তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মন-খারাপের বেলা

বাংলাদেশে যেটা ঘটল এ রকম একটা কিছু ঘটবে বলে ভয়ে ভয়ে ছিলাম।  আফগানিস্তানে তালিবানদের জয় নিশ্চয় নানা দেশের মৌলবাদী শক্তিকে নানা ভাবে উৎসাহ জুগিয়েছে।  সাধারণ মানুষ সচরাচর তাদের বাঁচামরা নিয়েই ব্যস্ত থাকে।  তাদের গায়ে ধর্মের একটা চিহ্ন থাকলেও আচার বিচারের বাইরে সে ধর্মের রাজনৈতিক শক্তি কতটা বাড়ল বা কমল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।  কিন্ত ধর্মের যারা প্রত্যক্ষ ব্যাপারী, এবং অনেক সময় রাজনীতিকেরাও তাদের হাত শক্ত করে, তারা ধর্মের একটা সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র খাড়া করার চেষ্টা করে।  যে চরিত্রের সর্বাঙ্গে এই হুমকি লেখা থাকে যে, আমরাই থাকব, আর কেউ থাকবে না। থাকলে আমাদের শর্তে, আমাদের পায়ের তলায় থাকবে।

  এই ধর্মের সঙ্গে অর্থ ও কামের যোগ আছে, মোক্ষের যোগ নেই।  আমি সংখ্যাগুরুর অংশ, আমার বিধর্মী প্রতিবেশীটির বেশ কিছু জমি আছে, পুকুর আছে, একটি দালানবাড়ি আছে, আছে সুন্দরী মানবসম্পদ, তা একে তাড়াতে পারলে বেশ ভালো হয়, এগুলো আমার দখলে আসে।  এই লোভ কখনও সাধারণ নাগরিককেও ধর্মের সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদে ঠেলে দেয়।  তখন বিধর্মীকে আঘাতের জন্য অস্ত্র তৈরি হতে থাকে।

  বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে এসেছিলাম।  না, আমাদের গ্রামে কোনো অত্যাচার হয়নি, মুসলমান প্রতিবেশীরা সবাই থেকে যেতে বলেছিল।  তবু সার্বিক ভয়ের আবহাওয়ায় অভিভাবকেরা থাকতে সাহস পাননি।  আমার চেয়ে হাজারগুণ ক্ষতি হয়েছে অনেক মানুষের, যাঁরা উদ্বাস্তু হয়েছিলেন।  হিন্দু, মুসলমান দুয়েরই।  সেই স্মৃতি অনেক কষ্টে ভুলেছে পরের সব প্রজন্ম।  বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা আবার মনে পড়িয়ে দেয় বুঝি।

  বাংলাদেশ আমার শুধু জন্মভূমি নয়, আমার এখনকার দেশের পরেই সবচেয়ে প্রিয় দেশ।  আমার অজস্র বন্ধু আছেন সেখানে, তাঁদের অধিকাংশই আমার ধর্মের নন।  সে দেশ আমাকে প্রচুর সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছে।  যেহেতু তার জন্মের ইতিহাস আমি গোড়া থেকে লক্ষ করছি, কখনও ক্ষীণভাবে তার সঙ্গে জড়িতও হয়ে গেছি, আমি জানতাম, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় জয় কোনো রূপকথার পরিসমাপ্তি নয়, যাতে and they lived happily ever after বলা যাবে।  জাতির পিতা শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, তার পরে দু-যুগের মতো গণতন্ত্রের বিনাশ তা প্রমাণ করেছে।  শুনেছি চিনে বিপ্লবের অশান্ত দিনগুলোতে মাও জে দংকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা বলুন তো, এই অস্থির সময় কেটে গিয়ে স্বাভাবিক অবস্থা কবে ফিরবে ?’  মাও নাকি বলেছিলেন, ‘কমরেড, বিপ্লবই হল সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা।’   

তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর প্রেরণা, শেখ মুজিবের অসাম্প্রদায়িক উদারনীতি বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়।  বাংলাদেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মে তার শিক্ষা প্রবাহিত রাখা দরকার।  সে চেষ্টা বাংলাদেশের জাগ্রত যুবশক্তি ও বুদ্ধিজীবীর দল অব্যাহতভাবে করে চলেছেন, কখনও সরকারকেও সচেতন করেছেন।  একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি থেকে ২০১২-র শাহবাগ আন্দোলন, সবই সাক্ষ্য দেয় যে এ বিষয়কে জনমতের সজাগ অংশ কখনও অবহেলা করেননি।  শেখ হাসিনার সরকারও মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দিয়েছেন--কাদের মোল্লা, গোলাম আজম আর সাকা চৌধুরীর মতো মানুষদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে। 

