বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
ইভিএম ও এসআইআর-এর আঁতাত কি ভোট চুরির নতুন লাইসেন্স?
ইভিএম ও এসআইআর-এর আঁতাত কি ভোট চুরির নতুন লাইসেন্স?

আগামী দিনে কি তবে এভাবেই গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হবে?

দেশের নিচুতলার নির্বাচনগুলিতে একের পর এক রাজ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় ছিনিয়ে নেওয়া এবং বিরোধীদের নমিনেশন জমা দিতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনায় গণতন্ত্রের যে নগ্ন চিত্র আজ সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। অন্ধ্রপ্রদেশের ১০০টি পুরসভা ও নগর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। ওয়াইএসআরসিপির দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৭২ ঘণ্টার নমিনেশন উইন্ডোতে ১৯টি পুরসভায় তাদের ৬৩.৫ শতাংশ প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতেই দেওয়া হয়নি। কাদাপায় প্রার্থীর নমিনেশন ফর্ম ছিনিয়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি তিরুপতিতে নমিনেশন কেন্দ্রে পৌঁছানোর রাস্তাও আটকে দেওয়া হয়। এসইসির তালিকা বলছে, পুঙ্গানুরের ৩৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩২টি এবং চেয়ারপার্সন পদ সহ এনডিএ জোট ১৬ থেকে ১৭টি চেয়ারপার্সন পদে ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেছে। এই ভোট লুটের বিরুদ্ধে ওয়াইএসআরসিপি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে আদালত এসইসিকে ইলেকট্রনিক প্রমাণ পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয় এবং কাদাপা, রাজামপেট, মাইদুকুর ও তিরুপতি—এই চার শহরে নমিনেশন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করে ভোটগ্রহণ ১ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়।
ঠিক একই রাজনৈতিক কৌশল ও হুবহু পদ্ধতি প্রয়োগ করে অতীতে একদা পশ্চিমবঙ্গকেও 'বিরোধী শূন্য' করার রেকর্ড গড়া হয়েছে। অতীতে সিপিএমের আমলেও কিছু কিছু জায়গায় এমন ঘটনা দেখা গেলেও, পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় বিরোধীদের দমনের এই প্রবণতা এক চরম ও তীব্র রূপ নিয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ মনোনয়নই জমা দিতে পারেননি, তার আগেই তাদের জোর করে আটকে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে আলটিমেটলি ভোটাররা নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থী বা সঠিক লোক বেছে নেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছেন।


দেশের অন্দরে চলা এই ভোট চুরির প্রবণতা কেবল অন্ধ্রপ্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের এমএলসি নির্বাচনেও অনিয়ম, ভোট লুট ও হিংসার উলঙ্গ ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২৩ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের ১১টি এমএলসি আসনে (পাঁচটি গ্র্যাজুয়েট ও ছটি টিচার্স) ভোটগ্রহণ হয়। সরকারি তথ্যে মোট ভোটদানের হার ৫৫.২৪ শতাংশ দেখানো হলেও লখনউ গ্র্যাজুয়েট আসনে ভোট পড়ে মাত্র ৩৮.০২ শতাংশ। ভোটের দিন রাজ্যের অন্তত ৩২টি স্থানে গণ্ডগোলের খবর পাওয়া যায় এবং সমাজবাদী পার্টির পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা থেকে সুপরিকল্পিতভাবে নাম বাদ দেওয়া এবং বুথ দখলের গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। যদিও বিজেপির পাল্টা দাবি, তাদেরও ভোটারদের নাম বাদ গেছে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এর পাশাপাশি আগ্রা টিচার্স আসনের তিনটি বুথে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসন পুনরায় ভোটগ্রহণের সুপারিশ করে। এর ঠিক পরের দিন, ২৪ অক্টোবর বিহারে আটটি এমএলসি আসনে (চারটি গ্র্যাজুয়েট ও চারটি টিচার্স) ভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাড়ে পাঁচ লক্ষ ভোটার ও দেড়শ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শুধু ভোটগ্রহণই নয়, বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলেও তীব্র গণ্ডগোল ও সহিংসতার নগ্ন ছবি সামনে এসেছে, যা উত্তরপ্রদেশের মতোই নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে । প্রমাণ করেছে যে একনায়কতান্ত্রিক শক্তিগুলো ভোটকে কেবল একটি প্রহসনে পরিণত করেছে।

দেশের অন্দরে যখন স্বৈরাচারী কায়দায় গণতন্ত্রকে গলা টিপে ধরার এই বেপরোয়া আবহ চলছে, ঠিক সেই সময়েই বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের বজ্রকঠিন ছবি অন্য এক আশার বার্তা শোনাচ্ছে। ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় রাউন্ডে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নিয়ে ৮০ বছরের বামপন্থী প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা অতি দক্ষিণপন্থাকে সপাটে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে সার্বিয়ায় টানা বারো বছর ধরে চলা আলেকজান্দার ভুচিচের দক্ষিণপন্থী একাধিপত্য ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট 'স্টুডেন্ট লিস্ট'।
ব্রাজিল ও সার্বিয়ার এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে সবার নজর এখন আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে— অচিরেই অনুষ্ঠিত হতে চলা ইসরায়েলের নির্বাচন এবং আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে চলা আমেরিকার নির্বাচন।

বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন সাধারণ মানুষ স্বৈরাচার ও ভোট চুরির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তখন আমাদের দেশের মাটিতে এই পরিকল্পিত ভোট চুরির নায়কদের গদি যে এই গণজাগরণের ভয়ে থরথর করে কাঁপবে, এ কিন্তু কালের অনিবার্য ও চরম সত্য। এই প্রেক্ষিতেই খবর, সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এ রাজ্যে আসন্ন পুরসভা নির্বাচনে রাজ্যকে বিরোধী শূন্য করার ডাক দিয়েছেন। অর্থাৎ, গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরার কাজে এই যে রাজ্য আস্তে আস্তে তৈরি হয়ে উঠছে এটাই ঘটনা।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top