
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণের বর্ষপূর্তিতে শ্রদ্ধা জানালেন রবীন দেব
কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনাবসান কমিউনিস্ট ও বামপন্থী আন্দোলনে এক বিরাট ক্ষতি। ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেও গত কয়েক বছর সক্রিয় রাজনৈতিক সামাজিক জীবন থেকে তাকে সরে আসতে হয়েছিল। শারীরিক অসুস্থতার জন্য গত কয়েক বছর তিনি কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন। দৃষ্টিশক্তিও কমে এসেছিল। তবুও গত ৮ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর পর পার্টি কর্মী সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে শোকানুভূতি চোখে পড়েছে তার তুলনা অল্পই। রাজ্য ও দেশের মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা তিনি পেয়েছেন।
বুদ্ধদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রায় ছয় দশকের। ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন,
১৯৬৭-র সাধারণ নির্বাচন; গণ আন্দোলনের একের পর এক ঢেউয়ে পশ্চিমবঙ্গ তখন উত্তাল। কলেজ স্ট্রিট তখন ছাত্র যুব আন্দোলনের ঝড়ের কেন্দ্র। আজ ভিড় করে আসছে অজস্র স্মৃতি, যার ভগ্নাংশও এ লেখায় উল্লেখ করা শক্ত ।
রাজ্য-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের মুখে বুদ্ধদা কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। বিশেষত বামপন্থী যুব আন্দোলনে তাঁর অবদান অনন্য। সিপিআই(এম)- এর পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন তিনি। প্রায় দু দশক ছিলেন রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ৩৮৫১ দিন। তারপরেও আড়ম্বরহীন ছিল তাঁর জীবন। পাম অ্যাভিনিউয়ের সরকারি আবাসনে, একতলায় দু কামরার ফ্ল্যাটেই তিনি সাড়ে চার দশক কাটিয়েছেন।
শুধু দাবি তোলা নয়, দাবির বাস্তবায়নের আন্তরিক চেষ্টা বামফ্রন্ট সরকারের অনন্য বৈশিষ্ট্য। যুব আন্দোলনের নেতা হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যে দাবি দাওয়া ও নীতির কথা সোচ্চারে ধ্বনিত করেছেন , বামফ্রন্টের মন্ত্রী হিসেবে এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গণ উদ্যোগ এবং গণসমাবেশ সৃষ্টি করে সেই নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি বেকারি- বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেছেন যুবক ফেডারেশনের নেতা হিসেবে। মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্য সরকারের সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, ছাত্র যুবসহ জনগণের ন্যায্য দাবি দাওয়া গ্রহণ করে সেগুলি রূপায়ণের চেষ্টা করেছেন। ছাত্রীদের সাইকেল প্রদান, গরিব মানুষকে দু টাকা কিলো চাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন সরকারই তো আসলে পথপ্রদর্শক।
শিল্পায়নে বামফ্রন্ট সরকার জোর দিয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে। কৃষির বিপুল সাফল্যই ছিল শিল্পায়ন কর্মসূচির ভিত্তি। নয়া উদারবাদ যখন কর্মসংস্থানহীন বা কর্মসংকোচনকারী উন্নয়নের তত্ত্ব ফেরি করছে, তখন কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়নের প্রকল্পই বামফ্রন্ট সরকারের জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতি। নয়া উদারবাদ আমাদের বোঝাতে চায় তথাকথিত বিকল্পহীনতার তত্ত্ব। বুদ্ধদা জোর দিতেন বিকল্প নীতির রূপায়ণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি বড়ো শিল্পেও জোর দেওয়ার কথা বলতেন। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস, বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সল্টলেকে ইলেকট্রনিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তি, ইস্পাত শিল্প, সিঙ্গুরে গাড়ি নির্মাণ শিল্পের পরিকল্পনা ---- সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোনোর চেষ্টা তিনি করেছেন। তিনি বলতেন, পা মাটিতে মাথা আকাশে রেখেই এগোতে হবে। বলতেন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে যে ফাঁক তা ভরাট করতে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক প্রচারে মানুষের সঙ্গে নিরন্তর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। সাফল্যের প্রচারের পাশাপাশি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও জনসচেতনতা বাড়ানো একটি নিরন্তর কাজ। বুদ্ধদা স্বপ্ন দেখতে পারতেন এবং স্বপ্ন দেখাতেও পারতেন। স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য একনিষ্ঠ উদ্যোগ নিতে পারতেন।
সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম প্রকল্পে বিরোধীদের একাংশের হিংসাত্মক বাধা আসলে সময়ের চাহিদাকে প্রতিহত করার চেষ্টা। সে কারণেই তা প্রতিক্রিয়াশীল পন্থা। ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর শালবনী ইস্পাত প্রকল্প উদ্বোধন করে ফেরার পথে মাওবাদীদের দায়িত্ব দেওয়া হয় মুখ্যমন্ত্রীকে হত্যা করার। মাওবাদী নেতা কিষেনজির মন্তব্য ছিল, ইঁদুর যদি তারটা কেটে না ফেলত তাহলে মাইন বিস্ফোরণ ঠিক সময়েই হত। সেবার মুখ্যমন্ত্রী প্রাণ রক্ষা পায় অল্পের জন্য।
বিশেষত সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের আমলে দেশি-বিদেশি অপশক্তির মদতে গঠিত রামধনু জোট যে ষড়যন্ত্রের জাল বিছায় তাতে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের উদ্যোগগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বুদ্ধদা যাতে মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলেন। সেই আঘাত নিয়েই তিনি আমাদের সকলকে ছেড়ে চলে গেছেন। নীতি ও আদর্শভিত্তিক লড়াই সংগ্রাম জারি রেখে তাঁর স্বপ্ন ও পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করাই হবে বুদ্ধদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর যথার্থ পথ।
শারদ সংখ্যা ‘দেশহিতৈষী’-তে প্রকাশিত নিবন্ধের অংশ বিশেষ পুনর্মুদ্রিত