বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
জন্মদিন
জন্মদিন

লতিকা ওর স্বামীর পিঠে খোচা মেরে বলল শুনছো? এই ভাবে কয়েকবার ডাকার পরে কোনো উত্তর না পেয়ে জোরে ধাক্কা মারে । ধরফর করে উঠে বসে গোবর্ধন। -কিছুই হয়নি আমার মনে হলো ডাইনিং এর ফ্যানটা নেভানো হয়নি। সারারাত চলবে আর শুধু শুধু এত কারেন্ট উঠবে, তাই তোমাকে দেখেছিলাম। ওটা নিভিয়ে দেবার জন্য। এবার গোবর্ধন একটু থীতু হয়ে বলে এই জন্য আমার ঘুমটা ভাঙালে? তুমি তো নিজেই বন্ধ করতে পারতে।

- কেন তুমি জানো না রাত্রি বেলায় একা একা কোথাও যেতে আমার ভয় করে।

  বেশি রাগ দেখাতে পারেনা তাও বিড়বিড় করে বলে -ন্যাকা, পাশেই ডাইনিং সেখানে যেতে ভয়।

-  কিছু বলছো?

-  না না কিছু বলছি না।

  বিছানা থেকে নেমে ডাইনিং এর ফ্যান টা নেবায় গোবর্ধন। ফিরে এসে আবার শুয়ে পড়ে গোবর্ধন । লতিকা বলে, দেখো আমি তোমায় কত ভালবাসি সারারাত ফ্যান চললে কত কারেন্ট উঠবে, কত টাকার বিল আসবে তোমারই তো খরচা হবে। আমি কি তা পারি? গোবর্ধনের উত্তর দেয় না। মনে ভাবে আহা ।

 লতিকার অভ্যাস খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠার পাড়ার কিছু মহিলা ওই একই সময়ে জল নেওয়ার জন্য মিউনিসিপ্যালিটির কলের সামনে জড়ো হয়। আর ওইটুকু সময়ের মধ্যে পাড়ার সমস্ত খবর পরস্পর চালানো হয়ে যায়।

গোবর্ধন নিয়মিত ব্যায়াম করে।পাড়ার বাচ্চাগুলো মাঝে মাঝে তাকে দেখে ঘিরে ধরে, " ও গোবর্ধন দাদা , তোমার বাইসেপ টা দেখাও না।গোবর্ধন মিট মিট করে হাসে ,  আর বলে নারে,এখানে কি করে দেখাবো আমার সাথে ক্লাবে যাস তখন দেখাবো। না,না এখন একবার দেখাও গোবর্ধন আর কোন কিছু না বলে যে জামার  হাতাটা ওপরে তুলে বাইসেপ টা দেখায়। যখন এই কান্ড হচ্ছিল তখন হঠাৎ পাড়ার কুকুর ভোলা গোবর্ধনের দিকে তেড়ে যায় । ওর কি মনে হয়েছিল কে জানে হয়তো ভাবছিল আমার ওপর পাড়ার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব তবু হয়তো এই লোকটা কতগুলো বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার মতলব করছে। সবাইকে ছেড়ে গোবর্ধনের পায়জামাটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে।

