বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
পুজোর গন্ধ এসেছে
পুজোর গন্ধ এসেছে


সেইভাবে বলতে গেলে, পুজো মানেই তো কেবল এক জায়গায় বসে ঘেমে নেয়ে যাওয়া বা প্যান্ডেল হপিং নয় ; পুজো মানে নিজের মতো করে একটু শ্বাস নেওয়া, নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করা। পাহাড় ডাকছে, সমুদ্র হাতছানি দিচ্ছে : এবারের পুজো হোক মব কালচার থেকে একেবারে শতহস্ত দূরে, নিজের শর্তে বাঁচার এক অন্য উদযাপন।
কিন্তু গত কয়েক বছর হল বাঙালির পুজোর ডেফিনিশনটা এতটাই বদলে গেছে যে তাকে আর উৎসব বলা চলে না। সপ্তমী-অষ্টমীর ভিড়ভাট্টায় কলকাতার মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ঢল নামলে তো মনে হয় যেন পরিস্থিতি আস্ত মব লিঞ্চিং-এর আকার নিয়েছে। তিল ধারণের জায়গা নেই, এসি বা ফ্যানের গরম হাওয়া, চারপাশের বিশৃঙ্খলা, মানুষের হুড়োহুড়ি, আর পুলিশের ব্যারিকেডের ধাক্কায় শহরের বুকে দমবন্ধ হয়ে আসে। তথাকথিত থিম পুজোর কর্পোরেট হুল্লোড় আর সেলফি তোলার ইঁদুরদৌড়ে বাঙালির সেই আন্তরিক আড্ডা, ধুনুচি নাচের মাদকতা আর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার ফুরসতটুকুও আর কোথায়?
আর ঠিক এই জায়গাতেই জন্ম নেয় এক তীব্র, বেপরোয়া পলায়নপরতা। দমবন্ধ করা এই মব-কালচার থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই এখন কলকাতার চেনা মায়ানগরী ছেড়ে পা বাড়াচ্ছেন একটু দূরের দিকে, যেখানে অ্যাসফল্টের পিচ গলে না, যেখানে মেঠো পথ আর পাহাড়ের বাতাস ফুসফুসে অক্সিজেনের জোগান দেয়।

লোকে বলে, বাঙালি নাকি পায়ের তলায় সর্ষে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তার কাছে পুজো মানে শুধু ঢাকের আওয়াজ আর খিচুড়ি ভোগ নয়, পুজো মানে পাহাড়ের কোলে মেঘের ওড়াউড়ি কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে নিরিবিলিতে আড্ডাও বটে, একই সঙ্গে। তাই পুজো এলেই বাঙালি ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে দেশের ভেতরে বা রাজ্যের অন্দরে কোথায় ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়বে, তার গুছিয়ে একটা আদ্যোপান্ত হিসেব করতে বসে যায়। ছুটি পেলেই এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত—অ্যাডভেঞ্চার আর নিরিবিলির খেলায় মেতে ওঠাটাই এখনকার নতুন এবং একমাত্র বাঁচার পথ।
শহরের এই কৃত্রিম কোলাহল ছেড়ে কম খরচে ও কম সময়ে শান্তিতে পুজোর কটা দিন কাটিয়ে আসার জন্য রাঢ় বাংলার পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ও বারন্তি এক্কেবারে মোক্ষম জায়গা। কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে এই রাঢ় বাংলা যেন এক অন্য দুনিয়া, অন্য ইতিহাস। লাল মাটির মেঠো পথ, শাল-পিয়াল-মহুয়ার জঙ্গল, আর মুকুটমণিপুরের কংসাবতী নদীর জলরাশির কোলে পাহাড়ের বুকে সূর্যডোবা দেখার রোমাঞ্চই আলাদা। এখানে এলে শহুরে ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়, মগজের জং ধরে যাওয়া চিন্তাগুলো ঝরে পড়ে।
পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছড়ানো রয়েছে লোয়ার ড্যাম, আপার ড্যাম, মারমং ঝরনা এবং পাখি পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি। এখানকার আদিবাসী সংস্কৃতির ছৌ নাচ, মাদলের থমথমে তাল আর গ্রামীণ প্রশান্তি মনকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এখানকার পাথরখচিত রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা আদিম সুষমা মনকে অদ্ভুত এক দার্শনিক স্থৈর্য দেয়।
এখানে থাকার জন্য বারন্তির বিখ্যাত 'বারন্তি রিসোর্ট' বা অযোধ্যা পাহাড়ের কোলের বনবাংলো ও বেশ কিছু আরামদায়ক বেসরকারি হোমস্টে রয়েছে। হোমস্টেগুলোর বারান্দায় বসে সন্ধ্যার সময় তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আদিবাসী সাঁওতাল গ্রামগুলোর গল্প শোনার অভিজ্ঞতা তুলনাহীন। পুজোর চারটে দিন যদি একটু মাটির কাছাকাছি, শেকড়ের টানে কাটাতে চাও, তবে লাল মাটির এই হাতছানি উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই।


