
বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির দেশ ভারতবর্ষ তার আঞ্চলিক নববর্ষ বিভিন্ন উপায়ে উদযাপন করে। প্রতিটি অনন্য, তবুও উদযাপনের ভিন্ন-ভিন্ন চেতনার সমাহারে সজ্জিত এই উৎসব। অসম যেখানে বহাগ বিহুতে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে, পাঞ্জাব সেখানে প্রাণবন্ত নৃত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বৈশাখীকে স্বাগত জানায়, বাংলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা হয় এবং তামিলনাড়ু প্রার্থনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাধ্যমে পুথান্ড্রু উদযাপন করে। একইভাবে, কেরালার বিশু, ওড়িশার পানা সংক্রান্তি এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উগাড়ি তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্যে নববর্ষের আগমনকে চিহ্নিত করে। এই উদযাপনগুলি যদিও স্বতন্ত্র, তবুও সমৃদ্ধি, পুনর্নবীকরণ এবং ঋতু পরিবর্তনের আনন্দকে নির্দেশ করে।
বহাগ বিহুর সারমর্ম
বহাগ বিহু, অসমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা রঙালি বিহু নামেও পরিচিত। এই উৎসব অসমিয়া নববর্ষ এবং বসন্তের আগমনের সূচনা করে। এটি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পালিত হয়, যা আনন্দ, কৃষি সমৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। সাত দিনব্যাপী এই উৎসবটি ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত, নৃত্য এবং খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে অসমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।
উৎসব উদযাপন
বহাগ বিহু শুরু হয় ‘গরু বিহু’ দিয়ে, যা গবাদি পশুদের জন্য উৎসর্গীকৃত। কৃষকরা কৃষিকাজে গবাদিপশুর অবদানকে স্বীকার করে তাঁদের গবাদি পশুদের স্নান করিয়ে পুজো করেন। গবাদিপশুর গলায় নতুন দড়ি পরিয়ে তাজা শাকসব্জি খাইয়ে গান ধরেন—
‘লাও খা বেঙেনা খা বছৰে বছৰে বাঢ়ি যা
মাৰ সৰু, বাপেৰ সৰু তই হ'বি বৰ গৰু।’
(অর্থাৎ লাউ, বেগুন ইত্যাদি তাজা-তাজা শাকসব্জি খেয়ে তুই দিন দিন বড় হয়ে ওঠ। তোর মা- বাবা ছোট ছোট, কিন্তু তুই বড় গরু হবি)
গরু বিহুর দিন গবাদি পশুদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে এবং ফুলের মালা গেঁথে সজ্জিত করা হয়।
এর পরদিন পালিত হয় ‘মানুহ বিহু’, যা বাংলা নববর্ষের মতোই অসমিয়া নববর্ষেরও বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য হয়। এই শুভদিনে সম্পূর্ণ ভারত তথা অসমবাসী নতুন জামাকাপড় পরে বড়দের প্রণাম করেন তথা আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন, এবং পিঠে, নাড়ু ও জলপানের মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারও প্রস্তুত করা হয়।
তৃতীয় পর্যায়, ‘গোঁহাই বিহু'। এইদিন আগামী বছরের সমৃদ্ধির জন্য ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অসমিয়া ভাষায় ‘গোঁহাই’ শব্দের অর্থ ঈশ্বর। তাই এই তৃতীয় দিনের উৎসব সম্পূর্ণভাবেই ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত ।
চতুর্থ পর্যায়, ‘কুটুম বিহু', যেটি আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করার দিন। এদিন সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করতে ভোজের আয়োজন করা হয়।
পঞ্চম দিন ‘মেলা বিহু’-তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রকাশ্য উদযাপন অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেখানে খোলা জায়গায় বিহু নৃত্য এবং গান পরিবেশিত হয়, যা মুকলি বিহু নামে খ্যাত ৷
ষষ্ঠ পর্যায়, ‘চেনেহি বিহু’, যা প্রেমের প্রতীক হিসেবে উৎসর্গীকৃত একটি দিন। এদিন হাতে বোনা ‘গামছা’র মতো ‘বিহুয়ান’ নামক উপহার বিনিময় করে নিজের প্রেম বা শ্রদ্ধার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়।
সপ্তম পর্ব, ‘চেড়া বিহু’ হল বহাগ বিহুর সমাপ্তির দিন, যেখানে অসমিয়া জনগণ বিগত বছরের কথাকে স্মরণ করেন ও নতুন বছরের কর্মের জন্য সংকল্প গ্রহণ করেন।
বিহু গান, যা ‘বিহু গীত' নামে পরিচিত, পাশাপাশি এই ‘বিহু গীত'-এর সঙ্গে তরুণ-তরুণীদের দ্বারা পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী ‘বিহু নৃত্য’ উচ্ছ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলি প্রকৃতি এবং কৃষি জীবনের সঙ্গে সম্প্রদায়ের গভীর সংযোগকে প্রতিফলিত করে। ‘জলপান’: (ঐতিহ্যবাহী প্রাতঃরাশ) এবং পিঠা (চালের পিঠে) এবং নাড়ু (নারকেল ও চালের আটার তৈরি মিষ্টি) এর মতো সুস্বাদু অসমিয়া খাবার ছাড়া এই উৎসব অসম্পূর্ণ।
বিহুর প্রভাব এবং দেশব্যাপী অনুরণন
যদিও বহাগ বিহু অসমিয়া ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত, কিন্তু এর শেকড় রাজ্যের বাইরেও বিস্তৃত। ভারত জুড়ে প্রবাসী অসমিয়াভাষী মানুষের সাথে, দিল্লি, মুম্বাই এবং কোলকাতার মতো মহানগর ও অসমিয়া সম্প্রদায়ের দ্বারা আয়োজিত বিহু উৎসব উদ্যাপনের সাক্ষী রয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিহু নৃত্য পরিবেশনা এবং অসমিয়া খাবারের সম্ভার আনন্দঘন উৎসবমুখর এক পরিবেশ তৈরি করে ।
মূলত, অন্যান্য রাজ্যের মতো বহাগ বিহু বা নববর্ষ কেবল একটি উৎসব নয় বরং ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতিফলন। এটি নতুন সূচনার আনন্দ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সম্প্রদায়ের বন্ধনের উষ্ণতার প্রতীক, যা একে অসমের সীমানা ছাড়িয়ে একটি আনন্দমুখর উদ্যাপনে পরিণত করে।
‘অতিকৈ চেনেহৰ মুগাৰে মহুৰা
তাতোকৈ চেনেহৰ মাকু
তাতোকৈ চেনেহৰ ব'হাগৰ বিহুটি
নেপাতি কেনেকৈ থাকো।’
(অর্থাৎ মুগা কাপড় সেলাইয়ের সূতোর লাটাইটি খুব স্নেহের, তার চেয়েও স্নেহের কাপড় তৈরির মাকুটি। তবে সর্বাধিক স্নেহের ও প্রিয় বৈশাখের বিহু উদযাপন না করে কী করে বাঁচি।)
সবশেষে সকলকে অসমিয়া বহাগ বিহু ও বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। এই নববর্ষ আমাদের সকলের জীবনে আনন্দ ও প্রাণের স্পন্দনকে আরও উজ্জীবিত করুক। কবিগুরুর ভাষায় ‘বিভেদের মাঝে দেখো মিলন মহান'-এর সুর ভারত জুড়ে ধ্বনিত হোক, ভালো কাটুক সকলের নববর্ষ।