তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
নববর্ষের সেকাল-একাল


টিন-এজারদের কথা ভাবুন, ভরা যৌবনের একটা গোটা বছর কেটে গেল দেখে তারা নিশ্চয়ই বিষণ্ণ। আবার যৌবনের দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্যে তো উল্লসিতও। হুতোম থাকলে বলতেন, মরুঞ্চে পোয়াতির বুড়ো বয়সে ছেলে হলে মনে যেমন মহান সংশ্রব উপস্থিত হয় সেইরকমই। ভূত যেমন ভ্যাংচাতে ভ্যাংচাতে চলে, বর্তমান তেমনি এল ন্যাংচাতে ন্যাংচাতে। এই দোটানায় নববর্ষ। তাও বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে দিন শুরু সূর্যোদয়ে। যখন সবে কাকভোরে বাবুদের মাথা একটু জুড়িয়েছে তখন এল নববর্ষ। আর হুতোমের বাবুরা তো তখন সদ্য ফিরেছেন সোনাগাছির রক্ষিতা মহল থেকে। তখনো নেশা কাটেনি। খোঁয়ারি তো দূরের কথা। এখনকার বাবু-বিবিরা অবশ্য নববর্ষে এক নতুন কালচার শুরু করেছেন। হোটেল মুলুকে গিয়ে থ্রি-স্টার-এ বসে কাঁসার থালায় পঞ্চব্যঞ্জন খাচ্ছেন, সার্ভ করছে লালপেড়ে শাড়ি পরা সেবিকারা। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাবু-সংস্কৃতিতে এসব হোটেল কালচার ঢোকেনি। বিশেষ করে অন্তঃপুরের বিবিদের নিয়ে পথে নামবেন, এতটা খারাপ অবস্থা তখনো অবধি তাঁদের বোধহয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নববর্ষের হুজুক মিস করবেন এমন পাত্রও তো নন তাঁরা। অতএব নববর্ষের আগের দিন হয়ে যাক কার্টেন রেজার আর সেটাই চড়ক। ধুন্ধুমার কাণ্ড।

তা সে যাক, এই বাবু কারা? বাবু বৃত্তান্ত নিয়ে তো অনেক কেচ্ছাই করা যায়। ঐতিহাসিক রেফারেন্স দিয়েও বলা যায় ইংরেজ বাংলা দখলের পরে, নন্দকুমারের ফাঁসি হওয়ার আগে, নিমকের দেওয়ানিতে বিলক্ষণ দশটাকা উপরি ছিল। আর নিমকের দেওয়ানি করে এক শ্রেণির মানুষ প্রচুর অর্থ কামাল। আর সেই জমানো টাকায় ফুটানি করার জন্যেই জন্ম নিল কলকাতার বাবু সম্প্রদায়। কলকাতার বনেদি বড়ো মানুষ। হুতোমের কথাতেই আবার ফিরে যাই, ‘বনেদি বড় মানুষ কবলাতে গেলে বাঙালি সমাজে যে সব জ্ঞানগুলো আবশ্যক,আমাদের বাবুর তা সমস্তই সংগ্রহ করা হয়েছে। বাবুর নিজের একটি দল আছে, কতকগুলি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, কুলিনের ছেলে, বংশজ শোত্রিয়, বৈদ্য, তেলী, গন্ধবেনে আর কাশারী ও ঢাকাই কামার নিতান্ত অনুগত, বাড়িতে ক্রিয়াকর্ম ফাঁক যায় না। বাৎসরিক কর্মেও দলস্থ ব্রাহ্মণদের বিলক্ষণ প্রাপ্তিযোগ আছে আর ভদ্রাসনে এক বিগ্রহ, শালগ্রাম শিলা আর আকবরী মোহর পরা লক্ষ্মীর খুটীর নিত্যসেবা হয়ে থাকে।’

বাবুর সংজ্ঞার এক লোকায়ত ভাবনাও আছে, যাকে এখনকার লব্জতে বলা যায় সাব অলটার্ন সংজ্ঞা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাবুর এই সংজ্ঞা ছিল মুনিয়া, বুলবুলি, আখড়াই গান, ঘোষ পোষাকী যশমী দান, আড়িঘুড়ি কাননভোজন এই নবধা বাবুর লক্ষণ। এই নটা লক্ষণ মিললে তবে গিয়ে তিনি বাবু। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এসে বাবু-র সংজ্ঞাও অনেক পাল্টাচ্ছে। সেখানে বাবু হলেন তিনিই, যিনি বেশ্যাবাড়ি ছড়িঘড়ি বিকেলে ফিটন গাড়ি/দিবানিশি ভাস লাল জলে। গান বাদ্য কর সার মাছ ধর রবিবার / চুল কাট আলবার্ট ফ্যাসানে ।