পাহাড়ের টানে যদি মন ছুটে যায়, তবে উত্তরবঙ্গের বিকল্প কোথায় ? পাহাড়ের কোলে মেঘের ওড়াউড়ি আর কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়ার হাতছানি পেতে চান যাঁরা, তাঁদের মতে কিন্তু উত্তরবঙ্গের লাভা-লোলেগাঁও-রিশপের কোনো তুলনাই হয় না। তেরফাই চা বাগানের বুক চিরে চলে যাওয়া পিচঢালা রাস্তা, পাইন আর ওকের বনের ভেতর দিয়ে কুয়াশার চাদর সরিয়ে চলা—পুজোয় এই পাহাড়ি নস্টালজিয়া অবশ্যই যে দ্বিগুণ করে দেয়, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। লাভার মঠ, পন্ডেম ভিউ পয়েন্ট, কিংবা লোলেগাঁওয়ের হ্যাংইং ব্রিজ—প্রতিটি কোণায় কোণায় লুকিয়ে রয়েছে পাহাড়ের আদিম রোমাঞ্চ ও রহস্য। তবে কিনা এখানকার ঠান্ডায় উষ্ণতার ছোঁয়া পেতে লাভা বা লোলেগাঁওয়ের সরকারি ট্যুরিস্ট লজ কিংবা স্থানীয় মানুষদের পরিচালিত হোমস্টেগুলোতে আগে থেকেই বুকিং সেরে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিশেষ করে পাহাড়ের কোল ঘেঁষা কাঠের কটেজগুলোর বারান্দা থেকে পাহাড়ি উপত্যকার ভিউ এককথায় অতুলনীয়। সকালে মেঘের সমুদ্র ভেদ করে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় প্রথম রোদের ছোঁয়া লাগে, তখন মনে হয় সমস্ত যান্ত্রিক ক্লান্তি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে।
যাঁদের পুজোর ছুটিতে একটু লম্বা ক্যানভাস থাকে এবং রোমাঞ্চের নেশা যাঁদের এক জায়গায় স্থির থাকতে দেয় না, তাঁদের জন্য আবার হিমাচলের আদিম ও বরফ-ঠাণ্ডা উপত্যকা স্পিতি ভ্যালি এক অদ্ভুত জাদুকরি আবহ তৈরি করে। ট্রেকিং বা রোড ট্রিপপ্রেমীদের কাছে এটি স্বর্গরাজ্য হলেও সাধারণ পর্যটকদের কাছে এটি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। রোহতাং পাস বা কুঞ্জম পাস পেরিয়ে যখন এই মরু-পাহাড়ি উপত্যকায় পা রাখা যায়, তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল পিছনে ফেলে এক অন্য গ্রহ বা অন্য কোনো শতাব্দীতে চলে এসেছি।

