বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
ভারতের রাজনীতি কোন সন্ধিক্ষণে
ভারতের রাজনীতি কোন সন্ধিক্ষণে

বিশিষ্ট ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ তাঁর 'ইন্ডিয়া আফটার গান্ধি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও পাশ্চাত্যের বেশ কিছু ভারত - বিশেষজ্ঞ এই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত ছিলেন। বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন সংস্কৃতি, বিভিন্ন জাতি -গোষ্ঠী সমন্বিত এই দেশটি শেষ পর্যন্ত কি অখণ্ড থাকতে পারবে --- নাকি তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে -- এই আশঙ্কাই তাঁরা প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ডন টেলর, ভারত বিশেষজ্ঞ এক ব্রিটিশ সাংবাদিক লিখেছিলেন," the key  question remains : can India remain in one piece -- or will it fragment?....When one looks at this vast country and its 524 million people, the 15 major languages in use, the conflicting religions, the many races, it seems incredible that one nation could ever emerge." মনে রাখতে হবে, টেলর যখন একথা লিখছেন, তখন ভারতের স্বাধীনতার দুটি দশক পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। চার - চারটি সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে ভারতে। তৎসত্ত্বেও পাশ্চাত্যের ভারত - বিশেষজ্ঞদের মন থেকে আশঙ্কা দূর হয়নি। শুধু পাশ্চাত্যের ভারত বিশেষজ্ঞদের কথাই বা বলি কেন। এই দেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিদ এবং বিশ্লেষকও স্বাধীনতার পর ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তার একটা বড় কারণ স্বাধীনতা লাভের ঠিক প্রাক্ মুহূর্তটিতে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার সাক্ষী থাকতে হয়েছে এই দেশকে। তার মাশুল গুণতে হয়েছে দেশের পশ্চিম অংশ এবং পূর্ব অংশের বাসিন্দাদের। ফলত সবার মনেই এই সংশয় ছিল, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা, গোষ্ঠী, জাতি,বর্ণ সমন্বিত এই দেশটিকে শেষ পর্যন্ত কি এক সূত্রে গেঁথে রাখা যাবে?

এই সমস্ত আশঙ্কাকে ব্যর্থ করে ভারত কিন্তু তার যাবতীয় বৈচিত্র্য এবং বৈপরিত্য নিয়ে এক সূত্রেই গ্রথিত থেকেছে। এই যে ভারতবর্ষের মতো একটি সুবৃহৎ দেশকে, যে দেশে প্রদেশভেদে মানুষের ভাষা এবং সংস্কৃতি পালটে যায়, এক সূত্রে গেঁথে রাখা সম্ভবপর হয়েছে একটিই কারণে। তা হল, স্বাধীনতার লগ্নে যে জাতীয় নেতৃত্বের হাতে ব্রিটিশ দেশের শাসনভার অর্পণ করেছিল, সেই নেতৃত্ব প্রথম থেকেই ভারতে উদার গণতন্ত্র এবং সহনশীলতার ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সচেষ্ট ছিলেন।  মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি তো বটেই, এক্ষেত্রে আর যে মানুষটির নাম সর্বপ্রথম স্মরণ করতে হবে তিনি জওহরলাল নেহরু। নেহরুর সহযোগী হিসেবে অবশ্যই ছিলেন বল্লভভাই পটেল এবং মৌলনা আবুল কালাম আজাদ। এবং ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। একথা কখনই অস্বীকার করা যাবে না যে, ভারতের বৈচিত্র্যটিকে নেহরু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাঁর 'ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া' পড়লেই বোঝা যায় নেহরুর এই ভারত - চিন্তাটি কতখানি গভীর ছিল। নেহরু বুঝেছিলেন, বৈচিত্র্যের ভিতরই যদি ভারতের ঐক্যকে রক্ষা করতে হয়, তাহলে দেশে গণতন্ত্র এবং সহনশীলতার শিকড়টি গভীরে প্রোথিত করতে হবে। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের পনেরো বছরে সেই চেষ্টাই অক্লান্তভাবে করে গিয়েছেন নেহরু। তার ফলে, ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপর আঘাত যে আসেনি এমন নয়, আঘাত এসেছে মাঝেমধ্যেই, তবু ভারতীয় গণতন্ত্রকে একেবারে ভূলুন্ঠিত করে ফেলা যায়নি। ভারতের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ যখন ঘন ঘন সেনাশাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, ভারতকে সেই দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হতে হয়নি।

