সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধিসহ ১২ জন বিরোধী নেতা -নেত্রীর দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন একটি হলফনামা জমা দিয়েছে আদালতে। নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া এই হলফনামাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই হলফনামায় নির্বাচন কমিশন যা বলেছে, তা নিতান্তই দায় এড়ানো কথাবার্তা। নিজেদের যাবতীয় " অপকর্ম" ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। এই অভিযোগ যে একেবারেই মিথ্যে তা-ও বলা যাবে না। হলফনামায় চোখ বোলালেই বোঝা যাবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা মূল অভিযোগগুলি থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে এমন কিছু কথাবার্তা নির্বাচন কমিশন বলেছে, যা নতুন করে কমিশনকেই আবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের এই হলফনামার ফলে এসআইআরের পর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে যেসব অভিযোগ, প্রশ্ন এবং বিতর্ক উঠেছে, সেগুলিই আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। শুধু কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে তা-ই নয়, এসআইআরের ডাল মেঁ যে কুছ কালা হ্যায় সেই সন্দেহ যেন এবার সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।
এসআইআর পর্বের গোড়া থেকেই পশ্চিমবঙ্গ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রথম থেকেই এই অভিযোগ উঠেছে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এসআইআর পর্বে ৯০ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছিল। ভোট মিটে যাওয়ার পরেও যে এই বিতর্ক মিটেছে এমন নয়। ২৭ লক্ষ ভোটারকে এখনও বিচারাধীনের তালিকায় রাখা হয়েছে। এই ২৭ লক্ষের ভিতর মাত্র স্বল্পসংখ্যক যাঁদের আবেদনের বিচার হয়ে গিয়েছে, দেখা গিয়েছে তাঁদের ভিতর ৯৫ শতাংশই বৈধ ভোটার। এক বিচারপতি বলেছেন, এই ২৭ লক্ষের আবেদন পুরোপুরি শুনানি করতে ১২ বছর সময় লেগে যাবে।

এইরকম জট পাকানো এক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের আরও দুই কমিশনার বিবেক যোশী এবং সুখবিন্দর সিং সন্ধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবকে একটি চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠিতে এই দুই নির্বাচন কমিশনার অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের অন্ধকারে রেখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একাই যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সন্ধু এবং যোশীর অভিযোগগুলির ভিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে। সন্ধু এবং যোশী প্রশ্ন তুলেছেন, এসআইআরে বিবেচনাধীন ভোটারদের মধ্যে যে ১৬ লক্ষ ১০ হাজার ভোটার বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ছাড়পত্র পেয়ে ভোটার তালিকায় ঢুকে গিয়েছিলেন, যোগ্য ভোটার বলে যাঁরা চিহ্নিত হয়েছিলেন, তাঁদের নাম আবার বাদ দেওয়ার জন্য ট্রাইবুনালে কারা আবেদন করেছে? কারা সেই আবেদনে অনুমতি দিয়েছে? খুব যুক্তিসঙ্গত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যোশী এবং সন্ধু। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার পরেও বৈধ ভোটারদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার আবেদন কারা করছে এবং কার অনুমতিতে তা করছে এটা জানা গেলেই এসআইআরের অন্তরালে লুক্কায়িত রাজনৈতিক খেলাটি প্রকাশ্যে চলে আসবে। বিরোধীরা কমিশনের বিরুদ্ধে যে মামলাটি দায়ের করেছে, সেই মামলায় এই বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার দেখা যাক এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন কী বলেছে হলফনামায়। হলফনামায় নির্বাচন কমিশন যা বলেছে, তাতে নিজের দায় - দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটিই প্রকট হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, এই বিষয়টি তাদের সামনে আসেনি। তারা এই বিষয়টি জানে না। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারেরাই এই ১৬ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন ট্রাইবুনালে। অর্থাৎ , দিল্লির জ্ঞানেশ কুমার এসআইআর পর্বের এই কাণ্ডটির দায় পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (বর্তমানে রাজ্যের মুখ্যসচিব ) এবং সেইসময় তাঁর অধীনে কর্মরত রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকদের ওপর।

