বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
আরব সাগরপারের আন্ডারওয়ার্ল্ডএক অন্ধকারের ইতিহাস
আরব সাগরপারের আন্ডারওয়ার্ল্ডএক অন্ধকারের ইতিহাস




পর্তুগিজদের দেওয়া 'বম বাইয়া' বা সুন্দর উপসাগর থেকে ব্রিটিশদের দেওয়া 'বম্বে', আর সেখান থেকে আজকের মুম্বই—নাম বদলালেও আরব সাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা সাতটি দ্বীপের এই মহানগরের পেটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার ইতিহাসটি কিন্তু চিরকালই রোমহর্ষক। এই শহরের অপরাধ জগতের ইতিহাস সাধারণ পুলিশি কেস স্টাডি নয়, বরং ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পিঠের দিকের এক সুদীর্ঘ অন্ধকার এপিক। ১৯৩০-’৪০-এর দশকে গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল ইন্টারপোল ফাইল অবধি, বোম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ড বরাবরই হাত মিলিয়ে এসেছে বিশ্বের সুদূর কোণের মাফিয়া সিন্ডিকেট এবং রূপালি পর্দার গ্ল্যামার দুনিয়ার সঙ্গে। এই লেখায় আমরা  সেই আন্তর্জাতিক যোগসূত্র, বাস্তব জীবনের বিভিন্ন রক্তে ভেজা ঘটনা এবং সিনেমা জগতের অন্ধকার যোগসাজশকে এক সুতোয় গেঁথে এই মহা-গাথাকেই পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করব।
ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের হাত ধরে  সাতটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে জনপদ বোম্বাই পর্তুগাল  রাজকন্যা ক্যাথরিনের সূত্রে যৌতুক হিসেবে ব্রিটিশদের অধিকারে আসে, যা পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এক বিশাল বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত হয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশদের তৈরি করা বিশাল সব কজওয়ে এবং রেল নেটওয়ার্ক দ্বীপগুলোকে যুক্ত করে এক অখণ্ড শহরে রূপ দেয়। আর সুয়েজ ক্যানাল চালু হওয়ার পর তো কথাই নেই ! সুতো ও কাপড়ের বাণিজ্যে বোম্বে হয়ে ওঠে ব্রিটিশ ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী।
  ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, মিল ল্যান্ডের উত্থান এবং দেশভাগের পর আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর স্রোত মিলে বোম্বেকে একদিকে যেমন ভারতের শিল্প ও ফ্যাব্রিকের প্রাণকেন্দ্র বানিয়েছিল, অন্যদিকে ঠিক তার আড়ালেই জন্ম দিয়েছিল এক অন্ধকার, রুক্ষ আন্ডারওয়ার্ল্ড ও অপরাধজগতের জটিল শেকড়ের। সে প্রসঙ্গে আসছি পরে।
  বিশ শতকের গোড়ায় বম্বে ছিল বন্দর ও মিলের শহর। তখন অবশ্য আজকে যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে  গ্ল্যামার আর রক্তপাতের ছবি, সেটা ছিল না। তবে কিনা শেকড়টা ছিল। ছিল একেবারে নিচুতলার আখড়ার পালোয়ানদের পেশিশক্তিতে।


কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) ঘনিয়ে আসতেই ছবি বদলাল। সেনা বাহিনীর রসদের কালোবাজারি আর খাদ্যশস্যের কৃত্রিম সঙ্কটে হাত পাকাতে শুরু করল নতুন একদল ধান্দাবাজ। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হল আসল আন্তর্জাতিক খেলা।
   মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো—যেমন, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন দুবাই, কুয়েত এবং মাস্কাট—হয়ে উঠেছিল চোরাচালানের প্রধান কেন্দ্র, বা আজকের ভাষায় হাব। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কম, আর ভারতে তখন তার লেনাদেনা নিষিদ্ধ। কেন ? আসুন , একটু দেখে নেওয়া যাক।
  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হল, তখন ভারত ব্রিটিশের অধীনে। তখন সরকারকে বিশাল অঙ্কের খরচ সামলাতে হয়েছিল মিত্রবাহিনীর হয়ে লড়ার জন্য। যুদ্ধের খরচ জোগাতে ব্রিটিশরা দেদার কাগুজে নোট ছাপতে শুরু করে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি চরমে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা কাগজের টাকার ওপর ভরসা হারিয়ে হু হু করে সোনা জমাতে শুরু করে। ব্রিটিশরা বুঝল, মানুষ যদি এভাবে সোনা কিনে জমায়, তবে দেশের সমস্ত সোনা হাতের বাইরে চলে যাবে তো বটেই, ব্রিটিশ ট্রেজারিও ফতুর হয়ে যাবে। সেই কারণে যুদ্ধের সময়ই জরুরি ভিত্তিতে সোনা আমদানির ওপর রাশ টানা হয়।

