বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের সাফাইশুনানি ১৭ নভেম্বর
সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের সাফাইশুনানি ১৭ নভেম্বর

ইসি বনাম বিরোধীদের আইনি লড়াইয়ে কোন পথে গণতন্ত্র?

ভোটার তালিকা সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের আঙিনা—সব জায়গাতেই এখন রাজনীতির পারদ চরম সীমায়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী শিবির যে আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, তা এখন এক চূড়ান্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের দিকে এগোচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১৭ নভেম্বর, ২০২৬। এই আইনি দ্বৈরথই ঠিক করে দেবে দেশের সর্বোচ্চ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ আসলে কোন পথে চালিত হবে।
গোটা এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল যখন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ দোলা সেন এবং ইন্ডিয়া জোটের অন্যান্য নেতারা সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন। তাদের মূল অভিযোগ ছিল যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাকি দুই কমিশনারের মতামত বা সম্মতিকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলার জন্য নির্ধারিত ‘ফর্ম ৬’-এর নিয়মেও অনৈতিকভাবে বদল এনেছেন।


এই তীব্র অভিযোগের জবাবে গত ২৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন আদালতে একটি দীর্ঘ ২৪৮ পাতার পাল্টা হলফনামা জমা দেয়। সেই হলফনামায় কমিশন দাবি করে যে, এসআইআর সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা কমিশনের তিন সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল এবং ফাইলে দুই কমিশনারের যে ভিন্ন মত বা আপত্তির কথা বলা হচ্ছে, তা স্রেফ একটি স্বাভাবিক দাপ্তরিক পর্যালোচনার অংশ মাত্র।
এমনকি ‘ফর্ম ৬’ সংশোধনের সমস্ত অভিযোগও তারা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়।


তবে নির্বাচন কমিশনের এই সাফাইয়ের পরেও মূল বিতর্ক ও অস্বস্তি কাটেনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশের নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা আজ আর চাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
কমিশনের ভেতরের মতবিরোধ চাপা দেওয়ার খেলার প্রসঙ্গে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, কমিশন বারবার দাবি করছে ভেতরে অন্য কমিশনারদের সঙ্গে প্রধান কর্তাব্যক্তির কোনো দ্বিমত ঘটেনি, যা সম্পূর্ণ সাজানো ও মিথ্যা প্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
পর্দার আড়ালে তীব্র মতপার্থক্য ও আপত্তি থাকার পরও প্রকাশ্যে 'সব ঠিক আছে' এমন কৃত্রিম ঐকমত্যের ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। ফাইলে নোট, প্রশ্ন ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সেটাকে কৌশলে স্রেফ 'দাপ্তরিক প্রক্রিয়া' বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত, কমিশনের মধ্যে স্পষ্টতই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার এক গভীর প্রবণতা কাজ করছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কমিশনকে বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জোরালো প্রশ্ন করেছিল, যার কোনো যথাযথ বা সন্তোষজনক উত্তর কমিশন দিতে পারেনি। এর চেয়েও ভীতিজনক ব্যাপার হল, শুরুতে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছিল, ধীরে ধীরে সেগুলোকে নানা উপায়ে সরিয়ে বা রিমুভ করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। অনেক মৌলিক প্রশ্ন ও অসঙ্গতি ইতিমধ্যেই ফিল্টার বা সর্ট আউট করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, অর্থাৎ জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়াই এখন কমিশনের নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি লুকিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট প্রেক্ষিত ও পরিসংখ্যানের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের ৩৩ লক্ষ মানুষের ট্রাইব্যুনালের ব্যাপারটি এবং প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য যে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—তা নিয়ে আজ প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মতো বিষয়টাকে একপ্রকার পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
যখন সুপ্রিম কোর্টে এই নিয়ে সওয়াল-জবাব চলছে, তখন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সব জানে এবং পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। বিরোধীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি আদালতে জোরালো আবেদন জানিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট এবং ফাইল নোটগুলো যেন কোনোভাবেই নষ্ট করা না হয়। কারণ, এই গোপনীয় ফাইলগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সিদ্ধান্তগুলো আদৌ সর্বসম্মত ছিল কি না তার আসল সত্য।


গত ২৭ অক্টোবরের প্রাথমিক শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট মূল মামলার শুনানি স্থগিত রেখে আগামী ১৭ নভেম্বর দিনটি নির্ধারণ করেছে। ওই নির্দিষ্ট দিনে মূলত যে বিষয়গুলো আদালতের নজরে থাকবে, তার মধ্যে অন্যতম হল নির্বাচন কমিশনের দেওয়া হলফনামার বিপরীতে মামলাকারী বিরোধীদের পাল্টা যুক্তি বা রিযয়ান্ডার জমা দেওয়া, যার জন্য আদালত ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, দুই নির্বাচন কমিশনারের দেওয়া আপত্তিজনক নোট এবং ইসির গোপন ফাইলগুলো আদালত খতিয়ে দেখবে কি না, তা নিয়েও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হবে।
একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতায় রাজ্যের সিইও দপ্তরের আধিকারিকদের করা ১৬.১ লক্ষ আপিলের আইনি বৈধতাও ওই দিন পরিষ্কার হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে, ১৭ নভেম্বর উভয় পক্ষের লিখিত হলফনামা ও সওয়াল-জবাবের ওপর ভিত্তি করেই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ রায় দেবে যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সত্যিই একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নাকি এই মামলা খারিজ হয়ে যাবে।


যাই হোক, নির্বাচন কমিশনের অন্দরের এই মিথ্যাচার, প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং বিভিন্ন রাজ্যে চলা সুপরিকল্পিত নীরবতা আজ প্রমাণ করে যে, ভোট চুরির মডেলটা আজ আর আঞ্চলিক নেই। অন্ধ্রপ্রদেশের পৌরসভা থেকে উত্তরপ্রদেশের এমএলসি হয়ে বাংলার ভোটার তালিকা পর্যন্ত—একই স্ক্রিপ্টে গণতন্ত্রকে হাইজ্যাক করার মহড়া চলছে। নির্বাচন কমিশন যতই আইনি মারপ্যাঁচে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করুক না কেন, ১৭ নভেম্বরের সুপ্রিম কোর্টের শুনানি ও ফাইল পর্যালোচনার প্রক্রিয়া প্রমাণ করবে যে সত্য কার পক্ষে। গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন যেখানে স্বচ্ছ ভোটার তালিকার ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে এই লড়াইয়ের প্রতিটি মোড় এখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের গভীর মনোযোগের বিষয়।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top