প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে দায় এড়াতে চাইলেই কি এড়ানো যায়? ১৬ লক্ষ ১০ হাজার ভোটার, যাঁরা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের বিবেচনায় বৈধ ভোটার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন, তাঁদের আবার ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাটি নিতান্তই ছেলে খেলা নয়? কে কোন ভোটে ভোট দিতে পারলেন কি পারলেন না -- প্রশ্নটি কিন্তু শুধু সেটি নয়। এই ১৬ লক্ষ মানুষ যে সংবিধান স্বীকৃত অধিকারটি অর্জন করেছেন, তাঁদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা মানে তাঁদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকারটিই কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা। কারা এই অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত, কী তাদের উদ্দেশ্য তা জানার সম্পূর্ণ অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।
এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দায়টা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করতে পারে না। এটা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী আধিকারিকরা জানেন, আমরা কিছু জানি না -- এটাও নির্বাচন কমিশন এত সহজে বলে ফেলতে পারে না। একটি রাজ্যে বৈধ ঘোষিত ভোটারদের ভিতর থেকে ১৬ লক্ষকে বাদ দেওয়ার আবেদন কেন জমা পড়ল, কারা সেই আবেদন জমা দিল, কোন যুক্তিতে এদের বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে -- এইসব কাজ যদি নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞাতসারেই কেউ বা কারা করতে থাকে, তাহলে তো কমিশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। আর যদি কমিশনের জ্ঞাতসারেই সবকিছু হয়ে থাকে, তাহলে এ প্রশ্নও ওঠে, কমিশন সব জেনেও এখন দায় এড়াতে চাইছে কেন? আসলে কমিশন, আরও ভালো করে বললে, জ্ঞানেশ কুমার পড়েছেন বড় প্যাঁচে। সেই প্যাঁচ থেকে বেরনোর জন্য এখন এমন সব কথা বলছে কমিশন, তাতে প্যাঁচ আরও এঁটে বসছে।
এই প্যাঁচ কেটে বেরনোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে কমিশন প্যাঁচে ফেলে দিয়েছে আর একজনকে। তিনি রাজ্যের প্রাক্তন নির্বাচন আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। রাজ্যের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক বলেছেন, এই বিষয়টি তিনিও কিছু জানেন না। অর্থাৎ দায়টি এসে পড়ছে মনোজ আগরওয়ালের ওপরই।

এসআইআর পর্বে মনোজ নির্বাচন আধিকারিকের দায়িত্বে ছিলেন। ১১ মে পর্যন্ত মনোজ এই দায়িত্বে ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের কথা যদি ধরতে হয়, তাহলে এই ১৬ লক্ষ ১০ হাজার ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদনের দায় প্রাথমিকভাবে মনোজ আগরওয়ালের ওপর এসে পড়ে। নভেম্বর মাসে যখন এই মামলার শুনানি হবে, তখন নির্বাচন কমিশনের হলফনামার সূত্র ধরে যদি মনোজ আগরওয়ালের নামটিও উঠে আসে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেক্ষেত্রে বিরোধীরা আদালতের কাছে মনোজ আগরওয়ালের বক্তব্য পেশের আবেদন জানাতেই পারেন। মনোজ তখন কী করবেন, সেটাও দেখার।
এই হচ্ছে সিস্টেমের সমস্যা। ওপরতলার সাহেব যখন ফেঁসে যান, তখন তিনি নিজের দায় ঝেড়ে ফেলে তা অধস্তনদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চান। জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং যেমন রাজ্যের নির্বাচন আধিকারিকের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিজেরা খালাস হতে চাইছেন। এরপর রাজ্যের নির্বাচন আধিকারিকরা কার ওপরে দায় চাপাবেন সেটাও দেখার।
তবে সব মিলিয়ে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং যথেষ্ট চাপে রয়েছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনও জোরালো যুক্তিই তাঁরা আর খাড়া করতে পারছেন না। বরং তাঁদের আচরণই প্রমাণ করে দিচ্ছে, কোনো অন্যায্য কাজকে আড়াল করতে চাইছেন তাঁরা। নিজেদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও তাঁরা ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছেন। আর সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে এসআইআর পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ হয়েছিল, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে উঠতে চলেছে।