তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আত্মহত্যার বিরুদ্ধে
পৃথিবীতে প্রায় সাত লক্ষ লোক আত্মহত্যা করছেন, আত্মহত্যার এটা সরকারি পরিসংখ্যান... আত্মহত্যা নিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর গড়ে সারা পৃথিবীতে প্রায় সাত লক্ষ লোক আত্মহত্যা করছেন, আত্মহত্যার এটা সরকারি পরিসংখ্যান। পৃথিবীর অনেক দেশে এখনো আত্মহত্যা চেষ্টাকে শাস্তি মূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আত্মহত্যা নিয়ে যেহেতু সামাজিক কলঙ্কের দিকটা প্রবল , ফলে আত্মহত্যা সঠিক সংখ্যাটা এর চেয়ে ঢের বেশি সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এঁদের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন যদি হন ভারতীয়, তাহলে সেই সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। সেদিক থেকে দেখলে আমাদের দেশে প্রতি তিন মিনিটে একজন আত্মহত্যা করছেন, আর সেই চেষ্টাটা করছেন এর বেশ কয়েক গুণ বেশি মানুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ আত্মহত্যা করেন মানসিক টানাপোড়েন আর যন্ত্রণার জন্য। মনোবিদরা বলেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ জীবনে কখনো না কখনো আত্মহত্যার কথা ভাবেন। তবে সেটা কখনোই সিরিয়াস হয়ে ওঠে না। দেখা গেছে, মানুষ আত্মহত্যা সিদ্ধান্ত নেন একা থাকা অবস্থায় যখন প্রচন্ড মানসিক চাপে আক্রান্ত হন এবং সেই চাপ থেকে বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পান না, এবং তার জন্য অবসাদে ডুবে যান , তখন। হতাশা, অবসাদের সময় যদি মানুষের মনে হয় তার বেঁচে থাকা না থাকায় কারো কিছু এসে যায় না, যন্ত্রণা মুক্তির অন্য আর উপায় নেই, মরে যাওয়াটাই এখানে তার বেঁচে ওঠা, তখনই সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। রাগের বশে কিংবা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কৈশোর-তারুণ্যের সময় কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে, হাতের শিরা কাটার চেষ্টা করে, ঘুমের বড়ি খেয়ে নেয়,তবে অন্যরা যাতে তাড়াতাড়ি তাকে বাঁচাতে পারে তার কিছু ব্যবস্থাও রাখে। এক্ষেত্রে সে অবশ্যই আশা করে, আশপাশের কেউ তাকে বাঁচাবে এবং তার সমস্যার দিকে নজর দেবে। আত্মহত্যার পেছনে মানসিক কারণগুলিই বড়ো। এর মধ্যে প্রধান হল, ভালোবাসার মানুষটিকে হারানো --- সেটা স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা যে কেউ হতে পারে। এর পর যে চেষ্টাটা বড়ো হয়ে দেখা যায় তা হল , কোনো বিষয়ে অকৃতকার্যতা, তা সে পরীক্ষায় হোক বা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাতেই হোক। আবার শারীরিক কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুখের যন্ত্রণা অথবা ক্যান্সার জাতীয় অসুখ, যা থেকে সারা জীবনের জন্য পরিত্রাণের আশা নেই বলে মনে করাটাও আত্মহত্যার কারণ হিসেবে আসতে পারে। অসুখ-বিসুখে নিরন্তর ভুলে চলা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই কথাটা অনেকটা খাটে। কৈশোর এবং তারুণ্যের গোড়ায় , যেটাকে বলা হয় টিন এজ, সেই সময় হরমোনের কারণেই আবেগ থাকে বেশি, ফলে চট করে অবসাদে আক্রান্ত হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। ছোটো ছেলেমেয়েরা বাড়ির অশান্তিতে সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয়। যে বাড়িতে বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকে সারাক্ষণ, বাবা-মায়ের একজন অথবা দুজনেই ছেলে-মেয়ের সঙ্গে ক্রমাগত দুর্ব্যবহার করে চলেন, বাবা মায়ের সেপারেশন বা ডিভোর্সের কষ্ট সহ্য করতে হয় যে সন্তানকে, নিতান্ত অবহেলায় অথবা বাবা-মায়ের প্রচন্ড প্রত্যাশা চাপ নিতে হয় যাকে ---- তার মধ্যে অবসাদ জাগা এবং আত্মহত্যার চিন্তা আসাটা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। ছেলেটি বা মেয়েটি যদি আবার খুব অন্তর্মুখী হয় , যদি বন্ধুবান্ধব না থাকে, মনের কষ্ট যদি কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে সে না পারে, তবে তার ক্ষেত্রে আত্মহত্যার হাতছানি এড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সের মধ্যেই মানুষ আত্মহত্যা করেন সবথেকে বেশি। খেয়াল করলে দেখবেন, এই সময়টায় মানুষকে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। চাকরি বা কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা, স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা , ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কিংবা তাদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়া, বাবা-মায়ের মৃত্যু --- এসবই অবসাদের কারণ হতে পারে। এর আবার একটা বংশগতির দিকও আছে। পুরুষদের তুলনায় মহিলারা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ বলে তাঁরা অবসাদে ভোগেন বেশি এবং আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন বেশি। পুরুষরা আত্মহত্যার চেষ্টা কম করলেও আত্মহত্যার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কৃতকার্য হয়ে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। এবছরের  এক বিশেষ আবেদনে সমাজের সব মানুষকে বেশি করে আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের বার্তা হল : আমরা যেন অনেক বেশি করে চারপাশের মানুষের দিকে তাকাই, তাঁদের মধ্যে কারোর আচরণে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন দেখলে, অথবা তাঁর মধ্যে অবসাদের লক্ষণ লক্ষ্য করলে তাঁর সঙ্গে কথা বলি, সমালোচনা না করে তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়াই । আত্মহত্যা যে কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ যে তাঁর কাছের মানুষদের ভয়ানক বিপন্ন করে তোলেন --- এই কথাটি অনেক বেশি করে সকলকে বলার সময় এসেছে। ভালোবাসা আর সমমর্মিতা যে একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষকে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে এনে জীবনে সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে এটা নিয়ে তো কোনো সংশয় নেই। অবসাদগ্রস্ত মানুষকে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায়  নিয়ে আসাটাও আত্মহত্যা-সচেতনতার অঙ্গ বলে ধরতে হবে।   লেখক পেশায় মনঃসমীক্ষক

Scroll to Top