বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
আস্ত একটা রাষ্ট্রযন্ত্র বনাম স্রেফ একটি মেয়ে ভয়ে আসলে কার সিংহাসন কাঁপছে?
আস্ত একটা রাষ্ট্রযন্ত্র বনাম স্রেফ একটি মেয়ে ভয়ে আসলে কার সিংহাসন কাঁপছে?

সবকিছুই শুধুমাত্র একটি ২৯ বছরের মেয়েকে ঠেকাতে!

কনট প্লেসে কক্রোচ জনতা পার্টির মিছিলে যাওয়ার পথে মান্ডি হাউস থেকে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, রাতের অন্ধকারে থানায় বন্দি রাখার তামাশা, তারপর স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে BNSS-এর ১২৬ ধারায় দশ হাজার টাকার 'পিস বন্ড' আর জামিনদারের নোটিস — সব, সবকিছু একটা স্বাধীন কণ্ঠকে শৃঙ্খলিত করতে।

মজাটা হল, এর পরেও মেয়েটি সটান প্রশ্ন তুলে দাঁড়ায় — কোন সাহসে এই অপকর্ম করেও নির্বিকার থাকে এই কর্পোরেটের পায়ে কুঁকড়ে থাকা রাষ্ট্র? এই প্রশ্নটা করতেই সর্বশক্তিমান বলে দাবি করা সরকারের এত দুর্দশা যে, স্রেফ একটা মেয়েকে বাগে আনতে আস্ত পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ আর ম্যাজিস্ট্রেটকে কাঁপা কাঁপা পায়ে ময়দানে নামতে হয়!

বিশিষ্ট সাংবাদিক করণ থাপারের সঙ্গে এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে নেহা যে তথ্য ফাঁস করেছেন, তাতে ঠান্ডা রক্ত গরম হতে বাধ্য: মাস্ক পরে প্রতিবাদী সেজে পুলিশকর্মীরাই নাকি মানবশৃঙ্খল বানিয়েছিল, আর সুযোগ বুঝে পিছন থেকে আক্রমণ করে তাঁকে ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়! অর্থাৎ মান্ডি হাউসে স্লোগান আর কনট প্লেসে উস্কানির মেকি অভিযোগে তাঁকে কোণঠাসা করতে গিয়ে রাষ্ট্রই আজ উলঙ্গ।

অথচ মন্দির মার্গ থানার আদালতের বাইরে ৫০-৬০ জন ডানপন্থী গুন্ডা লাউডস্পিকারে প্রকাশ্যে হুমকি দিলেও সেই পুলিশ তাকে 'শান্তিভঙ্গ' বলে দেখে না!

পালাম থেকে আরকে পুরম — কোথাও গ্রেফতারি ওয়ারেন্ট দেখানোর হিম্মত হয়নি। যা দেখানো হয়েছে তা শুধু শান্তিভঙ্গের অজুহাতে বন্ডের নোটিস। দিল্লি হাইকোর্টে বিচারপতি সুব্রহ্মনিয়ম প্রসাদ আবেদন খারিজ করলেও পুলিশকে বাধ্য করেছেন নোটিসের ভিত্তি জানাতে। আর ২৪ অক্টোবর প্রেস কনফারেন্সে নেহা সাফ গর্জে উঠেছেন — শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয়, বন্ডে সই করা মানে গণতান্ত্রিক অধিকার বিসর্জন।

সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, মান্ডি হাউসে পৌঁছানোর দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, আর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে শুধু লেখা ছিল 'আজ পাঁচটায় দেখা হচ্ছে' — হিংসার লেশমাত্র ছিল না।

আসুন, এইবার দেখে নিই, যে টনটনে শিরদাঁড়াওয়ালা মেয়েটি একাই স্বৈরাচারের ভিত নাড়িয়ে দিল, তার শেকড় কোথায়!

