
সম্পাদকের নির্দেশ, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নিয়ে লিখলেই হবে না, তুলে আনতে হবে সেই বুদ্ধদেবকে – যে বুদ্ধদেবকে ‘আমি দেখেছি’ । বিষয়টা আমার কাছে অত সহজ নয়। কারণটা জিনগত বলা যায় বা ভগবান-দত্ত। আমার জিন আমাকে তেমন হৃষ্টপুষ্ট স্মরণশক্তি দেয়নি। না দিয়েছেন ঈশ্বর। ফলে স্মরণশক্তিকে জিমনাসিয়ামে নিয়ে নানারকম অ্যাক্রোব্যাটিক ফ্লিপ করার পর সরু সুতোর মতো স্মরণশক্তির জল বেরোতে শুরু করলো।
বুদ্ধদেবের কথা বলতে গেলে মনে পড়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক নিপাট ভদ্রলোককে। তবে তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবি জ্যোতি বসুর মতো সদ্য ভাঁজ-ভাঙার অমলিন চিহ্ন বহন করত না। বুদ্ধদেবের পাঞ্জাবির পিঠ-হাতা প্রায়ই থাকত কোঁচকানো ... কবে যেন ইস্ত্রিটা করা হয়েছে! জ্যোতি বসুর কালো পাম্প শু চকচক করত, সদ্য পালিশ-স্নাত। আর বুদ্ধদেব লন্ডনেই যান বা শীতকালে দার্জিলিঙে বেরোন, পায়ে থাকত কোলাপুরী চটি। একমেবদ্বিতীয়ম কোলাপুরী। দার্জিলিঙের ঠান্ডায় তিনি পরতেন কেবল একটা হাতকাটা ছাই রঙের জ্যাকেট।
একদিন রাইটার্সে ওঁর ঘরে রিপোর্টারদের ডেকেছেন। আমি সেদিন ঠিক তাঁর উল্টোদিকের চেয়ারে বসার সুযোগ পেয়েছি। উনি ডেকেছেন বলে, আমার নোটবুকে লিখেছি বি বি। সেই লেখার ওপর আঙুল রেখে বললেন, বি বি নয়, হবে জে বি (জ্যোতি বসু), কারণ জে বি তাঁকে প্রেস কনফারেন্স করে ওইসব কথা বলতে বলেছেন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তর কায়দা ছিল অন্যরকম। তিনি বলতেন – মুখ্যমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে বলছি।

বামফ্রন্টের আমলে প্রায় সব মন্ত্রী ভালো পোশাক, ভালো খাওয়া, বিলাসের সামান্য ছোঁয়াও এড়িয়ে চলতেন। তাঁরা ভাবতেন, তাঁরা ‘পাবলিক’-এর জন্য। তাই পাবলিক লাইফও হবে আড়ম্বরহীন নিপাট, নিভাঁজ। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আমলে এসব কথা রূপকথার মতো শোনাত। শুভেন্দু অধিকারী সরকারকে এসব নিয়ে বিচার করার সময় এখনও আসেনি। তবে তাঁর একটা চেষ্টা আছে। সে যাক্ গে। বামফ্রন্টের মন্ত্রীদের ‘দুর্নীতির’ গল্প কখনই ‘জমে ওঠেনি।’ তাই কোনও মন্ত্রীর ‘সততা’র গল্পও তত হিট করেনি। সে সময়ে কোনও কোনও মন্ত্রীর হয়তো ‘সৎ’ বলে গর্ব ছিল। তাকে ‘সততার’ অহঙ্কার (মিহি করে) বললে কি ভুল হবে ? সে তো আর মমতার আমল নয়, যে কেউ দুর্নীতি না করলে তার নামের পাশে ‘সৎ’ স্ট্যাম্প পড়বে!
এই সৎ সঙ্গেও বুদ্ধদেব নজর কেড়েছেন। একসময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ ছিল। সিপিএম নেতা বা মন্ত্রী হয়ে তিনি যে টাকা পেতেন তা যৎসামান্য। তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য চাকরি করতেন। দুয়ে মিলে সংসারটা চলে যেত। কিন্তু মীরার কোম্পানির মাইনে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসারে অভাব দেখা দেয়। কিন্তু এই বিরল মূল্যবোধ-সম্পন্ন মানুষটি ইচ্ছে করলেই মীরাকে যে কোনও একটি সরকারি চাকরিতে ঢুকিয়ে দিতে পারতেন। সত্যি কথা বলতে কী, সিপিএম-এর হোল-টাইমারদের স্ত্রীদের অনেককেই কোনও না কোনও চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হত। নাহলে তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা বা সংসার চালানো মুশকিল হয়ে যেত (এটা দলের কথা, আমজনতার নয়)। কিন্তু এই ‘বাস্তব যুক্তি’-ও উনি গ্রহণ করেননি। তাঁর সংসারের অভাবের কথা তিনি কক্ষণও ‘বাইরের লোক’কে বুঝতে দেননি। নেতা বা মন্ত্রী হিসেবে তিনি যেটুকু টাকা পেতেন, তা ‘ফেরানোর উপায়’ তাঁর ছিল না। নেহাৎ ছাপোষা জীবন-যাপনেও তো টাকা লাগে! তাই তিনি উচ্চ-কন্ঠে কোনওদিন বলতে পারেননি, ‘আমি মাইনে নিই না’।
তাঁর জেদ ছিল পাহাড়-প্রমাণ। তিনি যখন তথ্যমন্ত্রী (কার্যত মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় প্রভাবশালী), তখন তথ্য সচিবকে নিয়ে জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়। তার জেরে তিনি পদত্যাগ করে, নন্দন থেকে এক অফিসারের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন (তিনি অফিস সেরে প্রায় প্রতিদিনই নন্দনে বসতেন, সিনেমা দেখতেন, বই পড়তেন বা সম-মনস্কদের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন)। দলের প্রধান অনিল বিশ্বাস ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনুরোধ-উপরোধ অগ্রাহ্য করে তিনি পদত্যাগপত্র তুলে নেননি। দলকে বিড়ম্বনায় ফেলেছিলেন – এ কথা যেমন বলা যায়, তেমনি বলা যায়, নিজের মতের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। যা বিশ্বাস করতেন, তা-ই করতেন। জেদী ছিলেন।

