পশ্চিমবঙ্গে যে পদ্ধতিতে ' বদলানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার' স্লোগান রূপায়িত হয়েছে, তার গণতান্ত্রিক ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আপাতত রাজ্য রাজনীতি সরগরম আসন্ন পুরভোট নিয়ে। সোমবার কলকাতা পুরসভার খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ২০৯টি ওয়ার্ডে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩২ লক্ষের বেশি। এক সপ্তাহের মধ্যেই, সম্ভবত ২ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের (delimitation) ফলে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০৯টি হয়েছে। এই খসড়া তালিকার মাধ্যমে শহরবাসী এই প্রথম মতো জানতে পারবেন, নতুন বিন্যাসে তাঁদের ওয়ার্ড নম্বর কত। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ওয়ার্ডের সীমানা এমনভাবে নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে প্রতিটি ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা ১২,০০০ থেকে ১৮,০০০-এর মধ্যে থাকে। কলকাতা, হাওড়া, বালি, হলদিয়া, ধূপগুড়ি, কালিম্পং এবং কার্শিয়াং—এই সাতটিতে পুর নির্বাচন হতে চলেছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা মেনে ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই এই সাতটি পুরসভার নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে, যাতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের আগেই নতুন বোর্ড গঠন করা যায়। জুন মাসে কলকাতা পুরসভার সদর দপ্তর পরিদর্শনের সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বোর্ড গঠিত হবে। নিয়ম অনুযায়ী, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ এবং ভোটগ্রহণের দিনের মধ্যে অন্তত ২৪ দিনের ব্যবধান থাকা আবশ্যক। যদি ২ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, তবে ৩০ নভেম্বরের আগেই অনায়াসে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা সম্ভব।

এদিকে পুর নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক চাপান উতোর তুঙ্গে। বিজেপি জানিয়েছে, তারা সব আসনেই প্রার্থী দেবে। প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে, পুরভোটে তাদের জয় অবশ্যম্ভাবী। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া সাংসদরা যাঁরা এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছেন এবং স্পিকার ওম বিড়লার স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁরা নাকি শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি লিখে বিজেপি-র টিকিটের জন্য প্রাক্তন তৃণমূল নেতাদের নাম সুপারিশ করেছেন। শোনা যাচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারী পুর নির্বাচনে অন্তত ২২ জন প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরকে, যাঁদের বিজেপি 'ভাল তৃণমূল' হিসেবে দেখে, তাঁদের বিজেপির প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। এছাড়া, আরও ১০-১৫ জন প্রাক্তন তৃণমূল নেতা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রার্থী করার বিষয়টি রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব বিবেচনা করছে। এছাড়াও ড্রপ বক্সের সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু তৃণমূলী টিকিট পাওয়ার আশায় বিজেপির দ্বারস্থ হবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। আসলে বিজেপি দল ভাঙানোর খেলাকে আরও জোরদার করতেই ড্রপ বক্সের ব্যবস্থা করেছে।

এর মধ্যেই প্রায় ৪,৫০০ আবেদনপত্র জমা পড়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই দলের নিচুতলার কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দলের ভেতরে বিদ্রোহের আশঙ্কা রুখতে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিজেপি একাই পুর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দল সেইসব নেতা ও কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেবে, যাঁরা কঠিন সময়ে দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং বছরের পর বছর প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে দলকে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছেন। শমীক ভট্টাচার্য এনসিপিআই-র সঙ্গে কোনও নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনাও খারিজ করে দিয়েছেন। কিন্তু তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়া সাংসদদের অন্যতম সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার বাড়িতে লক্ষ্মীপূজার দিন শুভেন্দু অধিকারীর যাওয়া নিয়ে জল্পনা চরমে উঠেছে। শুভেন্দু অবশ্য বলেছেন, 'সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও কোনও বিজেপি কর্মীর ক্ষতি করেননি, অন্তত আমার জানা মতে তো নয়ই। তাছাড়া, দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে তিনি এখন এনডিএ-র সঙ্গে রয়েছেন।' এনসিপিআই যোগদানের হোতা আরেক লোকসভা সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার পুর নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে আগে থেকেই সওয়াল করে আসছেন। সম্প্রতি সুদীপের কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন জায়গায় ‘ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ (এনডিএ) লেখা কিছু ব্যানার দেখা গেছে। এসব ব্যানারে এই প্রবীণ রাজনীতিকের পাশাপাশি শুভেন্দু, শমীক, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং এনসিপিআই-র সঙ্গে যুক্ত অন্য সাংসদদের ছবি ছিল। এই ব্যানারগুলো বিজেপি ও এনসিপিআই-র মধ্যে সম্ভাব্য জোট নিয়ে জল্পনা উস্কে দিয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীরা কিন্তু চান না নভেম্বরে হোক পুর নির্বাচন। তাঁদের বক্তব্য, তাহলে বিধানসভা নির্বাচনের মতোই ভোটের নামে 'প্রহসন' হবে। বর্তমান ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ভোট হলে অনেক বৈধ ভোটার বাদ পড়ে যাবেন, যাঁদের নাম তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। শুধু মাত্র কলকাতাতেই যার সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ। কালীঘাট তৃণমূল, বাম, কংগ্রেস ও নাগরিক সমাজের স্বাক্ষর করা যে স্মারকলিপি জমা পড়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনে, তাতে সংবিধানের ২৪৩জেডএ (243ZA) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে পুর নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করার তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাঁরা ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচন কমিশন আইন, ১৯৯৪’-এর ৫ নম্বর ধারার কথাও উল্লেখ করেছেন। এই আইনের একটি শর্ত অনুযায়ী, রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের বিবেচনায় বিধানসভা নির্বাচনের জন্য কার্যকর ভোটার তালিকাকে পুর নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা যেতে পারে। তাঁদের মতে, এই বিশেষ ক্ষমতা রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে পুর নির্বাচনের কাজে বিধানসভার ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা বা বাদ দেওয়ার অধিকার দেয়, যার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আপিল করা ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও রয়েছে।

এই পর্যায়ে নাটকীয় মোড় ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের নথি ছিনতাই প্রচেষ্টার অভিযোগ। নাম ও প্রতীক যুদ্ধে চূড়ান্ত শুনানির আগে দুই তরফের নথিপত্র জমা দেওয়ার শেষ লগ্নে ঋতব্রতপন্থীদের বিস্ফোরক অভিযোগ, সড়কপথে কলকাতা থেকে দিল্লি পাঠানোর সময় হরিয়ানায় ট্রাক ছিনতাইর চেষ্টা করে মমতা- তৃণমূল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দুই শিবিরের নথিই দিল্লি পৌঁছেছে। তবে নির্বাচন কমিশন আবারও দশ দিন বাড়িয়েছে সময়সীমা। যার অর্থ, পুর নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারির আগে কে 'আসল' তৃণমূল, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হবে না। এর ফলে আখেরে লাভ হবে বিজেপির আর ক্ষতি হবে কালীঘাট তৃণমূলের।