আরে,ছাড় ছাড় আমাকে চিনিস না আমি তো এই পাড়াতেই থাকি রোজ পচাদার চায়ের দোকানে চা বিস্কুট খাই। হঠাৎ তার মনে পড়ল চা বিস্কুট খাবার সময় এই ভোলাটাই তার দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু কোনদিন এক টুকরো বিস্কুটও ওকে দিই নি । তাই বোধ হয় প্রতিশোধ নেবার জন্য বসে আছে।চারদিক তাকিয়ে দেখে বাচ্চাগুলো ভোঁ ভা।কোনরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যখন ছাড়া পেল গোবর্ধন দেখলো তার পাজামার নিচের অনেকটা অংশই মুখের মধ্যে নিয়ে ভোলা যেন মিট মিট করে হাসছে। কি কেমন দিলাম গোবর্ধন তাকে কিছু বলার রিস্ক নেয় না। একটু বললে যদি পাজামার আরেকটা দিক ছিড়ে নেয় চোখ বন্ধ করে আস্তে আস্তে ওই জায়গা ট্যাগ করেছে বাড়িতে ফিরতেই দেখে লিপিকা মিট মিট করে হাসছে। আমাকে দেখে হাসছো কেন তোমার পাজামাটা কিভাবে ছিল না না ওই আসতে গিয়ে রাস্তার পাশে একটা কাঠের তক্তা পড়েছিল ওর মধ্যে পেরেক মারা ছিল হাঁটতে গিয়ে কখন যে ওই তক্তার মধ্যে পাজামাটা আটকে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। হারাতে গিয়ে ছিড়ে গেছে। তাও লতিকা কোনরকম সহানুভূতি না দেখিয়ে মুখে আচল দিয়ে হাসতে থাকে কি তুমি বিশ্বাস করছো না আমাকে আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে হবে না। তোমার এই হাল কি করে হয়েছে আমার আগেই জানা হয়ে গেছে। তার মানে জগা এসে আমাকে খবর দিয়ে গেছে সাংঘাতিক সাংঘাতিক জায়গাটা ওই বাচ্চাদের মধ্যে ছিল আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে এখানে এসে আবার লতিকার কাছে আসল তথ্যটা ফাঁস করে দিয়ে গেছে তাও ভাগ্য ভালো তোমার পায়ে দাঁত বসায়নি । আমি অবশ্য সিওর ছিলাম ও তোমাকে কামড়াবে না। পাড়ার কুকুর তো ও তো রোজ আমার কাছে দুপুরে খেতে আছে ও তাই বুঝি তুমি আমাকে মজা দেখার জন্য । ওকে আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছো ? আরে না না ছি ছি । আমি কেন লেলিয়ে দেব । তবে আমার নেওটা তো তোমাকে মজা দেখার জন্য ওটা করেছে আর কথা বাড়ায় না গোবর্ধ ন।

 গোবর্ধন শহরে একটা সদাগরী অফিসে কাজ করে। অফিসের কারো সাথে বেশি কথা বলে না ওর ধারণা সবাই ওকে হিংসে করে। কেন যে হিংসে করে সেটা সেও জানে না আর অফিসে দুটো মেয়ে সেগুলো তো আরো ডেঞ্জারাস ওকে দেখলেই মিটিমিটি করে হাসবে। দুটোর একটা আবার তার বসের শালী ।আমি বাপু বিয়ে থা করা সংসারী মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে হাসা কেন?

  যাক গে ওর মনে পড়ে যায় আজ অফিসে আসার সময় রিক্সাওলা নব টার সাথে তক্কোই না করতে হলো। মেজাজটাই বিগড়ে দিয়েছিলো। বলে কিনা আজ থেকে একটাকা ভাড়া বেড়েছে। বলি একটাকা কি টাকা নয় বললেই হবে। যতই বলিনা কেন তোমরা সাধারণ মানুষের ওপর এইভাবে চাপ দিতে পারোনা। সেও সমানে তক্কো করে যায়। শেষমেষ আমার সাথে না পেরে বলে, আপনি যা কঞ্জুস আপনার কাছ থেকে একটা টাকা বার করাও মুশকিল। সে বলতে বলতে গেলো আপনি না দেন, বৌদির কাছ থেকে ঠিক নিয়ে নেবো।

বলে কিরে বৌদির কাছ থেকে নিয়ে নেবে। এতো সংসারে অশান্তি লাগিয়ে দেবে। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে একটা টাকা বার করে নবর হাতে দিয়ে বলে এতে আবার বৌদিকে বলার কি আছে। টাকা তো পেয়েই গেলি। নব মুচকি হেসে থ্রেট দিয়ে গেলো আজকের মতো ছেড়ে দিলাম।

গোবর্ধন ভাবতে বসে, কি বিয়েই না মা দিয়ে গেলো। এতো ঘর শত্রু বিভীষণ। আমাকে সবার সামনে ভিলেন বানিয়ে নিজেকে হিরোইন করে রেখেছে। যাক এসব চিন্তা করে লাভ নেই। একটা টাকা গচ্ছা গেলো, যাক। অন্তত লতিকাতো জানতে পারবেনা।

