তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
রাখিবন্ধন : কোথায় রাখব ?

                      

        

                       

এই হয়েছে এক জ্বালা !  সম্পাদকেরা আমাকে যে বিষয় দেন সবই দেখি গুগল লিখে বসে আছে।  ফলে লিখলেই লোকে বলবে, এহ্, লোকটা গুগল থেকে টুকে মেরে দিয়েছে।

 ফলে, আমি রাখিবন্ধনের ইতিহাস-পুরাণ কিছুই লিখব না। রাবণ বা দ্রৌপদী বা আলেকজান্ডারের বউ (কোন্ বউ ?) কাকে কোথায় কেন কবে রাখি পরিয়েছিল, এমনকি উনিশ শো পাঁচ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়ে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে নতুন করে রাখিবন্ধন উৎসবের সূচনা করলেন তার জন্য আপনারা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরোয়া’ ইত্যাদি পড়ে নিন বা মোটা সব রবীন্দ্রজীবনী—আমি তার মধ্যেও যাব না।  রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারটায় আমরা পরে আসব, কারণ এই ভদ্রলোক এমনসব কাজকর্ম করে রাখেন যে তাঁকে অস্বীকার করে কোনো কিছু করা আমাদের বাঙালিদের পক্ষে মোটের ওপর সম্ভব হয় না।  আপাতত শুধু এইটুকু, গুগল আর আপনাদের জানা মামুলি কথাই আপনাদের মনে করিয়ে দেব যে, এই শ্রাবণমাসের পূর্ণিমাতে রাখিপূর্ণিমা ব্যাপারটা এসে যায়।  কিন্তু বেচারা একা এই পূর্ণিমাকে দখল করতে পারে না, কারণ ওই দিনটার একটা ‘ওরফে’ও আছে।  তার নাম ঝুলনপূর্ণিমা।  কোনটা আগে, কোনটা পরে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না, বরং ভ্রাতা নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীকে জিজ্ঞেস করুন, সে এ সব ব্যাপারে আমাদের সকলের চেয়ে বেশি জ্ঞান ধরে।  এ দুয়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তাও আমি জানি না।  ঝুলন-পূর্ণিমাটা রাধাকৃষ্ণের প্রাইভেট ব্যাপার ছিল, অবশ্য সখীরা সঙ্গে ছিল তাদের—আর রাধা কৃষ্ণের সম্পর্কে মামিমা ছিল বলে শুনেছি, কাজেই রাধাকে কৃষ্ণের এ উপলক্ষ্যে রাখি পরানোর কথাই নয়।  আশা করি এদিন তারা মন দিয়ে দোলনাতে দুলতেই যথেষ্ট ব্যস্ত থাকে, দোলনা থেকে পড়েটড়ে গিয়ে কারও কোমর না ভাঙে, সেটাও সামলাতে হয়। 

  আমি গুগল বা চ্যাটজিপিটির নজর এড়িয়ে যা বলতে চাই তা হল এই তিথিটি একটি আচারকে আশ্রয় করে আছে।  তা হল যারা অরিজিনাল ভাইবোন, তাদের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ করার জন্য, সাধারণভাবে বোন ভাইয়ের হাতে একটি রঙিন সুতো বেঁধে দেয় এই কামনা করে যে, আমাদের বন্ধন দৃঢ থেকে দৃঢ়তর হোক।  পুরুষশাসিত সমাজে (যে সমাজ কোনো একটা ধর্মকে আশ্রয় করে থাকে তা পুরুষপ্রধান হতে বাধ্য)  সাধারণভাবে ভাইটি বোনকে নানা বিপদে-আপদে রক্ষা করবার প্রতিশ্রুতি দেয়।  বোন এরকম কোনো প্রতিশ্রুতি ভাইকে দেবে, সমাজ তার জন্যে বোনকে অনুমতি দেয়নি বা ক্ষমতায়ন করেনি।  অবশ্য রাখিবন্ধনের একটা পালটা আছে, তা হল ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া (পূর্ণিমার মতো কোনো ঘ্যাম তিথি নয়), সেটা হয় কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়াতে, অর্থাৎ কালীপুজোর দুটো তিথি পরে।  সেদিন বোন ভাইয়ের মঙ্গলকামনা করে, যমের দুয়ারে কাঁটা পড়ুক এরকম কোনো প্রার্থনা করে।  বোন বেচারার প্রার্থনার ক্ষমতা বা অধিকারটুকুই আছে, হাতে-ককলমে ভাইকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা আদৌ নেই বলা চলে।  তবে সেদিন ভাইয়ের খ্যাঁটটা অর্থাৎ পেটপুজো ভালোই হয় সেটা সবাই জানেন।  রাখিবন্ধনের দিন বোনের অত সব জোটে কি না সে সম্বন্ধে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। 

  এই রাখিবন্ধন উপলক্ষ্যে আমি পাঠকদের কাছে যে কথাটা বলতে চাই তা হল, রবীন্দ্রনাথ এই ব্যাপারটাকে একটা নিছক হিন্দুধর্মীয় আচার, বা ভাইবোনের মনোপলি থেকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন।  সেটা আমরা সবাই জানি।  তিনি ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নামে চমৎকার গানটি লিখেছিলেন, এবং ‘বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন’—সকলে এক হোক এই প্রার্থনা উচ্চারণ করেছিলেন। 

  শুধু বাঙালির ঘরে নয়, ভারতের নাগরিকদের অবস্থা যেখানে পৌঁছেছে, তাতে এই রক্ষাবন্ধনে সকলে আমরা যেন এক হই, এই প্রার্থনাটাই সর্বাগ্রে করা দরকার।  পৃথিবীর মানবসমাজে, ভারতের সমাজে বহু বিচ্ছেদ আছে, আমাদের রাষ্ট্রশাসকের দলবল আরও নানা বিচ্ছেদ তৈরি করে চলেছে।  ধনী-গরিবের মধ্যে রাখিবন্ধন কীভাবে সম্ভব, কবে সম্ভব হবে ?  ভারতের হিন্দুসমাজে জাতপাতের দীর্ঘস্থায়ী ভেদবিভেদ আছে, একদলের অপরাজনীতি হিন্দু-মুসলমানের বা অন্যান্য ধর্মের মধ্যে বিচ্ছেদের মন্ত্র পড়ে চলেছে, নগর আর গ্রামের বিচ্ছেদ, আদিবাসী আর অন্য নাগরিকদের বিচ্ছেদ—জানি না, এই রাখিপূর্ণিমা রাখিবন্ধনের মধ্য দিয়ে সব বিচ্ছেদ ঘোচানোর দিকে শক্ত শপথ আর সংকল্প নিয়ে এগোতে পারবে কি না।  এই রাখিপূর্ণিমাকে কি আমরা বলতে পারব, ‘ও রাখিপূর্ণিমা, মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষের পাশে দাঁড়াও !’  নইলে এই রাখিপূর্ণিমার ইতিহাস-পুরাণের ঘণ্ট দিয়ে আমাদের কী দরকার ?


Scroll to Top