বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
ক্ষমতার পরিবর্তন, নাকি শেষের শুরু ? বিশ্বজুড়ে পটপরিবর্তনের নতুন হাওয়া
ক্ষমতার পরিবর্তন, নাকি শেষের শুরু ? বিশ্বজুড়ে পটপরিবর্তনের নতুন হাওয়া

এই মুহূর্তে সারা পৃথিবী যেন এক বড় পরিবর্তনের অপেক্ষায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, আর এখন বিশ্ববাসীর চোখ রয়েছে চতুর্থ তথা চূড়ান্ত উইকেটের পরীক্ষার দিকে।
সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী ইসরায়েলে দেখা যাচ্ছে, সেখানে কেউ একক বা পূর্ণ গরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। তবে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কার্যত হেরে গেছেন বলাই চলে। গতবার তাঁদের নেতৃত্বাধীন জোটের হাতে আসন ছিল ৬৮-৬৯ টি, যা কমে এখন নেমে এসেছে ৫৪-৫৫ -এ । অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোও প্রায় সমান সমান টক্কর দেবার মতো আসন পেয়েছে। এই সমীক্ষায় সবচেয়ে বড় ও আশ্চর্যজনক নাটকটি হল— সরকার গঠনের পুরো চাবিকাঠি এখন এসে ঠেকেছে প্যালেস্টাইনি ও আরব ইসরায়েলি

নাগরিকদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর হাতে। যে উগ্র ইহুদি শক্তি আরব ও মুসলমানদের প্রবল ঘৃণা করে আসছিল, আজ তাদেরই পার্লামেন্টে ১৭ থেকে ১৯টি আসন নিশ্চিত হয়েছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এখন পরবর্তী সরকার কার হাতে যাবে, তা নির্ভর করছে এই আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপরই। ইসরায়েলের কনস্টিটিউশন বা নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্টে ১২০টি আসনের মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ৬১টি আসন। প্রেসিডেন্ট এখন কোনো এক দলের নেতাকে সরকার গড়ার জন্য ৬ সপ্তাহ সময় দেবেন। ব্যর্থ হলে প্রতিপক্ষ সুযোগ পাবে। এই পুরো দরকষাকষির সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপাতত অবশ্য নেতানিয়াহুই দায়িত্বে থাকবেন। গাজায় গণহত্যা, পশ্চিম তীরে আগ্রাসন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দুর্নীতির জেরে ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন আজ সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে।

এক্ষেত্রে আরও যোগ করতে হয় — ইসরায়েলের ভেতরের ভাঙন। গত দুই বছরে গাজার যুদ্ধ, হোস্টেজ ক্রাইসিস, সেনা রিজার্ভিস্টদের বিদ্রোহ, এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার যে জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা নেতানিয়াহু করেছিলেন , তার বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ তেল আবিবের রাস্তায় নেমেছিল।

আজকের এই ৫৪-৫৫ আসনে নেমে আসা সেই গণ-বিক্ষোভেরই প্রতিফলন। সেখানে স্টুডেন্ট লিস্টের তরফে গাদি আইজেনকোট এবং তাঁদের গোষ্ঠী ছবিটাকেই উল্টে দিয়েছেন একরকম।
এই বিশ্বজনীন পটপরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ব্রাজিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থনপুষ্ট প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার নির্বাচনে লুলার দল কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, ব্রাজিলের নিয়মানুযায়ী ৫০% ভোট না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দফার ঠিক আগে বলসোনারোর শিবির থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে , তারা জিতলে ব্রাজিলের সংবিধানই বদলে ফেলবে। এই একটিমাত্র কথাতেই দেশের সাধারণ মানুষ ও তটস্থ ভোটাররা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে যে , দেশ বাঁচানোর জন্য সংবিধান রক্ষা করা জরুরি। ফলে , সবাই দলমত নির্বিশেষে লুলার পক্ষে ভোট দেয় এবং লুলা ৪৪ লাখেরও বেশি ভোটে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেন।
এখানে যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হল, লুলার জয়ের মডেলটাই আজ এক অর্থে একদম যাকে বলে গ্লোবাল টেমপ্লেট , সেটাই হয়ে গেছে। সংবিধান বদলে ফেলার হুমকি — এই একটা ভুলেই কার্যত ট্রাম্প-বলসোনারো মডেল মুখ থুবড়ে পড়েছে। মানুষ বুঝে গেছে, ভোটটা ব্যক্তির নয়, সংবিধান বাঁচানোর ভোট।