বাংলাদেশের মানুষ জানেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা সকলে নির্মূল হয়নি, বন্ধুর ছদ্মবেশ ধরে লুকিয়ে ছিল মাত্র।  এই  প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলো কখনওই অলস বসে থাকে না, হালও ছেড়ে দেয় না সহজে।  তার প্রমাণ পাওয়া যায় অভিজিৎ রায় ও অন্যান্য ব্লগারদের হত্যায়, অগ্রজ বন্ধুবর অধ্যাপক (বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) আবুল কাশেম ফজলুল হকের পুত্র দীপনের (অভিজিতের প্রকাশক)  হত্যায়, অধ্যাপক  আনিসুজ্জামানকে হত্যার হুমকিতে, আরও নানা ঘটনায়।  নানা আন্তর্জাতিক ঘটনা তাদের দুয়ারে ঢেউ তোলে, একদিকে অন্ধ বিশ্বাস তাদের দোলায়, অন্যদিকে বাস্তব প্রলোভন তাদের উন্মাদ করে তোলে।  তারা উপলক্ষ্যের অপেক্ষায় থাকে।  হয়তো তাদের কেউ সরকারেও ঢুকে পড়ে অন্তর্ঘাতের জন্য।  বিধর্মীদের উৎসব এই রকম একটি চমৎকার উপলক্ষ্য, যাতে বিঘ্ন ঘটানোর মতো উল্লাস আর কিছুতেই নেই। 

  ধর্মও রক্ষা করে না তো।  ধর্মের আমার নিজস্ব সংস্করণ চাই, তোমার সংস্করণ নয়।  তাই সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোককে যত মেরেছে, একই ধর্মের লোক পরস্পরকে সমান বা তার বেশি মেরেছে।  প্রাচীন ভারতে হিন্দুরা বৌদ্ধদের মেরেছে, ক্রুসেডে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের মেরেছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে খ্রিস্টানরা ই্হুদিদের মেরেছে, এখন ইহুদিরা মুসলমানদের মারে ; কিন্তু দুটি মহাযুদ্ধে খ্রিস্টানরা খ্রিস্টানদের মেরেছে অনেক বেশি।  পশ্চিম পাকিস্তানে আহমদিয়াদের খুন করা হয়েছে, ইরান-ইরাকের যুদ্ধে মুসলমানরা মুসলমানদের মারতে দ্বিধা করেনি।  মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ কম করেনি।  ভারতে রেফ্রিজারেটরে মাংস রাখলে কী মাংস না জেনেই বিপথগামী  হিন্দু খুন করে, লাভ জেহাদের দোহাই তুলে খুন করে মুসলমানদের, বাবরি মসজিদ ভাঙে, আবার পরিচয়ে হিন্দু হলেও গৌরী লঙ্কেশ, কালবুর্গি বা নরেন্দ্র দাভোলকার হিন্দুদের হাতে রেহাই পান না।  ধর্মের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় আসল যে সত্তা, যার নাম মানুষ।  একই রকম হাত-পা-চোখ-মুখ, একই সুখদুঃখ, একই রক্তের রং।  প্রায়ই তারা এক সঙ্গে উৎসব করে, একে অন্যের বিপদে প্রাণ দিয়ে ঝাঁপায়।  দেশভাগের সময় কত হিন্দুকে মুসলমান বন্ধুরা নিরাপদে সীমানা পার করে দিয়েছে, কত হিন্দু মুসলমানদের।  দুই সীমান্তে ‘মানুষে’র গল্পের কি শেষ আছে ?   তাই আমাদের মনে হয়, শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশে এক অসাম্প্রদায়িক প্রশাসন স্থাপনের জন্য বদ্ধপরিকর, এই কাজে ভারত সরকারের তাঁর পাশে থাকা দরকার।  তিনি দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আবার ফিরিয়ে আনার কথা ঘোষণা করেছেন, মনে রাখতে হবে এই অবস্থায় এ কম সাহসের কাজ নয়।  আমরা জানি, সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ হলেই যে নাগরিকেরা রাতারাতি ধর্মনিরপেক্ষ হবে এমন হবে না।  যে শিক্ষা ও যাপনস্বাচ্ছন্দ্য সচেতন নাগরিকের সংখ্যা বাড়ায় তা এই উপমহাদেশে আসেনি।  ভারতেও তা হয়নি।  কিন্তু সংবিধান প্রশাসনের দায়বদ্ধতার প্রতীক।  ভারত সরকারের যেমন শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেওয়া দরকার, তেমনই তার নিজের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকে ভারত সরকারেরও দেখা দরকার, বাংলাদেশের ঘটনার কোনো বিপরীত প্রতিক্রিয়া যেন ভারতে দেখা না দেয়।


Scroll to Top