১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ সরকার 'ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট'-এর অধীনে একাধিক জরুরি আইন এনেছিল। এর মাধ্যমেই ভারতে সোনা আমদানির ওপর একপ্রকার আইনি লাগাম পরানো শুরু হয়। সোনা কেনাবেচা ও মজুতের ওপর তখন চলছে কড়া নজরদারি, যাতে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর। সদ্য স্বাধীন ভারত তখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। দেশভাগ, শরণার্থীর পুনর্বাসন এবং খাদ্যের অভাব - সব মিলে অবস্থা মারাত্মক। সেই সময়ে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকেছিল। বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে গেলে যে বহুমূল্য পাউন্ড বা ডলার খরচ হত, তা দিয়ে তখন দেশ চালানোর জন্য জরুরি খাদ্যশস্য বা কাঁচামাল আমদানি করাই ছিল বেশি দরকার। সরকার বুঝল, মানুষ যদি সোনা কেনার পেছনে টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ওড়াতে থাকে, তবে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বসে যাবে। এই অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতেই সরকার এবার বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করে। ১৯৪৮ সালের আইন এবং পরবর্তী সময়ে কাস্টমস ও ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট (FERA, 1947)-এর মাধ্যমে সোনা আমদানি সম্পূর্ণ বেআইনি বা একেবারে নিষিদ্ধই করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, দেশের বাজারে সোনার চাহিদা আকাশচুম্বী, অথচ আইনত তা কেনার বা আনার কোনো বৈধ পথ নেই। ঠিক এই আইনি নিষেধাজ্ঞা আর চাহিদার ফারাকটাই বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্য বানিয়ে তুলল সোনালি সুযোগ। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কম, আর ভারতে নিষিদ্ধ থাকায় তার দাম কয়েক গুণ বেশি। ব্যস ! এই 'নিষেধাজ্ঞা' আর 'অতিরিক্ত মুনাফার লোভ'-এর সুতো ধরেই আরব সাগরের বুক চিরে হাজি মাস্তান বা করিম লালাদের নৌকাগুলো সোনা চোরাচালানের রাস্তা ধরে ভিড়তে শুরু করল কাস্রাড়া বা গোয়ার সৈকতে।
  সিসিলি বা নিউ ইয়র্কের মাফিয়ারা যেমন আটলান্টিক রুট চিনত, বম্বের এই আদি কারবারিরা তেমনি চিনত পারস্য উপসাগরের রুট। হাজি মাস্তান বা করিম লালাদের হাত ধরে সেই যে আরব সাগরের সঙ্গে বম্বের অন্ধকার দুনিয়া গাঁটছড়া বাঁধল, তা আর ছেঁড়া যায় নি। সে প্রসঙ্গে আসব পরে। কিন্তু বলে নেওয়া যাক, সেই সঙ্গে এই চোরাচালানের আড়ালেই কিন্তু গড়ে উঠেছিল এক ভয়ঙ্কর ফ্রেঞ্চ কানেকশন। হাজি মাস্তান যখন তার ডাউ নৌকাগুলো আরব সাগর হয়ে গোয়া বা কাস্রাড়ার উপকূলে এনে ভেড়াত, তখন পণ্য বলতে সোনা বা ঘড়ির পাশাপাশি সবচেয়ে  লাভজনক কারবার ছিল বিলাসবহুল ফরাসি মদ ও বিশেষ ব্র্যান্ডের টোব্যাকোর।


  ফ্রান্সের মার্সেই বন্দর আর উত্তর আফ্রিকার মরক্কো ছিল সেই সময় ইউরোপীয় চোরাচালানের প্রধান জংশন। মার্সেইয়ের কুখ্যাত গ্যাংগুলো, যাদের তৎকালীন ফ্রেঞ্চ পুলিশ 'রিয়াকশন ফ্রাঁসেজ' বা স্থানীয় করসিকান মাফিয়া বলত, তাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি ছিল হাজি মাস্তানের। মধ্যস্থতা করত মিডল-ইস্টের এজেন্টরা । ইউরোপের ওই সিন্ডিকেটগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত বা দুবাইয়ের ফ্রি পোর্টগুলোতে কন্টেনার ফেলে যেত। সেখান থেকে মাস্তানের ডাউ নৌকায় সেগুলো লোড হয়ে সোজা চলে আসত বম্বেতে। এই জন্যেই মাস্তান নিজে ফরাসি ভাষার ফ না জানলেও, তার নাগপাড়ার আস্তানায় হানা দিয়ে  কাস্টমসের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম যে ফ্রেঞ্চ চামড়া বাঁধানো ডায়েরি উদ্ধার করেছিল, শোনা যায় তাতে নাকি ফরাসি মদ ও ডকুমেন্টের জন্য সন্ধান মিলেছিল 'Vin Rouge' বা 'Cartier'-এর মতো কোড ল্যাঙ্গুয়েজের ।
