তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মহীরূহ পতনের বর্ষপূর্তি

                                

ঘটনা হোক কি দুর্ঘটনা, ক্যালেন্ডারের নিয়মে সবেরই বর্ষপূর্তি হয়। ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে। সেভাবেই প্রতিবেশী দেশে রাজনীতির একটি বিশাল অধ্যায়ের যবনিকা পতনের বছর ঘুরল। সে মহীরূহর শিকড়ে ঘুন ধরেছিল না আরো অনেক বছর তার ছায়া দেওয়ার কথা ছিল, তা বলবে সময়। কিন্তু বিশাল সেই বৃক্ষের আকস্মিক পতনে যে চমকে উঠেছিল গোটা বিশ্ব, তাতে সন্দেহ নেই। দেশব্যাপী কোটাবিরোধী 'ছাত্র' আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে গেলে এক বস্ত্রে পালাতে হয়েছিল গণ ভবন ছেড়ে। বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল 'বন্ধু' দেশ ভারতে। তাঁদের তো বটেই, তাঁদের প্রবাসী স্বজনদের, হতবুদ্ধি অনুগামীদের আশ্বস্ত করেছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘোষণা, যতদিন ওঁরা চাইবেন, এদেশে থাকতে পারবেন। যেভাবে একদা তাঁদের মাথায় ছাতা ধরেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ভারতেই আছেন, নিরাপদ আশ্রয় থেকে যোগাযোগ রাখছেন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের সঙ্গে ( যাঁরা জীবিত অথবা জেলের বাইরে আছেন)। এমনকী কর্মপন্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠকও করছেন। ওদিকে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন একের পর এক গুরুতর মামলা আনছে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁদের কারোকে হাতে পাওয়ার আশা আপাতত দূর অস্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী বেশ কিছুদিন সারা বিশ্বের কাছে নগ্ন করে দিয়েছিল বাংলাদেশের নৈরাজ্যের ছবি। সে গণ ভবনে আমজনতার বেপরোয়া লুটপাট হোক কি ছাত্র বিক্ষোভের নামে শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙা। বছর কাটলেও তার রেশ চলেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, রবীন্দ্র-নজরুলের অবমাননা, সার্বিক অবক্ষয়ের চিত্র। এর জন্য অনেকটাই দায়ী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার না থাকা। বহুদিন ধরে ভোটের দাবি জানাচ্ছে জনসাধারণ থেকে এমুহূর্তে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি পর্যন্ত (আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে) দেশের বড় অংশের মানুষ। আশার কথা, 'জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবসে' অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন, ফেব্রুয়ারিতে হবে জাতীয় নির্বাচন। তবে এখনও পর্যন্ত মৌলবাদী শক্তিকে দমনের কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারেননি ইউনূস। এই মাৎস্যন্যায় অবস্থায় যেকোনো দেশের অগ্রগতি থমকে যেতে বাধ্য।

কথায় বলে, পড়শির বাড়িতে আগুন লাগলে নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব নয়। ভারত তাই প্রথম থেকেই কড়া নজর রেখেছে বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যেভাবে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন ইউনূস, তাতে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। এবছর আবার বাংলাদেশ - চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর। সেই 'উদযাপনের' আবহে হানিমুন কতদূর পৌঁছয়, সেটা চিন্তার বিষয়। তার ওপর রয়েছে ভারতের চিরকালের মাথাব্যথার কারণ পাকিস্তানকে বুকে টেনে নেওয়া। ভারতের ছত্রছায়ায় যে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন শেখ মুজিবের মুক্তিযোদ্ধারা, তাদের সঙ্গে হাত মেলানো মানে ভারতকে অবজ্ঞা করা, এটা স্পষ্ট। বিশেষ করে পহলগাম কান্ড পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভারত-পাক সম্পর্ক যেখানে দাঁড়িয়েছে, তাতে শত্রুর বন্ধুর সঙ্গে মিত্রতা অবাস্তব। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ ভারতকে উপেক্ষা করে কতদূর এগোতে পারবে ইউনূসের বাংলাদেশ, সেটাই দেখার।

পুনশ্চ: জানতে ইচ্ছে করে, ঢাকার রমনা ময়দানে স্বাধীনতার প্রতীক ' শিখা অনির্বাণ' কি আজও জ্বলছে, নাকি নিভে গেছে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিষাক্ত বাতাসে?


Scroll to Top