 আবার অফিসের ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে আড় চোখে দেখে বসের শালী ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। একবার ভাবে ওকে সরাসরি গিয়ে বলি তুমি আমার দিকে তাকিয়ে কেন হাসছো? পরক্ষনেই ভেবে দেখে যদি ও বলে বসে আপনি কি করে জানলেন যে আমি আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছি। পিছিয়ে আসে গোবর্ধন। আর যদি ওই মেয়েটা আমার নামে ওর জামাইবাবুর কাছে কমপ্লেন করে তবেই হয়েছে। না না ঐসব চিন্তার মধ্যে যাওয়া যাবে না।

  বাড়ি ফেরার সময় আবার নবর সাথে দেখা। "কি দাদা যাবেন নাকি? না না দরকার নেই, এই টুকু তো রাস্তা হেঁটেই চলে যাবো। নব হাসতে থাকে।

বাড়িতে ফিরে দেখে দরজায় তালা দেওয়া। এতো খেটে খুটে বাড়িতে এসে বাড়িতে ঢুকতে পারবোনা। লতিকাতো জানে এই সময় আমি বাড়ি ফিরি। তবে ও কোথায় গেলো? কিছুক্ষণ দরজার পাশে হেলানদিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, হঠাৎ তার চোখে পড়ে, বেটা ভোলাটা আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে এসে ঠিক পায়ের সামনে বসে পড়ে আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ও কি ভাবছে আমি চুরি করতে এসেছি। লতিকা ওকে পাহারা দেবার জন্য রেখে গেছে। এই ভাবতে ভাবতে যেই দরজার তালাটায় আমার হাত লেগে গেছে অমনি গর গর শব্দ করে আমার দিকে তেড়ে আসে ভোলা। এ কি কেলোরে বাবা। নিজের বাড়িতে ঢুকতে পারবোনা। হঠাৎ ক্রিং ক্রিং আওয়াজ, ওই বেটা নব লতিকাকে রিকশায় চাপিয়ে নিয়ে আসছে। বৌ ওর হাতে ভাড়া টা দেবার পর নব বিগলিত হয়ে "বৌদি কখনো কোথাও যাবার দরকার হলে আমাকে ডেকে নেবেন "। বেটা এসব কথা যেন আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে।

আমি কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, তুমি এতক্ষনে এলে, কোথায় গিয়েছিলে? উত্তর না দিয়ে তালাটা খোলে লতিকা। ব্যাগ থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বার করে তার থেকে দুটো বিস্কুট বার করে ভোলার দিকে ছুঁড়ে দেয়। ভোলাও আমাকে ছেড়ে বিস্কুট মুখে নিয়ে এলাকা ছাড়ে

“তা তুমি নাকি স্টেশন থেকে হেঁটে বাড়ি এসেছো। কোনোদিন তো আসোনা।"

--না এমনি, আসলে মর্নিং ওয়াক টা ঠিক মতো হচ্ছে না তো তাই।

---নাকি রিকশাওলার সাথে ঝগড়া করেছো?

---বেটা নব, মীরজাফর, জগৎ শেট আরো কত কি। ওকে বারবার বললাম বৌ কে না জানাতে, ও বেটা ঠিক জানিয়ে দিলো। এই জন্যই সিরাজদৌল্লা দেশ থেকে রিক্সা তুলেদিয়েছিল। পরক্ষনেই মনে হলো এই বেপারটাতো কোনো বইতে পড়েনি। যাকগে অনেক কথাইতো বইতে থাকে না। সকালে জগা আর বিকেলে নব সব বেটাই বেইমান। ওদের মীরজাফর বললে তো লতিকাকে লর্ড বেঙ্কন্টিং বলতে হয়। না না অতো গভীরে যাবার দরকার নেই।

