
একদা তিনিই লিখেছিলেন, 'নীল রক্ত লাল হয়ে গেছে।' তিনি, অর্থাৎ ছেলেবেলা থেকেই ঠাকুরবাড়ির নির্ধারিত শৃঙ্খলাকে যিনি প্রশ্ন করতে শিখেছিলেন আত্মার গভীর থেকে, শিখে চিহ্নিত হয়েছিলেন কালাপাহাড় হিসেবে, সেই সুভো , মানে সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজেকে তিনি পরিচিত করতে ভালোবাসতেন প্রথাভাঙ্গা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মধ্যে দিয়ে। অলংকরণ নকশা মোটিফ এবং জ্যামিতিকে মিলিয়ে মিশিয়ে চিত্রকলায় তিনি এনেছিলেন অভিনবত্বের স্বাদ। নিজেকে চিনিয়ে দিতে ভালোবাসতেন প্রচলিত আভিজাত্যের চেনা ছকের বাইরে দাঁড়িয়ে। ঠাকুরবাড়ির প্রচলিত ধাঁচ ধরণের বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির বেশভূষা , আদব কায়দা, ছবি আঁকা , সাহিত্য ---- সব , সমস্ত ক্ষেত্রেই বৈশিষ্ট্য একটাই : কী পারিবারিক প্রবণতায়, কী বেঁচে থাকার ধরনে, তিনি কখনোই কোনো চলতি হাওয়ার পন্থী নন। আজ থেকে কয়েক দশক আগে, ’৮৫ সালে মৃত্যুর কিছু আগে-পরে, পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়ে সাড়া জাগিয়েছিল সুভো ঠাকুরের আত্মজৈবনিক রচনা
'বিস্মৃতিচারণা'। স্মৃতিচারণার চলতি পথের বাইরে সেখানেও তিনি স্মরণ করেছিলেন এমন অনেক কিছু, যা তখনো রীতিমতো শোরগোল ফেলেছিল। সুভো ঠাকুরের সেই প্রায় হারিয়ে যেতে বসা রচনাই গ্রন্থবদ্ধ করল ডিএম লাইব্রেরি। মাত্র ৯৬ পাতার এ লেখায় শুভ ঠাকুর চেয়েছেন একটা হারিয়ে যাওয়ার সময়কে তুলে আনতেই কেবল নয়, এনে তাকে এই সর্বস্ব হারানো কালের প্রেক্ষিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় দাঁড় করাতেও। মোট ছটি অধ্যায়ে বিভাজিত এ লেখায় সুভো ঠাকুর চেষ্টা করেছেন কতকগুলি প্রশ্নের জবাব দিতে। তাঁর মতে, একটা বাড়ি কিছুতেই বাঁচতে পারে না তার বাসিন্দাদের ব্যক্তিত্ব ব্যতিরেকে। তাঁর যুক্তি : ‘কোনো বিখ্যাত বাড়িই ইট চুন সুরকির সমষ্টি মাত্র নয়। তার প্রাণধর্ম অপ্রতিহত রাখতে হলে , অর্থাৎ তাকে জীবন্ত ধরে রাখতে হলে চাই সেই রকম সব মহান ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ --- যা, সুভো ঠাকুর মনে করেছিল, ওদের সেই জোড়াসাঁকোর ছ নম্বরে, ওদের জমানায় নিঃসংশয়ে নিঃশেষিত প্রায়।' আমাদের এই হৃতসর্বস্ব সময়ে, রাজ্যের সব ক্ষেত্রেই সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে সুভো ঠাকুরের এই কথাগুলি অন্য অর্থে প্রাসঙ্গিক মনে হওয়া যুক্তিযুক্ত অবশ্যই। অসামান্য বইটি পাঠকের মন ভরাবে যেমন, তেমনই এই সময়ের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট চিন্তার খোরাকও যোগাবে আশা করা যায়।
বিস্মৃতিচারণা : সুভো ঠাকুর, ডিএম লাইব্রেরি, ২০০ টাকা