উত্তরাখণ্ডের খাতিমায় জন্ম, শিলিগুড়িতে শৈশব। সেখানেই চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা, অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে পরিচয়। আজকের ছাত্র-যুব আন্দোলনের এই লড়াকু মুখই AISA-র জাতীয় সভাপতি, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের নেত্রী নেহা বোরা।

দিল্লি ইউনিভার্সিটির হিন্দু কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক, আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর, এখন জেএনইউ-র স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড এস্থেটিক্সে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজে পিএইচডি। জেএনইউ ক্যাম্পাসে আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত। ব্যক্তিগত জীবনে এর মূল্যও দিতে হয়েছে — দৃঢ় বামপন্থী রাজনীতির কারণে বাবার সঙ্গেও আজ কোনো কথা নেই। সেই মানসিক দূরত্বকে পিছনে ফেলে যখন তিনি রাজপথে দাঁড়ান, ছবিটা অন্যরকম হয়ে যায়।

ডিইউ-তে সামাজিক ইস্যুতে নাটক, পরে দিল্লির স্ট্রিট থিয়েটার গ্রুপ 'সংওয়ারী'। ২০১৯-এ সিএএ বিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে রাজনীতিতে আসা। এটাই স্বাভাবিক বিকাশ। কিন্তু রাষ্ট্র ঘাবড়ে যায়।

তাই NEET প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে টানা ২৩ দিনের অনশন, যেখানে সোনম ওয়াংচুক যোগ দেওয়ার পর আন্দোলন জাতীয় স্তরে আলোড়ন তোলে। তাই ২০২৬-এর অক্টোবরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে INDIA ব্লকের নেতাদের সঙ্গে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি আয়োজিত 'দিল্লি চলো মার্চ' আর সুপ্রিম কোর্টমুখী পদযাত্রায় তাঁর সাহসী অংশগ্রহণ। তাই ৭ আগস্ট রাঁচিতে বিধানসভার সামনে তাঁর গায়ে কালি ছোঁড়া। তাই ৫ অক্টোবর যাদবপুরে Gen Z কনভেনশনে তাঁর উচ্চারণ — "Left doesn’t fear or sell out"। প্রতিটি পদক্ষেপ শাসককে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়।

WhatsApp Image 2026-10-26 at 11.34.28 AM (1)

রাষ্ট্র চেয়েছিল পিস বন্ডের ফাঁদে ফেলে নেহাকে নিঃশব্দ করতে। কিন্তু করণ থাপারের শো-তে বা প্রেস কনফারেন্সে তিনি সেই ফাঁদটাকেই টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন। তাতেই পরিষ্কার, সরকার কেন তাঁকে এত ভয় পায়।

যখন প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখপাত্ররা এই তরুণীকে 'অ্যান্টি-ন্যাশনাল' বা 'আরবান নকশাল' বলে দাগাতে চান, তখন নেহা মনে করিয়ে দেন — যারা কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, নির্বাচন কমিশনকে পকেটে রাখে, তারাই আসল দেশদ্রোহী।

তারপর সাদা পোশাকে ২৪ ঘণ্টা পিছু নেওয়া, বারবার থানায় আটকে রাখা। সবটাই এক আতঙ্কিত স্বৈরাচারের নাভিশ্বাস।

রাষ্ট্র তাঁকে দমন করতে চেয়েছিল, উল্টে নিজের অতি-সক্রিয়তা দিয়েই তাঁকে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়ে দিয়েছে।

WhatsApp Image 2026-10-26 at 11.34.30 AM

সরকার নিজেই অজান্তে তাঁকে যে আসনে বসিয়েছে, সেখান থেকে নেহা বোরাকে আর একচুলও নড়ানো যাবে না। কারণ বন্ড বা জেলের তালা দিয়ে সত্যের মুখ বন্ধ করা যায় না। সেটা করতে গিয়ে তারা নিজেদের দেউলিয়াপনাতেই সিলমোহর দিয়ে দিয়েছে।

হ্যাঁ স্যার, এত আয়োজন — শুধুমাত্র একটি ২৯ বছরের মেয়েকে ঠেকাতে!



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top