হাতমুখ ধুয়ে অফিসের পোশাক ছেড়ে একটা চেয়ারে বসে গোবর্ধন। চা জলখাবার খেয়ে আবার ক্লাবে যেতে হবে। চা আর বাটিতে তেল আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মুড়ি এনে তার সামনে রাখে লতিকা। এটাই ওর নিত্যকার সান্ধ্যআহার। লতিকা ওর পাশে এসে বসে। কি ব্যাপার সকালের খবরটাতো একবারও তুলছে না। হয়তো ভুলে গেছে।

স্বামীর গেলে টোকা মেরে বলে, "কি রাগ করেছো? উত্তর দেয় না গোবর্ধন। আরো গা ঘেঁষে বসে লতিকা। একবারও তো জিজ্ঞেস করলেনা আমি কোথায় গিয়েছিলাম। এদিকে গোবর্ধন ভাবে কি দরকার খুঁচিয়ে ঘা করার। নিশ্চয়ই কোনো দরকারে গেছিলো এবার মুড়ির বাটিটা নিচে নামিয়ে রেখে "কেন এতে এতো জিজ্ঞেস করার কি আছে।

হাপ ছেড়ে বাঁচে লতিকা, যাক বাবা ভাবলাম বাবু হয়তো রাগ করেছেন। তাও তোমাকে না বলে কি পারি। আসলে আমি রেনু আর শেফালীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।

--সিনেমা! কই সকালবেলা তো কথাটা বলো নি।

--না আসলে ওরা অনেকদিন ধরেই বলছিলো একটা সিনেমা দেখাবার জন্য।

---ওরা বলছিলো মানে? ওদের টিকিট গুলো তুমিই কিনেছো।

--তো কে কিনবে? আমি বড় না। ওরা আবদার করলো "ভালোবাসার পাপ পুণ্য "বইটা নাকি খুব হিট করেছে। সত্যি দেখতে দেখতে চোখে জল এসে যায়।

চোখের জল পরের কথা। আমার এতো টাকা তুমি জলে দিয়ে এলে?

--তা কি করবো? ওরা বললো পেছনের দিকে টিকিট কাটতে। তাই তো একটু বেশি খরচ হয়ে গেলো।

  হায় হায় আমার কৌটোয় লুকিয়ে রাখা টাকা গুলো নিশ্চয়ই সব নষ্ট করে এলো।। মুড়ি খেতে আর ভালো লাগছিলো না অর্ধেকটা খেয়ে বসে রইলো।

---কি খেতে ভালো লাগছে না? আর একটু পেঁয়াজ কেটে দেবো?

--না পেঁয়াজ কাটতে হবে না। লতিকা আর কথা বাড়ায় না। আমিএখন আসি, অনেক কাজ পড়ে আছে। গোবর্ধন মনে মোনে ভাবে, কাজ না ছাই, এইতো একটু পড়ে টিভির সামনে বসে বস্তাপচা সব সিরিয়াল গুলো গিলবে।

  এতক্ষন আমরা যাকে গোবর্ধন বলে ডাকছিলাম তার একটা ভালো নামও আছে। সেটা শুধু অফিসের জন্য। প্রিয়ব্রত। বড় সাহেব মাঝে মাঝে হাক পারেন "প্রিয় প্রিয় এসব কি করেছো? কাজেকি একটুও মন নেই।

সত্যি কাজে মন দিতে পারছেনা গোবর্ধন। মুখ ঝামটা খেয়ে আবার নিজের সিটে এসে বসে সে। চোখটা তুলতেই সেই শালী, মিট মিট করে হাসি, ভাবটা এমন কেমন ঝাড় খেলেন।

আড় চোখে তাকিয়ে দেখে বসের শালী তার দিকেই এগিয়ে আসছে। অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে গোবর্ধন।

--কি প্রিয়দা, আপনার বস কি কিছু বললো। আচ্ছা আজ কি আপনার ওয়াইফের সাথে ঝগড়া হয়েছে? আপনার তো কাজে ভুল হয়না। এক নাগাড়ে এতো গুলো কথা বলে যায় সুমিতা।

আমতা আমতা করে বলে, না না ঝগড়া হবে কেন?