আর কমন পিপল, জনগণ, তাঁরাও কি থেমে আছেন ? দেখা যাক। এদিকে শহরে সন্ধ্যাসূচক কাঁসর ঘন্টা বাজল। সকল পথে সমুদায় আলো জ্বালা রয়েছে। "বেল ফুল"। "বরফ"! “মালাই।” চীৎকার শুনা যাচ্ছে। আবগারীর আইন অনুযায়ী মদের দোকানের সদর দরজা বন্দ হয়েছে অথচ খদ্দের ফিচ্চে না - ক্রমে অন্ধকার গা ঢাকা হয়ে এল, এ সময় ইংরাজি জুতো, শান্তিপুরে ডুরে উচুনী আর সীমলের ধূতির কল্যাণে রাস্তায় ছোটোলোক ভদ্দরলোক চিনবার যো নাই। তুখোর ইয়ারের দল হাসির গরবা এবং ইংরাজী কথার ছররার সঙ্গে খাতায় খাতায় এর দরজায় তার দরজায় ঢুঁ মেরে বেড়াচ্চেন। এঁরা সন্ধ্যা জ্বালা দেখে বেরুলেন আবার ময়দা পেসা দেখে বাড়ি ফিরবেন। মেছো বাজারে হাঁড়ি হাটা-চোরবাগানের মোড়, জোড়াসাঁকোর পোদ্দারের দোকান, নতুন বাজার, বটতলা, সোনাগাছির গলি ও আহিরীটোলার চৌমাথা লোকারণ্য - কেউ মুখে চাদর জড়িয়ে মনে কচ্চেন কেউ তাঁকে চিনতে পার্বে না। আবার অনেকে চেঁচিয়ে কথা কয়েন, কেশে, হেঁচে লোককে জানান দিচ্ছেন যে, ‘তিনি সন্ধ্যার পর দু'দণ্ড আয়েস করে থাকেন।”

তা, এইসব সোনাগাছির কমন পিপলস্ সিম্পটম কিন্তু দুটো শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও একই আছে। নেই শুধু বাবু কালচারের সেই আদি রূপ। বাবুর কাল শেষ হয়ে গেল, না আধুনিক বাবুৱা ঠেক পালটালেন এটাই প্রশ্ন। সাম্প্রতিককালের বাবুদের মদ্য সংস্কৃতির এক বড়ো ডেরা আধুনিক ড্যান্স বার, নববর্ষে যার চেহারাই আলাদা। ড্যান্স বার এখন শহরের আনাচে কানাচে, মফঃস্বলের দোর গোড়ায়। ড্যান্স-বারের চেহারাটা দেখা যাক আসুন এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে।

পর পর চেয়ারে বসে আছেন কয়েকজন তরুণী। একজনের হাতে মাইক্রোফোন, কন্ঠে উচ্চকিত গান। আরেকজন তালে তালে নাচছেন। সামনে হাজার টাকার বাণ্ডিল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বছর তিরিশের এক যুবক। ক্ষুধার্ত চোখ। এই বুঝি গিলে খায় নাচিয়েকে। একজন দর্শক আসন থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ল, তেরে বাহোঁ মে কিতনা তাকত দিখা দে শাকিল। সঙ্গে সঙ্গে হাতের নোট অন্ধ আবেগ হয়ে , হাসির জোয়ার হয়ে, ঝোড়ো বাতাসের পাতা হয়ে, নৃতারত মেয়েটির মাথার ওপর, মঞ্চের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ এইরকম চলতে থাকলে শাকিল ক্লান্ত হয়ে পছন্দের আসনে বসে পড়ল। এবার ওই লোকটিই গলা চড়িয়ে বলল, তু তো হার গয়া, হম তেওয়ারি, আর হামারা বারি। দেখ লেনা বলেই ৫০০ টাকার বাণ্ডিল থেকে নোট ওড়াতে লাগল।

রাত ক্রমশ বাড়ছে। উদ্দাম নাচ আর গানে। বাবু-রা এখনও আছেন। নেই শুধু হুতোম । এখন যেমন বাবু-সংস্কৃতির অন্যতম চিহ্ন প্রকাশ্যে নারীর উদ্দাম যৌননৃত্য দেখে টাকা ছড়ানো। নারীকে কেনা নিয়ে কমপিটিশন। এতো শুধু একবিংশ শতাব্দীর নব্য আধুনিকতা নয়। সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর বাবু-কালচারেও তো বেশ্যা রাখা ছিল সামাজিক প্রতিপত্তির লক্ষণ। আর নববর্ষে পুরোনো বেশ্যা বদল করে নতুন বেশ্যা নিয়োগ – সেও তো বাবু সংস্কৃতিই। শুধু নববর্ষের 'কার্টেন রেজার'- এ আজ যিনি নেই তিনি হলেন হুতোম, যিনি তাঁর নকশার ভূমিকায় লেখেন, ‘নকশাখানি আমি একদিন আরসি বলে পেস কর্লেও কর্তে পার্তুম। কারণ পূর্বে জানা ছিল যে, দর্পণে আপনার মুখখানি দেকে কোনো বুদ্ধিমানই আর্সিখানি ভেঙে ফেলেন না, বরং যাতে ক্রমে ভালো দেকায় তারই তদ্বির করে থাকেন, কিন্তু নীলদর্পণের হাঙ্গামা দেখে শুনে ভয়ানক জন্তুজানোয়ারদের মুখের কাছে ভরসা বেঁধে আর্সি ধরতে আর সাহস হয় না। সুতরাং বুড়ো বয়সে সং সেজে ঢং করতে হল।’

সং সেজে ঢং করার মতো সাহসী হুতোমের জন্যেই এই নববর্ষের প্রধান প্রার্থনা। সবশেষে, এ লেখার অনুলিখন বা সম্পাদনার দায়িত্ব অবশ্যই আমার। আজ সবকিছুই তো হুতোম এবং তাঁর সমসাময়িকদেরই। তাঁদের লেখার মূল বানানই কিছু কিছু রাখা হয়েছে এই লেখায়। তবে প্রলোভনে কোথাও কোথাও হয়ত রঙ চড়িয়েছি আমি। ক্ষমা প্রার্থনীয়।


Scroll to Top