তবে স্বাধীনতার প্রাক্ মুহূর্তে দেশের দুই প্রান্তে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করে গান্ধি সম্ভবত বুঝেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার যে ভয়াবহ বীজটি বপন করা হয়ে গিয়েছে তা ভবিষ্যতে বিষবৃক্ষ হয়ে দেখা দিতে পারে ভারতের মাটিতে। বস্তুত গান্ধি এ নিয়ে আশঙ্কিতও ছিলেন। স্বাধীনতার আগে দিল্লিতে তিনটি সভায় গান্ধি বলেছিলেন, 'নতুন যে দুটি দেশ জন্ম নিতে চলেছে, সেই দুটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের দায়িত্ব হবে সংখ্যালঘুকে সবরকমের নিরাপত্তা প্রদান করা। সংখ্যালঘু যেন নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে না করে তা নিশ্চিত করাই হবে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব।' এই একই কথা গান্ধি এদেশের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের নেতাদের বলেছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যে সবকিছু ঠিকঠাক চলেছিল এমন নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিন্তু দেশের ভিতর উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার লগ্নটিতে গান্ধি ছিলেন কলকাতায়। দাঙ্গাবিধ্বস্ত বাংলায় শান্তি ফেরানোর চেষ্টায় ব্যাপৃত রেখেছিলেন নিজেকে। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় গান্ধি ফিরে যান দিল্লিতে। ভেবেছিলেন দিল্লিতে ফিরে দাঙ্গাধ্বস্ত পাঞ্জাবে যাবেন। কিন্তু পাঞ্জাব যাত্রা স্থগিত রাখতে হয় গান্ধিকে। ততদিনে দিল্লিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। দলে দলে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছেন। আশ্রয় নিচ্ছেন দিল্লির পুরানা কিল্লায় বা হুমায়ুনের সমাধিতে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ভিতর নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গান্ধি থাকতে শুরু করলেন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বস্তিতে।

স্বাধীনতার পরপরই খোদ দিল্লিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এই আক্রমণ বিচলিত করে তুলেছিল নেহরুকেও। নেহরু প্যাটেলকে লিখেছিলেন, 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মদতেই এই সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামাগুলি ঘটছে। ওরা চাইছে একটা সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে সদ্য স্বাধীন এই দেশটির সরকারকে বিভ্রান্ত বিচলিত করে তুলতে। সরকারকে উৎখাত করতে।' ফলে স্বাধীনতা লাভ করলেও খুব মসৃণভাবে যে নেহরুর নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল এমন নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাঁচ মাস বেঁচে ছিলেন গান্ধি। এই পাঁচ মাস তিনি ক্রমান্বয়ে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন ভারতকে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ থেকে মুক্ত রাখার। ১৯৪৮ - এর জানুয়ারিতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হলেন গান্ধি। গান্ধি হত্যার নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল সারা দেশ। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে সলতে পাকানো আরএসএস - হিন্দু মহাসভাও রাশ টানল একটু। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি থেকে তারা যে সম্পূর্ণ নিরস্ত হয়েছিল তা বলা যাবে না।
নেহরু এবং কংগ্রেস দেশে গণতন্ত্রের শিকড়টিকে গভীরে প্রোথিত করতে পেরেছিল এটা যেমন ঠিক, তেমনই এটাও ঠিক কিছু ফাঁক ফোকর তার ভিতরেও থেকে গিয়েছিল। নেহরু সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। এমনকি, সরকারের শীর্ষপদে থেকে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান তাঁর না -পসন্দ ছিল। যে কারণে সোমনাথ মন্দির সংস্কারের পর দ্বারোদ্ঘাটনে রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদকে যেতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। রাজেন্দ্রপ্রসাদ শোনেননি নেহরুর সে নিষেধাজ্ঞা। শুধু বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ কেন, নেহরু না চাইলেও কংগ্রেসের ভিতর বেশ কয়েকজন হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার নেতা থেকে গিয়েছিলেন। কাজেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে যতই আপসহীন করার চেষ্টা করুন না কেন নেহরু, সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যর্থ হয়েছিল। নেহরু পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতেও মনোনিবেশ করেছিল।