  ইউরোপীয় আন্ডারওয়ার্ল্ড যেভাবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা শেল কোম্পানি দিয়ে টাকা লেনদেন করত, মাস্তানও নাকি একদম সেই ফ্রেঞ্চ মাফিয়া টু হাজি মাস্তান লজিস্টিক মডেলই প্রথম ইন্ট্রোডিউস করেছিল ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডে। এই লজিস্টিক মডেলের প্রথম পর্যায়ে ফ্রান্সের মার্সেই ও মরক্কো থেকে মিডল-ইস্টের ফ্রি পোর্ট হয়ে আরব সাগর দিয়ে কাস্রাড়া বা গোয়া উপকূলে ফরাসি লিকার, ব্র্যান্ডেড টোবাকো ও গোল্ড বার সোয়াপিং করা হত। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্যারিস ও জুরিখের কিছু নামসর্বস্ব ব্যাঙ্ক থেকে হাওয়ালা নেটওয়ার্ক ও মিডল-ইস্টের মিডলম্যানের মাধ্যমে বম্বের হাওয়ালা অপারেটর ও ফিল্ম ফাইন্যান্সে শেল কোম্পানির সাহায্যে সাদা করা হত কালো টাকা । এবং তৃতীয় পর্যায়ে ব্যবহার করা হত একদম ফ্রেঞ্চ সিন্ডিকেটের বিজনেস ম্যানুয়াল মেনে ডাউ নৌকা ও কাস্টমস ইনফর্মার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নাগপাড়া ও দক্ষিণ মুম্বইয়ের সুরক্ষিত গুদামে মাল পৌঁছে দিয়ে ইনফর্মার মারফতই রেড হওয়ার আগেই তা সরিয়ে ফেলার দুর্ধর্ষ টেকনিক ।
১৯৭০-এর দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল আবিষ্কারের পর দুবাই রাতারাতি বদলে গেল। আর সেই বদলের সুফল একেবারে যাকে বলে হাতে গরম তুলে নিল বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ড। সোনা পাচারের টাকা সাদা করার জন্য জন্ম নিল আন্তর্জাতিক হাওয়ালা নেটওয়ার্ক। নিউ ইয়র্কের কোসা নোস্ট্রা বা ইতালীয় মাফিয়ারা যে কায়দায় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য বাড়াত, বম্বের ডি-কোম্পানিও অনেক অঙ্ক কষে ঠিক একই ফর্মুলা নামাল দুবাইয়ের মাটিতে।
কিন্তু এত জায়গা থাকতে দুবাই কেন ? কারণ, দুবাই তখন ভারতীয় ডনদের জন্য এক পরম শান্তির ‘সেফ হেভেন’। হাজি মাস্তান তখন বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অবিসংবাদিত সম্রাট।  লোকজন তাকে দেখত গরিবের ত্রাতা হিসেবে—কেউ সাহায্য চাইতে গেলে সে নাকি খালি হাতে ফেরাত না। কিন্তু এই 'ভদ্রলোক' ইমেজের আড়ালেও যে কী পরিমাণ নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথার অপারেশন চলত, তার একটা দারুণ নমুনা পাওয়া যায় কাস্টমস অফিসারদের সঙ্গে তার লুকোচুরি খেলায়। তখন বম্বের উপকূলে হাজি মাস্তানের শত শত টন সোনা বোঝাই নৌকা নামছে। কাস্টমস ও পুলিশ দফতরে তার এমন ইনফর্মার নেটওয়ার্ক ছিল যে অভিযানের তোড়জোড় শুরু হওয়ার আগেই খবর পৌঁছে যেত মাস্তানের কাছে। বলছি, কিন্তু সেসব গল্পে যাবার আগে  চলুন একটু অন্য গল্প থেকে ঘুরে আসা যাক।
  মাস্তান মানুষটা কে ? হাজি মাস্তান বোম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম যুগের এমন এক কিংবদন্তি চরিত্র, যার জীবন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। একদম সাধারণ কুলির কাজ থেকে শুরু করে তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মহলের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার এই যাত্রা ভারতের অপরাধ ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
  হাজি মাস্তানের আসল নাম মাস্তান মির্জা। ১৯৪৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের পানাডু থেকে ভাগ্য অন্বেষণে বোম্বাইয়ে পা রাখে সে। প্রথমে বিখ্যাত ক্রফোর্ড মার্কেটে একটা ছোট চাকরি, পরে চলে যায়  বন্দরে । ডকইয়ার্ডে কুলির কাজ করার সুবাদে বন্দর এলাকার অলিগলি, কাস্টমস অফিসারদের গতিবিধি এবং চোরাচালানের প্রাথমিক রুটগুলোর সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ঘটে যায়। এই সময় থেকেই তার করিম লালার মতো আদি ডনদের সঙ্গে যোগাযোগ।  তারপর ধীরে ধীরে সেই হয়ে ওঠে ডাউ নৌকায় করে সোনা ও ঘড়ি চোরাচালানের সিন্ডিকেটের মাথা।
