলেমেয়ের দল। দীর্ঘদিন নম পেন প্রবাসী এক কৃতী বাঙালি আমাদের নিয়ে গেলেন মেকং-এর তীরে নির্মীয়মাণ এক নতুন টাউনশিপে। সেখানে তৈরি হচ্ছে অনেকগুলো আবাসিক টাওয়ার। মাঝারি মাপের ফ্ল্যাটের দামই ভারতীয় টাকায় দশ কোটির কাছাকাছি। ৪৮ তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, শুধু কম্বোডিয়ার লোক কিনবে ভেবে এত ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে? তিনি জানালেন, পৃথিবীর বহু দেশের দূরদর্শী ধনী শিল্পোদ্যোগীরা আসছেন নম পেনে বিনিয়োগ করতে। জানেন সবুরে মেওয়া ফলবে। তাছাড়া প্রতিবেশী মায়ানমারের অস্থির পরিস্থিতি সেখানকার ব্যবসায়ীদের বাধ্য করছে দেশ ছাড়তে। তাঁরা আসছেন একঘন্টা আকাশপথের দূরত্বে তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির টানে। আর কমবয়সীদের টানছে পশ্চিমী কেতায় ঝাঁ চকচকে জীবনযাপনের হাতছানি।

কিন্তু কম্বোডিয়ার আসল আর্থ- রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক কেমন? তথ্য বলছে, বিশ্বের দ্রুততম অর্থনৈতিক অগ্রগতির দেশগুলোর অন্যতম কম্বোডিয়া। রাজধানী শহরে যে পরিমাণ ছোট,বড়,মাঝারি ব্যাঙ্ক চোখে পড়ল, তাতে এর সপক্ষে যুক্তি জোরোলো হল। মূলত পর্যটন, রপ্তানি ও নির্মাণ শিল্পের ওপর ভর করে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশ। সত্তরের দশকে খেমর রুজ কম্যুনিস্ট শাসনে স্বৈরতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছিল যাকে। সম্প্রতি তেলের সন্ধান মেলায় অর্থনীতির পালে জোরালো হাওয়া লেগেছে। বিগ প্লেয়াররা যারা এতকাল কম্বোডিয়ার দিকে ঘুরে তাকায়নি, তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে। এবার আসি রাজনীতি প্রসঙ্গে। কম্বোডিয়ায় যা নেই তাই হল গণতন্ত্র। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র বা কনস্টিটিউশনাল মনার্কি ব্যবস্থায় পার্লামেন্ট রয়েছে ঠিকই, কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন দীর্ঘদিন অধরা। স্থানীয় মানুষ হাসতে হাসতেই বলেন, 'রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, এটাই তো দেখে আসছি। যতদিন দেশ উন্নতি করছে, চলুক এভাবেই।