
শাস্ত্রীয় সংগীতের মঞ্চে এমন কিছু সন্ধ্যা আসে, যা কেবল রাগ, তাল আর লয়ের পরিমাপে ধরা পড়ে না—সে কথা বলে সময়ের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে। গত শনিবার, ২৭শে ডিসেম্বর, লেক ক্লাবে অনুষ্ঠিত আয়ান আলি ও আমান আলির সরোদ-সন্ধ্যাটি তেমনই এক অভিজ্ঞতা হয়ে রইল—যেখানে উত্তরাধিকার, সাধনা ও সমকাল একসূত্রে বাঁধা পড়ল।
ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের পুত্র হিসেবে আয়ান ও আমান আলির কাঁধে রয়েছে সুবিশাল সংগীত-ঐতিহ্যের ভার। কিন্তু সেই উত্তরাধিকার তাঁরা বহন করলেন কোনও প্রদর্শন ছাড়াই—সংযত উপস্থিতি, বিনীত ভঙ্গি ও নিঃশব্দ আত্মবিশ্বাসে। প্রথম আলাপ থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠল, এটি কোনও জাঁকজমকপূর্ণ কনসার্ট নয়; বরং এক ধীর, গভীর সংগীত-সংলাপ।
আয়ান আলির সরোদে ছিল স্থৈর্য ও পরিমিতিবোধ। তাঁর আলাপ ধীরে ধীরে শ্রোতাকে রাগের অন্তর্লোকে নিয়ে গিয়েছে—কোথাও তাড়াহুড়ো নেই, কোথাও অকারণ উত্তেজনা নেই। আমান আলির বাজনায় যুক্ত হয়েছে অনুসন্ধানী উন্মুক্ততা—সুরের মধ্যে প্রশ্ন তোলার সাহস। দুই ভাইয়ের সরোদ কখনও একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি; বরং তৈরি করেছে এক পরিণত পারস্পরিক বোঝাপড়া, যেখানে সুরের মধ্যেই চলেছে নীরব কথোপকথন।
এই সন্ধ্যায় তবলার পাশাপাশি মৃদঙ্গমে ছিলেন ভি ভি রামমূর্তি। তাঁর মৃদঙ্গম পুরো অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গুরুগম্ভীর বোল, সংযত শক্তি ও নিখুঁত লয়বোধে তিনি কখনও সরোদকে অনুসরণ করেছেন, কখনও লয়ের ভিত নির্মাণ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য যে, এই সংগীতানুষ্ঠানে তবলিয়া পণ্ডিত তন্ময় বসুর সংগীতভাবনার প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে যিনি কেবল একজন অসামান্য শিল্পী নন, বরং এক গভীর সংগীত-চিন্তক হিসেবেও স্বীকৃত। আয়ান ও আমান আলির সরোদে যে সংযম, আত্মসংলাপ ও উত্তরাধিকারকে নতুন করে ভাবার প্রবণতা দেখা গেল, তা যেন তন্ময় বসুর চিন্তাধারার সঙ্গেই এক অন্তর্গত সংলাপে ছিল।
রাগ বিস্তারের পর অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মেজাজ নিল এক নতুন বাঁক। শাস্ত্রীয় কাঠামোর ভিতর থেকেই ধীরে ধীরে উঠে এল বিভিন্ন বাংলা গানের সুর। এতে শ্রোতাদের সঙ্গে সংগীতের দূরত্ব অনেকটাই ঘুচে গেল। পরিচিত সুরের ইশারায় শাস্ত্রীয় সংগীত আরও মানবিক ও সংলাপমুখী হয়ে উঠল অভিজাত ঘেরাটোপ ভেঙে।এই অংশের শিখর মুহূর্ত এল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, একলা চলো রে' গানটির সরোদ রূপায়ণে। দুই সরোদে সেই সুর ভেসে উঠল নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় উচ্চারণে।
এই পরিবেশনার পর দর্শক প্রতিক্রিয়াও ছিল ব্যতিক্রমী। করতালির আগে দেখা গেল এক দীর্ঘ নীরবতা—যেন শ্রোতারা একসঙ্গে সেই সুরের অর্থ আত্মস্থ করার চেষ্টা করছেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে এল প্রশংসার শব্দ।