বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
ব্যালটেই ধাক্কা: নাগপুর থেকে বেনারস
ব্যালটেই ধাক্কা: নাগপুর থেকে বেনারস

২৮ আসনের এমএলসি ভোটে ফাটল অহংকারের বেলুন

ব্যালটে বিরোধীদের সাফ করে দেওয়ার খাসায় বুঁদ হয়ে যারা এক্স হ্যান্ডলে উপহাসের ফুলঝুরি ছোটান, বাস্তব যখন চড় কষায়, তখন সেই আত্মতুষ্টির বেলুন যে কত দ্রুত ফেটে যেতে পারে, চার রাজ্যের এমএলসি নির্বাচনের ফল তার নিখাদ প্রমাণ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ—সকলেই ভেবেছিলেন ভোট তো ব্যালটে হচ্ছে, অতএব বিরোধীদের মুণ্ডপাত করার সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু নাগপুরের মাটি যখন দুলতে শুরু করল আর খাস উত্তরপ্রদেশে খোদ প্রধানমন্ত্রীর গড় চূর্ণ হল, তখন সেই উল্লাসের হাওয়া কোন গর্তে গিয়ে মুখ লুকিয়েছিল, তা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কথাটা এবারকার এম এল সি বা বিধান পরিষদের বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন নিয়ে। এমএলসি বা বিধান পরিষদ নির্বাচন মানে সাধারণ মানুষের হইচই নয়। এটি নিপাট রাজনীতির অন্দরমহলের খেলা। আইনসভার উচ্চকক্ষ বা আপার হাউসের এই সদস্যরা সরাসরি জনতা দ্বারা নির্বাচিত হন না। কোথাও বিধায়কদের ভোটে, কোথাও স্থানীয় সংস্থা বা পুরসভার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, আবার কোথাও আলাদা করে ভোটার তালিকায় নাম তোলা গ্র্যাজুয়েট ও শিক্ষকদের ভোটে নির্ধারিত হয় এই ভাগ্য। দেশের মাত্র ছয়টি রাজ্যে (উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা) টিকে থাকা এই শৌখিন ব্যবস্থার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, যখন ভোট হয়, তখন এর প্রতীকী ওজন মোটেও ফেলনা হয় না। বিশেষ করে যখন একে ২০২৭-এর বিধানসভা নির্বাচনের 'সেমিফাইনাল' হিসেবে দেখা হয়।

এবারের ২৮টি আসনের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যায় বিজেপি জোট ১৬টি আসন পেয়ে খাতা ভরানোর স্বস্তি পেলেও, আসল চিত্রটা মোটেও তাদের জন্যে আশাব্যঞ্জক নয়—বরং শাসক শিবিরের অন্ধ অহংকারকে ছবিটা সজোরে থাপ্পড় মারছে।

হ্যাঁ, কর্ণাটকে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে গোবলয় ও পশ্চিমের দুই প্রধান রণক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশ আর মহারাষ্ট্রের ফল কিন্তু দিল্লির ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

উত্তরপ্রদেশের ১১টি আসনের হিসাবটা স্রেফ সংখ্যায় মাপলে ভুল হবে। আপাতদৃষ্টিতে বিজেপি ৬টি আসন পেয়ে অবশ্যই ধরে নিতে পারে যে, তাদের আগের সংখ্যা অক্ষুণ্ণ আছে এবং এটি একটি 'নো প্রফিট নো লস' নির্বাচন। কিন্তু এখানেই আবার বিজেপির আত্মতুষ্টির চড়া দামও লুকিয়ে আছে! খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পার্লামেন্টারি কনস্টিটিউয়েন্সি বেনারস (বারাণসী) এবং খাস লখনউয়ে গেরুয়া শিবিরকে ধূলিসাৎ করে সমাজবাদী পার্টি যেভাবে আসন ধরে রাখল ও তৎসহ ছিনিয়ে নিল, তাতে যোগী প্রশাসনের সুশাসন ও সংগঠনের লম্বা লম্বা দাবির বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। বিজেপি নেতারা যতই একে 'প্রার্থীর ব্যক্তিগত জয়' বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, খোদ অখিলেশ যাদব যখন ব্যালট পেপারে এই জয়ের প্রসঙ্গ টেনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন যে, নরেন্দ্র মোদী যেখানকার সাংসদ, সেই বেনারস ও লখনউয়ে বিজেপি হেরেছে, তখন গেরুয়া শিবিরের অস্বস্তি যে কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তা তাদের ডিফেন্সিভ বক্তব্যে স্পষ্ট। আগ্রার দুই আসনেই সমাজবাদী পার্টির জয় প্রমাণ করে দিয়েছে, যাদব-মুসলিম বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে অখিলেশ যাদব যে 'পিডিএ' (PDA) সমীকরণ সাজিয়েছেন, তার সুফল এখন বাস্তবের জমিতে ফলতে শুরু করেছে। এই নির্বাচন সপার জন্য স্রেফ একটি জয় মাত্র নয়, এটি আগামী ২০২৭-এর যুদ্ধের জন্য এক মোক্ষম 'বুস্টার ডোজ', যা প্রমাণ করে দিয়েছে যে গোবলয়ে বিজেপিকে আর কোনোভাবেই 'ওয়াক ওভার' দেওয়া হবে না।

আর মহারাষ্ট্রের ক্ষত তো আরও গভীর। খোদ দেবেন্দ্র ফড়নবীশ এবং নীতিন গড়করির রাজনৈতিক আঁতুড়ঘর তথা আরএসএসের হেডকোয়ার্টার নাগপুরে কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ বনজারী যেভাবে নাগালের বাইরে থাকা ওই গ্র্যাজুয়েট সিটে টানা দ্বিতীয়বার গেরুয়া দুর্গ গুঁড়িয়ে দিলেন, তা বিজেপির জন্য স্রেফ পরাজয় নয়, রাজনৈতিক আত্মহত্যার সামিল। ফড়নবীশের যাবতীয় কূটকৌশল, সমস্ত দলবল আর ক্ষমতার আস্ফালন নাগপুরের মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। শিবসেনার সঙ্গে কোন্দল আর অন্তর্ঘাতের জেরে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর গড়ে এই চরম বিপর্যয় বুঝিয়ে দেয়, নাগাল ছাড়িয়ে যাওয়া ক্ষোভ এখন ভেতর থেকে ফালাফালা করে দিচ্ছে শাসক জোটকে।

বিহারেও প্রশান্ত কিশোরের 'জন সুরাজ' বা আরজেডি যেভাবে ফাঁক ফোকর দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল, তাতে এটা পরিষ্কার যে, হাওয়া কোন দিকে বইছে তা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না। এমএলসি নির্বাচনের এই ফল হয়তো রাতারাতি সরকার ফেলে দেবে না, ঠিক কথা। কিন্তু এটি শাসক শিবিরের অজেয় হওয়ার মিথকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

অহংকার যখন অন্ধ হয়ে যায়, তখন ব্যালটের ছোট বাক্সেও যে রাজনৈতিক সলিল সমাধি ঘটতে পারে, এই নির্বাচন কিন্তু তারই নিখুঁত এপিটাফ।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top