তিনি প্রচুর সিগারেট খেতেন। দিনে তিন-চার প্যাকেট। তাঁর আঙুলে আংটি ছিল না। তার বদলে দু আঙুলের ফাঁকে থাকত জ্বলন্ত সিগারেট (সম্ভবত ঘুমনোর সময়টুকু ছাড়া) । তিনি নিরন্তর সর্দি কাশিতে ভুগতেন। কাশিতে সিগারেট বিষ। কিন্তু তিনি জেনেশুনে বিষ পান করতেন। কারুর কথা শোনা তাঁর ধাতে ছিল না বলে, তিনি কিছুতেই সিগারেট ছাড়েননি। ডাক্তাররা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফল কী হল? সিওপিডি-র সিরিয়াস রোগী। কষ্ট পেতেন। গলায় ধোঁয়া গেলে সিওপিডি রোগীদের কষ্টের শেষ থাকে না। তিনি কষ্ট ভোগ করবেন, কিন্তু সিগারেট ছাড়বেন না!
জ্যোতি বসুর যখন ইরিটেবল বাওয়েল সিস্টেম হয়েছিল, তখন তিনি কিন্তু ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে খাওয়াদাওয়া করতেন। ভাজাভুজি ছিল তাঁর খুব প্রিয়, বিশেষত সিঙ্গাড়া। এমনকী দলীয় কাজে গাড়ি করে দূরে কোথাও গেলে দলীয় কর্মীরা রাস্তার ছোট দোকানে গাড়ি থামিয়ে সিঙ্গাড়া কিনতেন, জ্যোতি বসুকে দিতেন, নিজেরাও খেতেন। ইবিএস হওয়ার পর এমন স্বাদু স্ন্যাক খাওয়া তিনি জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছিলেন। সিগারেট নেশার বস্তু বলে সিঙ্গাড়ার সঙ্গে সিগারেটের তুলনা চলে না, একথা বললে হবে না কারণ এক্ষেত্রে বিষয়টা স্বাস্থ্যের, অসুখের।
সেই অসুখেই বুদ্ধদেব কাবু হয়ে পড়লেন। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট হেরে যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ আর সর্বজন-স্বীকৃত বিরোধী নেতা পেল না। তার আগের বছর জ্যোতি বসু মারা গেছেন। ২০০৬-এর ভোটের কিছুদিন আগে দলীয় প্রধান অনিল বিশ্বাস মারা গিয়েছিলেন। সত্যি কথা বলতে কী (যতই খারাপ লাগুক), স্বীকার না করে উপায় নেই, দলে সূর্যকান্ত মিশ্রের সেই প্রভাব ছিল না, যা (এখানে উল্লিখিত ) অন্য নেতাদের ছিল। তার মধ্যে গৌতম দেবেরও মস্তিষ্কে জটিল অপারেশন হয়েছিল। সেসবই ছিল ঈশ্বরের মার। বুদ্ধদেব যদি নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতেন, তাহলে বাংলায় দল এত দ্রুত প্রভাব হারাত না।
আপনারা হয়তো বলবেন, ঈশ্বরের কথা অপ্রাসঙ্গিক, ভুল। আমি বলব, কমিউনিস্টরা ঈশ্বর মানেন না বলে আমি মানি না, তা নয়। বুদ্ধদেব কমিউনিস্ট, ঈশ্বর বিশ্বাস করতেন না। আমি তো করি। তাই ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোন দোষে তুমি বুদ্ধদেবকে এভাবে বিছানা-বন্দী করে দিলে?’

তাঁর জবাব,‘ওকে যে সবাই সিগারেট খেতে বারণ করেছিল, ও কি শুনেছিল? ওর ফুসফুসে সমস্যা ছিল। তবু দু’ আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট কখনও নিভত না।’
আমি পাল্টা জবাব দিতে পারিনি। পাম অ্যাভিনিউয়ে ডাকটিকিটের মতো ছোট ঘরে একজন গড়পড়তা উচ্চতার মানুষ থাকতেন, যাঁর ভালবাসা ছিল বই আর ফিল্ম। শেষের দিকে চোখ দুটোও তাঁকে আর তেমন সাথ দিত না। তাই তাঁর চোখ দুটি বই পড়া, ফিল্ম দেখা – দুই প্যাশন থেকে তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সারাটা দিন তাঁকে শুয়ে থাকতে হত।
আমি ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বললাম,
‘তবুও দেখো, একতলার ওই একচিলতে ফ্ল্যাটটা একটা মন্দির হয়ে থাকবে। সততার মন্দির। মূল্যবোধের মন্দির। শক্তপোক্ত মেরুদন্ডের মন্দির’। ওই মন্দিরে তোমার পুজো হবে না। না-ই বা হল। মানুষ ওই একচিলতে ফ্ল্যাটটিকে মেরুদন্ডের মন্দির, সততার মন্দির হিসেবে মনে রাখুক।
ঈশ্বর, আমার এই এট্টুখানি প্রার্থনা তুমি রাখতে পারবে না?
জেন Z -র জন্য।