--না শুনলাম উনি নাকি আপনাকে না জানিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো।

একই সুমিতা জানলো কি করে? এইসব খবর অফিসে কে জানালো?

আপনি কি করে....... বলেই থেমে যায় সে। ভাবে আর বেশি কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।

সুমিতা ওর টেবিলের সামনে এসে বসে, "প্রিয়দা কাল তোমাকে আমাদের বাড়িতে আসতে হবে।"আকাশ থেকে পড়ে গোবর্ধন। এ আবার কেমন আবদার। আপনি থেকে একদম তুমি। হঠাৎ গোবর্ধণের মাথায় সমাজ সেবার কথা মাথায় এসে যায়। সোৎসাহে বলে কেন বাড়িতে কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে?

--হাসপাতাল ভর্তি এসব কি বলছো? আসলে কাল আমার জন্মদিন। বাড়িতে আমার কয়েকজন বন্ধু কে নিয়ে এই দিনটা পালন করবো। এতো বড় হয়ে গেছি কিন্তু এটা আমার মায়ের ইচ্ছা।

--ভালো ভালো খুব ভালো। তা আমি কেন? মনে মনে ভাবে সে তো সুমিতার বন্ধু নয়। আপনি বন্ধুদের সাথে জন্মদিন পালন করবেন তার মধ্যে আমাকে কেন?

---এটা সত্যি আমি বন্ধুদের নিয়েই মজা করবো তবে তোমাকেও আমি বন্ধুই ভাবি। তাই আমি চাই তুমিও এসো।

কপালে ঘাম জমতে থাকে গোবর্ধনের। ভালো লাগে কথাটার মানে কি? এই কথাটা লতিকার কানে গেলে কি যে হবে।

হঠাৎ মনে পড়ে যায়, তার সকালে ভোলারসাথে হেনস্থা হবার কথা লতিকা জানতে পারে, আবার লতিকার সিনেমা যাবার কথাটা সুমিতা জানতে পারে। চারদিকে গুপ্তচর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই কথাটাও না লতিকার কানে চলে যায়।

--না মানে কাল আমার একটা জরুরী কাজ আছে

--কোনো কথা শুনছি না, তোমাকে আসতে হবে। তোমার বস মানে আমার জামাইবাবুও কিন্তু আসছে।

প্রমাদ গোনে গোবর্ধন। প্রাইভেটফার্ম। বড় বাবুই সব। বেচাল দেখলেই ঘাচ্যাং ফুঁ। বসের মোটা গোঁফের নিচে রাগী মুখটা মনে পড়ে যায়। কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ে।

---যাক বাবা শুধু তোমাকে বলাই বাকি ছিলো।

বাড়িতে ফিরে মুড়ির বাটিটা নিয়ে বসে পড়ে।

---কি এতো চুপচাপ কেন? আজ কি অফিসে বড়বাবুর ঝাড় খেয়েছো? একি এই খবরটা লতিকা কি ভাবে জানলো। এতো স্পাই কিলবিল করছে যে কোনো কথাই গোপন থাকছেনা।। মহা মুশকিল

--কেন তুমি জানলে কি করে? বলেই চেপে গিয়ে বলে না না ঝাড় দেবে কেন? লতিকা মিটি মিটি করে হেসে বলে, দেখেছো চোরের মন বোচকার দিকে। আমি আন্দাজে ছাড়লাম আর তুমি সত্যি কথাটা বলেই ফেললে। ছাড়ো, অফিসে কাজ করলে ওরকম ঝাড় একটু আধটু খেতেই হয়, নইলে বসগিরি কি ভাবে দেখাবে। আমি যদি থাকতাম দিতাম থোতা মুখ ভোঁতা করে।

--থাক থাক তোমাকে আর উত্তেজিত হতে হবেনা। তবে একটা জিনিস বুঝলাম তুমি চাকরি না করে ভালোই করেছো। তোমার চাকরি দু দিনও থাকতো না।