স্পিতিতে থাকার জন্য কাজা বা কিব্বার গ্রামে বেশ কিছু চমৎকার কোজি হোমস্টে এবং প্রাচীন মনাস্ট্রি গেস্টহাউস রয়েছে। বরফঘেরা পাহাড়ের মাঝে মঠের প্রাঙ্গণে বসে লামাদের প্রার্থনা সংগীত শোনার মধ্যে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক উষ্ণতা রয়েছে। কিকম, তাঙ্গুয়ান কিংবা বিশ্বের উচ্চতম গ্রামগুলোর একটিতে রাত কাটানো এবং শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় কড়া ঠান্ডার সাথে পাঞ্জা লড়ার অভিজ্ঞতা পুরো ট্রিপটার গ্রাফকে যে একেবারে অন্য স্তরে নিয়ে যায়, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। এটি নিছক ঘোরাঘুরি নয়, এটি নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক নির্মম সাধনা।
পাহাড়ের পাশাপাশি সমুদ্রপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে পলায়নের সুনির্দিষ্ট পথ। ওড়িশার চিরাচরিত পুরী-কটকের চেনা ভিড় এড়িয়ে একটু নিস্তব্ধতায়, সমুদ্রের হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে সময় কাটাতে চান যাঁরা, তাঁদের জন্যে সাতপাদা ও গোপালপুর অন সি অবশ্যই দারুণ অফবিট অপশন। পুরীর সেই গিজগিজে বালুতট ছেড়ে একটু দক্ষিণ দিকে এগোলেই চিল্কা হ্রদের মোহনায় সাতপাদার জলরাশি। এখানকার মোহনায় বটলনোজ ডলফিনের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা একেবারে রোমাঞ্চকর।


অন্যদিকে, গোপালপুর একসময়ের ব্যস্ত বন্দর হলেও আজ তা এক শান্ত, নির্জন বিচ টাউন। এখানকার ঔপনিবেশিক আমলের ভাঙা বন্দর জেটি আর সমুদ্রের গর্জন এক অন্য নস্টালজিয়া তৈরি করে। গোপালপুরে থাকার জন্য সমুদ্রের ঠিক মুখোমুখি ওড়িশা ট্যুরিজমের পান্থনিবাস কিংবা নামী জেনুইন বিচ রিসোর্টগুলো দুর্ধর্ষ জায়গা। যেখান থেকে সারারাত সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে ছুটির আমেজ দারুণ উপভোগ করা যায়। ইলিশ ভাজা আর গরম ভাতের সাথে এই সমুদ্রস্নাত সন্ধ্যা বাঙালির মন ভালো করে দিতে বাধ্য।


আর সবশেষে চলুন ঘুরে আসা যাক উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়, লিভিং রুট ব্রিজ এবং অবিরাম বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝে। পুজোর কটা দিন পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার জন্য এক দুর্দান্ত ডেস্টিনেশন মেঘালয়ের মৌমালাই ও চেরাপুঞ্জি। এখানকার খাসি পাহাড়ের উপত্যকায় মেঘের লুকোচুরি আর ঝরনার জলের অবিরাম গান যেকোনো শহুরে মানুষকে উদাস করে দিতে যথেষ্ট। প্রকৃতির এই আদিম রূপ মানুষের সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে দেয়।


চেরাপুঞ্জির রেনফরেস্ট রিসোর্ট কিংবা মৌমালাইয়ের আদিবাসী ভিলেজ হোমস্টেগুলোতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা পুরো ট্রিপটার গ্রাফকে যে বলে বলে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে বাধ্য, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে তা নিছক বোকামি হবে। এখানকার লাইভিং রুট ব্রিজ ধরে ট্রেক করা, খাসি সংস্কৃতির ট্র্যাডিশনাল খাবার খাওয়া এবং মেঘের দেশে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি এক আজীবন মনে রাখার মতো স্মৃতি হয়ে থাকে।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top