নেহরুর প্রয়াণের পরও যে তেরো  বছর কংগ্রেস টানা দিল্লির শাসন ক্ষমতায় ছিল, সেই তেরো বছরে নেহরুর গণতান্ত্রিক ভাবনা থেকে কংগ্রেস কিছুটা হলেও বিচ্যুত হয়েছিল। নেহরুর প্রয়াণের কয়েক বছরের ভিতর কংগ্রেস বিভক্ত হয়েছিল। নেহরু - কন্যা ইন্দিরার নেতৃত্বে নতুন কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল। কালেক্রমে সেই কংগ্রেসই মূল কংগ্রেস হয়ে উঠেছে। ইন্দিরার হাত ধরে কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পরিবারবাদ। সেই পরিবারবাদ থেকে কংগ্রেস এখনো মুক্ত হতে পারেনি। ইন্দিরার শাসনকালেই অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থার সময়ে রাষ্ট্রীয় দমননীতির সাক্ষীও থেকেছে দেশ। এতদসত্ত্বেও, ওই জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদ দিলে, কংগ্রেসের শাসনকালে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর কিন্তু কোনও আঘাত নেমে আসেনি। দেশের গণতান্ত্রিক পরিসরটুকু অক্ষুণ্ণ ছিল। কংগ্রেসকে বাদ দিলে যে স্বল্প সময়টুকু অকংগ্রেসি -অবিজেপি সরকার শাসন ক্ষমতায় ছিল, তারাও গণতান্ত্রিক পরিসরটিকে বিপন্ন করে তোলেনি।

গান্ধি হত্যার পর সাময়িকভাবে নিজেদের একটু অন্তরালে নিয়ে গেলেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি কিন্তু নিশ্চুপ ছিল না। গান্ধি হত্যার পর থেকে সাতের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত আরএসএস তাদের শাখা সংগঠনগুলির মাধ্যমে তাদের মতাদর্শ প্রচার এবং প্রসারের কাজটি খুব সুপরিকল্পিতভাবে এবং প্রচারের আলোর বাইরে থেকে চালিয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৫ -এ জরুরি অবস্থার প্রাক্কালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা - বিরোধী আন্দোলন আরএসএসকে প্রকাশ্যে এসে জমি দখল করার অনেকটা সুযোগ করে দেয়। '৭৭ - এ জনতা সরকারে সংঘ পরিবারের বরিষ্ঠ নেতাদের মন্ত্রিত্বলাভের ভিতর দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্থান শুরু হয় হিন্দুত্ববাদীদের। নয়ের  দশকের গোড়ায় লালকৃষ্ণ আডবানির রামরথ যাত্রা আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে আরও চড়ামাত্রায় পৌঁছে দেয়। স্বাধীনতার পর ভারতের মাটিতে ওই নয়ের দশক থেকেই বিভাজনমূলক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দুর্দমনীয় যাত্রা শুরু। যা প্রতিরোধ করতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস এবং বামপন্থী শক্তিগুলি।

ঐ যে নয়ের দশকের গোড়ায় আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের যাত্রা শুরু, গত বারো বছরে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে তা আরও পরিপূর্ণতা পেয়েছে। নয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরেও লালকৃষ্ণ আডবানির মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ভিতর যতটুকু সংযম ছিল, বা, অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি যতটুকু আস্থা প্রদর্শন করেছিলেন বিজেপি নেতারা -- নরেন্দ্র মোদির শাসনকালের এক দশকের ভিতরই কিন্তু সেই সংযম দূরে সরিয়ে রেখে কোনওরকম রাখঢাক না করেই উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী রূপটি প্রকাশ করে দিয়েছে আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি। মনে রাখতে হবে, আরএসএস তার জন্মলগ্ন থেকেই ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আরএসএসের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়লকর ঘোষণাই করেছিলেন, আরএসএসের প্রধান শত্রু মুসলমান এবং খ্রিস্টান। এহেন উগ্র মৌলবাদী শক্তি গণতন্ত্রের উপর আস্থা রাখবে, সেটা আশা করাই দুরাশা। আরএসএসও রাখেনি। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে অগ্রসর আরএসএস -  বিজেপি গত বারো বছরে প্রশাসনের সবকটি স্তম্ভকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে কব্জা করেছে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাটিকে এক অর্থে ভূলুন্ঠিত করেছে, সমস্ত মৌলিক এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করেছে। বিজেপির এই শাসনকালেই নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে নিয়োগ করে এসআইআরের বাহানা তুলে এক কথায় প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং হয়েছে। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। আধাসেনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রবিরোধিতার তকমা দিয়ে বিরোধী - সমালোচকদের দমনমূলক আইনে বিনাবিচারে আটকে রাখার মতো নক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, তাদের নাগরিক অধিকার হরণের ঘটনা নিত্যদিন ঘটে চলেছে। দলিত - আদিবাসীরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হামলার শিকার হচ্ছে। প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসছেন গেরুয়া শিবিরের মনোনীত ব্যক্তি। সেখানে মেধা নয়, রাজনৈতিক বশ্যতাই প্রধান হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গবেষণা ক্ষেত্রগুলিকে সঙ্কুচিত করে অবৈজ্ঞানিক বৈদিক অঙ্ক, পুরাণ, কাল্পনিক ইতিহাস ইত্যাদির চর্চা চালু করা হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি যত্রতত্র হামলা সংগঠিত করে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। নানারকম ফতোয়া জারি করে মুক্তচিন্তার পথটিই অবরুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সংবিধানকে অসম্মান এবং অবজ্ঞা করে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করার পথ ধরেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে ওঠা ভারতীয় সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করে 'হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থানে'র ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যমী হয়েছে। বৈচিত্র্যের ভিতর ঐক্যের যে ভাবনা জাতীয় নেতারা স্বাধীনতার লগ্নে ভেবেছিলেন, নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে পরিকল্পিতভাবে সেই ভাবনার অবলুপ্তি ঘটানো হচ্ছে।