যাই হোক মনের মধ্যে সেই খচ খচে ভাবটা যাচ্ছেই না। লুকিয়ে আলমারির পেছনে একটা কৌটোয় কিছু টাকা জমিয়ে ছিলো, ভেবেছিলো পুজোর ছুটিতে দু দিনের জন্য দীঘা বেড়াতে যাবে।

এটা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। লতিকা সামনের ঘরে টি ভি দেখতে বসে গেছে। এই ফাঁকে শোবার ঘরে এসে আলমারিটা খুলে ওই কৌটোটায় হাত বাড়ায়। ধরে ওজনটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। না তেমনতো হালকা মনে হচ্ছে না। কৌটোটার মুখ খুলতেই দেখে তার জমানো টাকা যেমন ছিলো তেমনি আছে। তবে লতিকা এতো টাকা কোথা থেকে খরচ করলো? তখনকার মতো আর কথা বাড়ায় না গোবর্ধন। কিন্তু একটা অস্বস্তি তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। লতিকা সিনেমা দেখার এতো টাকা কোথা থেকে পেলো?

    রাতের খাবার খেয়ে দুজনে শোবার প্রস্তুতি নেয়। লতিকা গোবর্ধণের গাঁ ঘেঁষে বসে। গোবর্ধন তার কারণ বুঝতে পারে না।

   ---কি ব্যাপার এতো সোহাগ কিসের? কিছু আবদার আছে নাকি?

----কেন আমি কি শুধু তোমার কাছে শুধু আবদারই করি? গোবর্ধন ভাবে সত্যিই তো ওদের বিয়ের পর কটা বছর কেটে গেলো লতিকাতো কোনোদিন কোনো কিছুর আবদার করেনি। এবার আর একটু চেপে বসে লতিকা।

---না গো কোনো আবদার নয়, আমি তোমার জন্য একটা জিনিস কিনেছি বলে শাড়ির আড়ালে রাখা একটা রাঙতায় মোড়া প্যাকেট গোবর্ধণের হাতে দেয়।

---কি এটা?

---খুলেই দেখোনা।

গোবর্ধন আস্তে আস্তে প্যাকেট টা খুলতেই চক্ষু চড়ক গাছ। একটা আস্ত নতুন মোবাইল। অবাক বিস্ময়ে এতো দাম দিয়ে তুমি এই মোবাইলটা কিনেছো।

---জানো কিছুদিন ধরেই দেখছি তোমার মোবাইলটা ঠিকমতো কাজ করছে না। কিন্তু তুমি কিছুই বলছো না। ওই ভাঙা মোবাইলটা নিয়েই কাজ করছো। এবার কানের কাছে মুখটা এনে লতিকা বললো "কাল তোমার জন্মদিন মনে আছে কি?"

জন্মদিন! না এ কথাটা তো তার মাথায় আসেনি। মনে পড়লো কাল তো আবার বসের শালীর জন্মদিন।

---এটা হলো তোমার জন্মদিনে আমার গিফট।

---তা বলে এতো দামি জিনিস।

---তাতে তোমার কি? এটা তোমার টাকায় কেনা নয় মশাই। এটা আমার জমানো টাকা দিয়ে কেনা। বিয়ের সময় উপহার হিসেবে যে টাকা পেয়েছিলাম তার থেকে কিছু জমিয়ে রেখেছিলাম। আর আমি তো দেখেছি ওই ভাঙা মোবাইলটা কতো কষ্ট করে চালাচ্ছ। তাই তো ভাবলাম এটাই হবে সেরা উপহার। চোখের জল আটকাতে পারে না গোবর্ধন। সে মনে মনে কতো কিনা ভেবেছিলো। সামান্য টাকার চাকুরে গোবর্ধন কটা টাকাই বা দিতে পারে লতিকার হাতে। কিন্তু কোনোদিন তো হাতে ধরে কোনো উপহার দেবার কথা তার মাথায় আসেনি। আর লতিকা তার তিল তিল করে জমানো টাকা থেকে আমার জন্য এতো দামি একটা গিফট কিনে নিয়ে এলো।

চুপ করে থাকে গোবর্ধন। এবার তার পিঠে একটা ধাক্কা মেরে বলে কি হলো এবার শুতে যেতে হবে তো?



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top