  মানতেই হবে, হাজি মাস্তান কিন্তু মোটেই ওই অঞ্চলের বাকি গ্যাংস্টারদের মতো ছিল না।  কখনোই সরাসরি অস্ত্র ধরেনি সে। রক্তপাত নাকি পছন্দই করত না। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার হওয়া সত্ত্বেও নিজে সবসময় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর চোখে কালো চশমা পরে, দামি  সুগন্ধি মেখে ঘুরে বেড়াত। স্বভাবতই বোম্বের অপরাধ জগতে তাকে বলা হত 'সাদা পোশাকের ডন'। গরিব মানুষের কাছে সে ছিল  ত্রাতা— সাহায্য চাইতে গিয়ে সচরাচর তার কাছ থেকে কখনো খালি হাতে ফিরত না কেউ। নাগপাড়ায় তার দরবারে শোনা যায়, সাধারণ মানুষের ঘর-গেরস্থালির সমস্যা থেকে শুরু করে অভাবী মেয়ের বিয়ের খরচ—সবকিছুর সমাধান মিলত। স্বভাবতই আইনের চোখে সে অপরাধী হলেও সাধারণ মানুষের মনে তার একধরনের 'রবিন হুড' ইমেজ তৈরি হয়েছিল।
  আর, মাস্তান ছিল সিনেমার অন্ধ ভক্ত । এই সূত্রেই বহু প্রযোজক-পরিচালক শোনা যায় তার কাছ থেকে নাকি নিয়মিত আর্থিক সাহায্য  নিতেন।নায়িকা মধুবালার প্রতি তার একসময়ের অন্ধ দুর্বলতা ও প্রেমের কথা আজও বলিউডে লোকমুখে ফেরে। মধুবালা মারা যাওয়ার পর মাস্তান আর বিয়ে করেনি। সিনেমার জগতের সঙ্গে এই সখ্য তাকে শুধু গ্ল্যামারই দেয়নি, শোনা যায় বহু প্রোডাকশন হাউস ও ফিল্মের আর্থিক চুক্তি তার ইশারায় চলত। পরবর্তীকালের ডন দাউদ ইব্রাহিম বা অন্যদের মতো সরাসরি বলিউডের ওপর চড়াও হওয়া বা খুনখারাবি করা মাস্তানের স্টাইল ছিল না। বরং সে সম্পর্ক ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজের সাম্রাজ্য চালাত।


১৯৭৫ সাল।  দেশে জরুরি অবস্থা জারি হল।  মিসা আইনে যে কজন বড় অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, হাজি মাস্তান ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। জেলখানার ভেতরেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় প্রবীণ নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের । জেলে থাকাকালীনই জেপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাস্তান রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে গ্যাংওয়ার বা চোরাচালান থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিল তো বটেই, ১৯৮৫ সালে 'দলিত মুসলিম সুরক্ষা মহাসংঘ' নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করে। তামিলনাড়ুর নেতা এম জি রামচন্দ্রনের  সঙ্গে তার গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তার দত্তক নেওয়া ছেলে সুন্দর শেখর লিখছে, ‘বাবা পাক্কা কংগ্রেসি ছিল। বসন্ত দাদা পাতিল, মুরলি দেওরা, সুশীল কুমার শিন্ডের মতো বড় কংগ্রেসি নেতারা বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। ১৯৮৪-তে ইন্দিরাজি মারা যাওয়ার পর বাবা যোগেন্দ্র কাওয়াড়ের সঙ্গে দলিত মুসলিম সুরক্ষা মহাসংঘ বানায়।’ তার বয়ান মানলে, ৭০ দশক থেকেই ইন্দিরাজির কাছের মানুষ হাজি মস্তান সরাসরি রাজনীতিতে আসে ’৮৫ সালে নিজের দল গঠন। এবং ’৮৯ সালের দলের নাম যায় বদলে। নাম হয় ‘ভারতীয় মাইনরিটিজ সুরক্ষা মহাসংঘ’। ইলেকশন কমিশনে রেজিস্টার্ড দল হিসাবে এখনও যে তার অস্তিত্ব নেই, তা কিন্তু নয়।
  আসলে হাজি মাস্তান ছিল সেই ধারার ডন, যে জানত কীভাবে বন্দুকের শক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে হয় ক্ষমতার করিডরে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় (১৯৯৪ সালের জুন মাসে) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার জীবনাবসান হয়, কিন্তু বোম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের রূপকার হিসেবে তার নাম ইতিহাস হয়ে চিরকাল থেকে গেছে।
  তো সে যাই হোক, হাজি মস্তানের সম্পর্কে সত্যি মিথ্যে গল্পের সংখ্যা কম নয়। শোনা যায় একবার নাকি এক কাস্টমস কমিশনার মাস্তানকে হাতেনাতে ধরার জন্য একেবারে গোপনীয় একটা ফাঁদ পাতলেন। কোনও নোটিশ ছাড়াই সোজা মাস্তানের একটি গুদামে হানা দেওয়া হল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, গুদাম খুলে অফিসাররা দেখলেন—সেখানে সোনা তো দূরের কথা, শুধু কিছু বাতিল বস্তা আর পুরানো খবরের কাগজ পড়ে আছে! পরে ফাঁস হয়েছিল, যখন রেড চলছে, খোদ কাস্টমসের সেই বড়োকর্তার অফিসে ঠিক পাশের টেবিলেই ছদ্মবেশে বসে চা খাচ্ছিল মাস্তান এবং অফিসারদের গতিবিধি নিজের পকেটের রেডিয়োতে শুনছিল। আইনের চোখে সাধু, আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের খাতায় মাস্টারমাইন্ড—এই ছিল মাস্তান।