স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পর ঠিক এই জায়গাটিতেই এসে দাঁড়িয়েছে ভারতবর্ষ। নেহরু যে গণতান্ত্রিক ভারতের কথা চিন্তা করেছিলেন, সেই ভারত আজ ভূলুন্ঠিত। গান্ধি হিন্দু - মুসলমানের যে সম্প্রীতির ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন, সেই সম্প্রীতির ভারত আজ বিভাজিত, বাবাসাহেব আম্বেদকর যে সংবিধানের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিলেন, সেই সংবিধান এখন শাসকের পদদলিত। নতুন ভারতে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি রামচন্দ্র রূপে পূজিত। এক কথায় ফ্যাসিবাদের নগ্ন রূপটি আজ প্রকাশ করে ফেলেছে আরএসএস - বিজেপি। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পর দেশবাসীকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের এটিই অবদান।
এই ভারতবর্ষকে নিশ্চয়ই  কেউ দেখতে চাননি। কিন্তু দেখতে হচ্ছে। তাহলে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ কী? এই নগ্ন ফ্যাসিবাদের সামনে ভয়াবহ আত্মসমর্পণ? নাকি প্রতিরোধ গড়ে তোলা?
নেহরুর প্রয়াণের ছয় দশক পর এই আগ্রাসী হিন্দু ফ্যাসিবাদের সম্মুখীন হয়ে আর একবার বোঝা যাচ্ছে, নেহরু ম্যাজিকটি আসলে কী ছিল। নেহরু তাঁর সতেরো বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে গণতন্ত্রের শিকড়টি যেভাবে প্রোথিত করে গিয়েছিলেন ভারতের মাটিতে, তা যে এত আগ্রাসী ফ্যাসিবাদী শাসকের পক্ষেও চটজলদি উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়, গত কয়েকমাসে সেই সম্ভাবনাটিও স্পষ্ট হয়েছে। ফ্যাসিবাদের ঘন অন্ধকারের ভিতর সেইটি আলোর রেখা। দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্রদের আন্দোলনের সামনে নত হতে হয়েছে নরেন্দ্র মোদি - অমিত শাহ এবং তাঁদের সমগ্র প্রশাসনকে। যাঁরা নিজেদের অমিতবিক্রম ভাবতে শুরু করেছিলেন, ওই আন্দোলনের মুখে পড়ে তাঁরা কার্যত পিছু হঠেছেন। সংসদকে এড়িয়ে গিয়েছেন। ওই আন্দোলন বাধ্য করেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে। শুধু দিল্লিতেই নয়, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ হিন্দি বলয়ের এক বিরাট অংশেও এরপর নানা দাবিদাওয়া নিয়ে জনতা রাস্তায় নেমেছে। সর্বত্রই রাস্তায় নামা এই জনতার মারমুখী মেজাজ প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। পুলিশের জল কামান থেকে পেলেট গান কোনও কিছুরই পরোয়া করছে না তারা। এবং সবক্ষেত্রেই শাসক পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে।