ব্রাজিলের পাশাপাশি সার্বিয়াতেও ঘটেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। সেখানে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচকে হটিয়েছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম বা জেনজিরা। নোভি সাদে রেলওয়ে স্টেশন ভেঙে পড়ার মতো দুর্নীতি ও ট্র্যাজেডির পরেই ফুঁসে ওঠে সার্বিয়ার ছাত্রসমাজ। সবচেয়ে বড় কথা, সার্বিয়াতে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা বা হিংসা ছাড়াই সুসংগঠিতভাবে সরকার পাল্টে দেওয়া হয়েছে। উঠে এসেছে ইলিয়া স্রোদানোভিচ এবং অন্যান্যরা । অথচ মূলধারার মিডিয়ায় এর আগে ফ্রান্স বা অন্যান্য জায়গার বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদের ছবি দেখিয়ে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল যাতে মানুষ আন্দোলনকে ভয় পায়।

হাঙ্গেরিতেও একই কায়দায় উগ্রপন্থী একাধিপত্যের পতন ঘটেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ আদালতের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এবং সংবাদমাধ্যমের মুক্তির জন্য সোচ্চার হয়েছেন।নেপাল-বাংলাদেশের জেনজি ফ্যাক্টর এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে বড় দিক নির্দেশ করছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। নেপাল ও বাংলাদেশের মতো মতোই সর্বিয়াতেও জেনজিরা দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্নীতি আর পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে টিকটক-ইনস্টাগ্রামই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তারা আর দলীয় পতাকা দেখে না, প্রশ্ন করে — চাকরি কোথায়, আদালত স্বাধীন কিনা?
আরেকটি বড় দিক এ মুহূর্তে হল মিডিয়া ম্যানিপুলেশনের মুখোশ ফাঁস। সারা বিশ্বে একটাই প্যাটার্ন — সোশ্যাল মিডিয়ায় আইটি সেল, গোদি মিডিয়া দিয়ে ভয় দেখানো, দেশ খতরে মে হ্যায় বলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ এই মডেলটা ধরে ফেলেছে। ইসরায়েলের আরব দলগুলোর ১৭-১৯ আসন পাওয়াই তার প্রমাণ । ঘৃণা দিয়ে আর ভোট আটকানো যাচ্ছে না।
এবং এটাই ভারতের জন্য ইঙ্গিত বলছেন ওয়াকিবহাল মহল। এই চতুর্থ উইকেটের পরীক্ষাটা আসলে ভারতের দিকেই আঙুল তুলছে। ইসরায়েল যদি দেখাতে পারে যে যুদ্ধ আর ধর্ম দিয়ে চিরকাল ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না, ব্রাজিল যদি দেখাতে পারে সংবিধান বদলানোর হুমকি দিলেই মানুষ একজোট হয়, তাহলে ভারতেও নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট, ইডি-সিবিআই-এর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে মানুষ একইভাবে জেগে উঠবে।


অন্য দিকে আমেরিকার আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন কেবল মার্কিন কংগ্রেসের ক্ষমতা নির্ধারণই করবে না, বরং তা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি জনসমর্থনেরও একটি বড় মাপকাঠি, যার ফলাফলের দিকে এই মুহূর্তে সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতির নজর ।


ইসরায়েলের নির্বাচন, ব্রাজিলের লুলার জয় কিংবা সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলন— প্রতিটি ঘটনাই এই মুহূর্তে একটি গভীর বার্তা দিচ্ছে। যতই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার করে বা মিডিয়া দিয়ে জনমত ঘোরানোর চেষ্টা হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে জনগণ ও গণতন্ত্রের জয় কিন্তু আটকানো যায় না। নেতানিয়াহুর এই সম্ভাব্য বিদায় কেবল আজ ইসরায়েলের সীমানায় আটকে নেই, এটি বিশ্বজুড়ে স্বৈরাতন্ত্রের অবসানেরই এক বড় মাইলফলক।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top