লোকে বলে,  ঠিক এই সময় থেকেই নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নজরে পড়তে শুরু করে বম্বের হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা বলিউড।  হাজি মাস্তান যে স্বয়ং সিনেমার অন্ধ ভক্ত ছিল আগেই বলেছি। মাস্তান যে বহু প্রযোজককে টাকা দিয়ে সিনেমা বানাতেন এটাও ঘটনা। এই সূত্রে গ্যাংস্টার ও তারকাদের তখন এক অদ্ভুত এবং লোভনীয় সখ্য গড়ে ওঠে।
কিন্তু যত যা-ই হোক, হাজী মস্তান তো ছিল মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম প্রজন্মের 'ডন'।  কিন্তু সত্তরের দশকে জরুরি অবস্থার সময় হাজি মস্তানের সাম্রাজ্যে ভাটা পড়ার পেছনে কতগুলো সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছিল। চোরাচালান দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলায় আশির দশকের শুরুতে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, বিশেষত কাস্টমস, অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয়। পুরনো দিনের চোরাচালানের রুটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। মস্তান ধীরে ধীরে রাজনীতি ও সমাজসেবায় বেশি মন দেয় এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আলগা করতে শুরু করে। আর এই শূন্যতাই নতুন যুবশক্তিকে জায়গা করে দেয়। চোরাচালানের যুগ শেষ হয়ে তখন মাদক, গ্যাং ওয়ার এবং চাঁদাবাজির  যুগ শুরু হচ্ছে। পুরনো দিনের 'ভদ্রোচিত' চোরাকারবারিরা নতুন যুগের এই নৃশংসতার সঙ্গে পেরে উঠছিল না।


হাজি মস্তানের যুগ শেষ হওয়ার ঠিক আগেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে পা রেখেছিল ইব্রাহিম কাস্কারের ছেলে দাউদ ইব্রাহিম এবং তার ভাই সাব্বির ইব্রাহিম। হাজি মস্তান এবং করিম লালার যুগকে টেক্কা দিয়ে দাউদ যেভাবে ক্ষমতা দখল করল সে গল্পও একদম  রূপোলি পর্দাকে বলে বলে হার মানায়। দাউদ গোড়া থেকেই খুব ভালো করে বুঝে নিয়েছিল যে, পুরনো নিয়ম মেনে চললে এগনো যাবে না। সে প্রথমে পুরনো ডনদের প্রভাবকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঠান গ্যাং ও অন্যান্য ছোট গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে নির্মম লড়াই শুরু করে। সাব্বির ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর দাউদ আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে। যেহেতু শুধু সোনা চোরাচালানে ভবিষ্যৎ নেই বুঝে সে মাদকের বিশাল বাজারেও প্রবেশ করে এবং মুম্বই জুড়ে রিয়েল এস্টেট দখল, কন্ট্রাক্ট কিলিং ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা আদায়ের নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
হাজি মস্তান যেখানে শুধু সিনেমার প্রযোজকদের ফিনান্স করত, দাউদ সেখান থেকে আরও এক পা এগিয়ে সরাসরি সিনেমার ফাইনান্স কন্ট্রোল করতে শুরু করে এবং পরবর্তীকালে দুবাইয়ে বসেই অপরাধের সাম্রাজ্য চালাতে থাকে। ১৯৯৩ সালে মুম্বইতে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের পর দাউদ পুরোপুরি ভারতের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' ব্যক্তিতে পরিণত হয় এবং দেশ ছেড়ে চিরতরে পালিয়ে যায়। এর মাধ্যমে মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসান ঘটে এবং ডনদের যুগ বহুমুখী গ্যাংয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হাজি মস্তানের যুগ ছিল 'রোমান্টিক চোরাচালান ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভদ্রতার যুগ'। আর দাউদ ইব্রাহিমের আগমন মানেই হল 'রক্তপাত, আধুনিক অপরাধ সিন্ডিকেট, মাদক এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের এক নিষ্ঠুর সূচনা।'
 

হাজি মস্তান বা করিম লালার আমলে জমি-জায়গা দখল মানে ছিল লোকাল গন্ডগোল বা বস্তি খালি করার মতো ছোটখাটো ব্যাপার। কিন্তু দাউদ এটাকে একটা ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করে।