এই জনবিক্ষোভে দুটি বিষয়  অবশ্যই লক্ষ্যণীয়। প্রথমত এই বিক্ষোভ কোনও কপিবুক সংসদীয় প্রথার ওপর আস্থা রাখতে চাইছে না। এই বিক্ষোভের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এটা বোঝা যাবে, এই বিক্ষোভ কোনও সংগঠিত বিক্ষোভ নয়। এগুলি স্বতঃস্ফূর্ত। যে কারণেই কপিবুক সংসদীয় প্রথার অনুসারী নয়। কোনও ব্যাকরণ মেনে বিক্ষোভ হচ্ছে না। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনও দেশেই অবশ্য গণবিক্ষোভের কোনও ব্যাকরণ কস্মিনকালেই ছিল না।
দ্বিতীয়ত, এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি নেই। দিল্লিতে যন্তর মন্তরে যখন ককরোচ জনতা পার্টি ( সিজেপি ) অবস্থান শুরু করে, তখন প্রতিষ্ঠিত কোনও রাজনৈতিক শক্তিই এদের আন্দোলনকে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চায়নি। আন্দোলন যখন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং সরকারকে কোণঠাসা করে তোলে, তখনই এদের পাশে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিরা এসে দাঁড়ায়। কংগ্রেস অবশ্য তখনও ইতস্তত করছিল। হয়তো ভেবেছিল সিজেপি তাদের রাজনৈতিক জমি গ্রাস করে নেবে। যদিও পরে পেলেট গানে আহতদের নিয়ে দিল্লিতে পুলিশকে এফআইআর নিতে বাধ্য করিয়ে রাহুল কেন্দ্রের সরকারকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পেরেছেন।  বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হিন্দি বলয়ের যে বিরাট অংশে গত দু ' মাসের ভিতর গণবিক্ষোভ দেখা গিয়েছে, তার কোথাওই কিন্তু নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। বিক্ষোভকারীরা নিজেরা নিজেদের মতো করে বিক্ষোভ গড়ে তুলেছেন এবং নিজেরাই তার নেতৃত্ব দিয়েছেন। কারওর জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেননি।
এই যে কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে জনবিক্ষোভ গড়ে উঠল -- এটা সম্ভব হল কীভাবে? এটা সম্ভব হল এই

কারণেই যে, স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের শিকড়টা ভারতের গভীরে প্রোথিত করে দেওয়া গিয়েছিল। ভারতের নাগরিককে তাদের মৌলিক এবং সাংবিধানিক অধিকারগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন জাতীয় নেতৃত্ব। ভারতীয় জনগণ বরাবর তাদের এই অধিকার সম্পর্কে সচেতন থেকেছে। তাদের সেই সচেতনতা তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। এখন যখন নরেন্দ্র মোদি - অমিত শাহরা দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক এবং সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি খর্ব করছেন, তখন স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই জনতা আর একবার রুখে দাঁড়িয়েছেন। নিজেদের অধিকার নিজেরাই তাঁরা বুঝে নিতে চাইছেন। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'অ্যান্টি ড্যুরিং'-এর মুখবন্ধে লিখেছিলেন, 'বিজ্ঞানের নিয়মেই এই পৃথিবী একদিন একটি গোলাকার বরফপিণ্ডে পরিণত হবে। তবু মানুষ সংগ্রাম করে। কেন করে? কেন না মানুষ তার অর্জিত অধিকারগুলিকে হারাতে চায় না।' এঙ্গেলসের এই কথাগুলিই বুঝি সত্য হয়ে উঠছে এবার ভারতের মাটিতে।
বোধ হচ্ছে, ভারত আবার একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতের রাজনীতি আর একবার হয়তো নতুন দিকে বাঁক নেবে। সেই বাঁকের মুখে কে কোন ভূমিকা পালন করবে তা-ও এখনো পরিষ্কার নয়। ককরোচ জনতা পার্টিও কি ভবিষ্যতে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে -- সেটিও এখনো অজানা। নাকি জনতার আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত নতুন কোনও অধ্যায়ের সূচনা করবে।


পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, স্বৈরতন্ত্র যখন চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছয়, তখনই তার পতনেরও সূত্রপাত হয়। তার সাম্প্রতিক প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের দুই প্রতিবেশী --- বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা। ওই দুই দেশেও গণবিক্ষোভ ক্ষমতাচ্যুত করেছিল শাসককে। ভারতের ভবিষ্যতে কী আছে, তা একমাত্র জানেন ভারতভাগ্যবিধাতা। তবে আশার কথা এই যে, নরেন্দ্র মোদি - অমিত শাহদের আত্মবিশ্বাসে যে ফাটল ধরেছে, সেটি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top