মুম্বইয়ের জমির দাম যখন হু হু করে বাড়ছে, তখন মিল ল্যান্ড এবং প্রাইম প্রপার্টিগুলো দখল করার জন্য দরকার ছিল পেশি শক্তি। আইনের ফাঁকফোকর, জাল দলিল এবং মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের দুর্নীতিকে কাজে লাগাত ডি-কোম্পানি। কোনও মিল বা মূল্যবান পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে উত্তরাধিকারীদের ঝামেলা চলছে তো দাউদের লোক সেখানে হাজির। হয় জলের দরে কিনে নিত, নয়তো বন্দুকের মুখে মালিককে সাইড করে দিত। এই রিয়েল এস্টেট দখলের হাত ধরেই মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড সরাসরি শহরের বিল্ডার্স লবি, রাজনৈতিক দল এবং কর্পোরেট জগতের সঙ্গে মিশে গেল। জমি কেনার কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল এই রিয়েল এস্টেট।
চোরাচালানের যুগে টাকা পাচারের জন্য সোনা বা হিরের হাতবদল হত। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে অপরাধ চালাতে গেলে ক্যাশ মুভমেন্টের গতি বাড়াতে হবে। এখানেই দাউদ মাস্টারস্ট্রোক দিল 'হাওয়ালা' নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। মুম্বই থেকে টাকা দুবাই, করাচি বা ইউরোপে পৌঁছনোর জন্য আর কোনও ব্যাঙ্কের দরকার হত না। মুম্বইয়ের পেডার রোড বা নাকডারার কিছু হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে ক্যাশ জমা দিলেই পাসওয়ার্ড বা নির্দিষ্ট কোডের টোকেন (যেমন একটা ছেঁড়া দশ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বর) দেখিয়ে দুবাইয়ের অন্য প্রান্তে সেই টাকা তুলে নেওয়া যেত। মিনিটের মধ্যে পারাপার হত কোটি কোটি টাকা। এই গোপন অর্থনৈতিক ধমনীর ওপর ভর করেই দাউদ দুবাইয়ে বসে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্য রিমোট কন্ট্রোলে চালাতে পেরেছিল। সরকারি নজরদারির বাইরে এই প্যারালাল ইকোনমি পুরো সিস্টেমটাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। হাজি মস্তান ড্রাগস বা মাদকের কারবারে সরাসরি হাত দিতে রাজি ছিল না। তার  নিজস্ব 'নীতি' ছিল যে, সোনা-টোনা চোরাচালান ঠিক আছে, কিন্তু মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করে—তাই ওটা ছোঁওয়া যাবে না। দাউদ এই নীতিকেই বুড়ো আঙুল দেখাল। আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ইরান হয়ে ছড়িয়ে থাকা 'গোল্ডেন ক্রিসেন্ট' থেকে হেরোইন এবং ব্রাউন সুগারের চালান মুম্বাইয়ের বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার হতে শুরু করল। দাউদ বুঝল মাদকের বাজারে মার্জিন প্রফিট সবচেয়ে বেশি। ফলে পুরনো আমলের চোরাচালান ছেড়ে এই হাই-রিস্ক, হাই-প্রফিট মাদকের কারবার ডি-কোম্পানিকে রাতারাতি কোটিপতি বানিয়ে দিল। এর সঙ্গেই হাত ধরাধরি করে এল রক্তক্ষয়ী গ্যাং ওয়ার, কারণ মাদকের পাইকারি নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে একের পর এক খুনখারাপি শুরু হল।
হাজি মস্তান বা দাউদের গল্পের ঠিক পরের চ্যাপ্টারটাই হল রাজন মদন থমাস অর্থাৎ ছোটা রাজনের উত্থান। মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে এই ছোটা রাজন একটা অত্যন্ত জটিল এবং হিংস্র চরিত্র। মুম্বাইয়ের ঘাটকোপার এলাকার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত তামিল পরিবারে জন্ম নেওয়া রাজনের অপরাধজগতে হাতেখড়ি হয়েছিল ছোটখাটো চোরাচালান এবং সিনেমা টিকিটের কালোবাজারির মাধ্যমে। আশির দশকের শুরুতে মুম্বইয়ের গ্যাংস্টার 'বড়া রাজন'-এর সংস্পর্শে এসে সে আন্ডারওয়ার্ল্ডে পাকাপাকি জায়গা করে নেয়। তখন থেকেই তার নাম হয় 'ছোটা রাজন'। ১৯৮২ সালে বড়া রাজন পুলিশের এনকাউন্টারে কিংবা প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের হাতে খুন হওয়ার পর ছোটা রাজন ওই গ্যাংয়ের নিরঙ্কুশ প্রধান হয়ে ওঠে।
  ঠিক এই সময়টায় দাউদ ইব্রাহিম মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করছে। দাউদ বুঝতে পেরেছিল, মুম্বইয়ের মারাঠি ও দক্ষিণ ভারতীয় গ্যাংগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে রাজনের মতো কাউকে পাশে দরকার। দুইয়ে মিলে তৈরি হল এক অজেয় জুটি। রাজন হয়ে উঠল দাউদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ডানহাত—যে কিনা মুম্বইয়ের  আন্ডারওয়ার্ল্ডের খুনখারাপির দিকটা সামলাত।
  আশির দশকের শেষভাগে দাউদ যখন দুবাইয়ে বসে পুরো সাম্রাজ্য চালাচ্ছে, তখন মুম্বইয়ের মাটিতে ডি-কোম্পানির সমস্ত অপারেশনাল দায়িত্ব ছিল ছোটা রাজনের কাঁধে। দাউদ যদি হয় সিন্ডিকেটের 'সিইও', তবে ছোটা রাজন ছিল তার 'চিফ অফ অপারেশনস'। জমি-বাড়ি দখল, সুপারি কিলিং এবং তোলাবাজির মতো কাজগুলো রাজন নিজের হাতে হ্যান্ডেল করত।
ডি-কোম্পানির একটা বড় সুবিধা ছিল তাদের মাল্টি-এথনিক বা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। দাউদের ডানহাত হিসেবে রাজন প্রমাণ করে দিয়েছিল যে অপরাধজগতে ধর্মের কোনো বর্ডার নেই। কিন্তু এই সমীকরণই কিছুদিনের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। ছোটা রাজনের জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট এবং দাউদের সঙ্গে তার চিরতরে সম্পর্কচ্ছেদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে ১৯৯৩ সালের মুম্বাইয়ে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে।
দাউদ যখন আইএসআই এবং পাকিস্তান সরকারের মদতে মুম্বইয়ে বোমা হামলা চালায়, তখন সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। রাজন মনে করেছিল এটা শুধু অপরাধ নয়, সরাসরি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। 

এখানেই দুজনের আদর্শগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য চরমে ওঠে। দাউদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় রাজন দুবাই বসেই ডি-কোম্পানি থেকে বেরিয়ে ব্যাঙ্কক চলে যায়। গিয়ে নিজের আলাদা গ্যাং তৈরি করে এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে সে এখন দাউদ ও তার গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়বে। স্বভাবতই দাউদও এই বিশ্বাসঘাতকতা সহজে মেনে নেয়নি। ২০০০ সালে ব্যাঙ্ককে ছোটা রাজনকে হত্যার জন্য আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিখ্যাত শার্পশুটার ছোটা শাকিল ও তার লোকজনকে পাঠিয়েছিল। রাজন গুরুতর আহত হলেও সুকৌশলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বেঁচে যায়। এই ঘটনার পর থেকে দাউদ ও রাজনের লড়াই আন্ডারওয়ার্ল্ডকে রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
  দাউদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে রাজন এক অদ্ভুত চাল চালে—সে গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW) এবং ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির ইনফর্মার বা অলিখিত সহযোগী হয়ে ওঠে। দাউদের সাম্রাজ্যের অনেক গোপন তথ্য সেই ভারতীয় এজেন্সিকে পাচার করত। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ভারতে এনে তিহার জেলে বন্দি করা হয়, যেখানে সে দীর্ঘদিন ধরে সাজা ভোগ করছে।
   এদিকে দাউদ ইব্রাহিম যখন দুবাইয়ে গিয়ে বসল, তখন তার সঙ্গে লাতিন আমেরিকার কার্টেল বা ইতালির অপরাধ চক্রের কোনও ফারাক রইল না। আফিম, হেরোইন আর অস্ত্রের রমরমা বাজারে বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনরা কখনোই একলা খেলেনি। সিসিলিয়ান মাফিয়াদের মধ্যে বিখ্যাত 'ওমের্তা'র  মতো বম্বের ডনরাও রক্ত দিয়ে গাঁটছড়া বেঁধেছিল আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্লোবাল কর্পোরেশনে পরিণত হচ্ছে, তখন ইতালির গ্যাং ও লাতিন আমেরিকার ড্রাগ লর্ডদের সঙ্গে ডি-কোম্পানির যোগাযোগ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছয় যা এককথায় গা শিউরনো। ইতালির কালাব্রিয়া  অঞ্চলের কুখ্যাত অপরাধ চক্র 'নড্রাঙ্গেটা' এবং সিসিলির মাফিয়া পরিবারের সঙ্গে করাচির আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি ডিলিং শুরু হয়েছিল আফগান হেরোইন ও সোনালি চতুর্ভুজের রুট ধরে। সিসিলির মাফিয়ারা আটলান্টিক রুট দিয়ে আমেরিকায় পাচারের যে মডেলে অভ্যস্ত ছিল, মুম্বইয়ের গ্যাংস্টাররা ঠিক সেই একই ফর্মুলা নামাল ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে। ইতালীয় ডনরা ইউরোপের ব্যাঙ্কগুলোর শেল কোম্পানি মারফত যেভাবে কালো টাকা সাদা করত, হাজি মাস্তানের দেখানো পথে দাউদ গ্যাং সেই একই বিশ্বমানের হাওয়ালা এবং ব্যাঙ্কিং ফাঁদ পাতা শুরু করল দুবাই ও জুরিখের মাটিতে।
  আন্ডারওয়ার্ল্ড আর ক্রিকেটের অমর প্রেমের পাশাপাশি তখন সেলুলয়েডের দুনিয়াতেও দাউদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছে।  শারজায় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ফাইনাল চলছে। স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখছে তৎকালীন আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম। পকেটে তার বন্দুক, আর চারপাশে আরব শেখদের বডিগার্ড। খেলা শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়ামের বাইরে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের এক ডিনার পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। দল যখন সেখানে পৌঁছল, তখন সুনীল গাভাসকর, কপিল দেবদের মতো তারকাদের চোখ কপালে উঠল! খবর এল, দাউদ ইব্রাহিম নিজে এসে হাজির হয়েছে এবং ডিনারে উপস্থিত ভারতের প্রতিটি ক্রিকেটারকে সে মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি উপহার দিতে চায়! দলের তৎকালীন এক সিনিয়র ক্রিকেটার সাহসিকতার সঙ্গে সোজা মুখের ওপর জানিয়ে দিলেন, আমাদের গাড়ি কেনার সামর্থ্য আছে, আপনার এই উপহার আমাদের লাগবে না।
  শারজার সেই ঐতিহাসিক রাতের পর দাউদের অহঙ্কার আঘাত পেলেও, আসল টুইস্ট ঘটেছিল তার ঠিক দুদিন পর। সেই ম্যাচের পর ভারতের তৎকালীন টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে দুবাইয়ের এক নামী জুয়েলারি হাউসের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে একটি 'ক্ষমা প্রার্থনা বার্তা' পাঠানো হয়েছিল—যেন এই প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে ভারতীয় মিডিয়া বা রাজনৈতিক মহলে বাড়িয়ে না বলা হয়। আন্ডারওয়ার্ল্ড তখন বুঝতে পেরেছিল, টাকা দিয়ে সব কেনা গেলেও ভারতীয় ক্রিকেটের সেই প্রজন্মের 'জাত' কেনা যায়নি। আবার একই সঙ্গে সেই প্রথম এও বোঝা গিয়েছিল যে, বম্বের গ্যাংস্টাররা কেবল স্থানীয় চাঁদাবাজ নয়, তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের পকেট থেকে গেম চালানোর ক্ষমতাও রাখে।
আশির দশক গোড়াতেই বলিউড আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সখ্য আর মিষ্টি সম্পর্কে রইল না; তা পুরোপুরি জবরদস্তি, চাঁদাবাজি এবং রক্তের খেলায় পরিণত হল। মাফিয়ারা শুধু সিনেমায় টাকা দেওয়াই নয়, ছবির স্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে কোন অভিনেতা কোন ছবি করবে বা করবে না, তা ঠিক করতে শুরু করল। এবং এই সময়েই টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা ও মিউজিক মুঘল গুলশান কুমার যখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের তোলাবাজদের চাহিদা মেটাতে অস্বীকার করলেন, তখন ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রির ব্ল্যাক মানি এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডিস্ট্রিবিউশন মনোপলির লড়াইয়ের জেরে আবু সালেম ও ছোটা শাকিলের নির্দেশে আন্ধেরি এলাকার একটি মন্দিরের বাইরে তাঁকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে খুন করা হয়।  টি-সিরিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ও মিউজিক রাইটসের স্থায়ী 'কাট' বা পার্সেন্টেজ আদায় করতেই এই  দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছিল। এই ঘটনাটি কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা বলিউডকে। নির্মাতারা বুঝতে পেরেছিলেন, প্রোডাকশন হাউসের চেয়ারে বসে থাকা ডনদের মুখের ওপর 'না' বলা মানেই মৃত্যু পরোয়ানা সই করা।
১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের আগে দাউদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার অভিযোগে অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের গ্রেপ্তার হওয়াও বলিউডকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সিনেমার পর্দার 'নায়ক' আর বাস্তব জীবনের আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ভিলেন'-এর এই মেলবন্ধন রাতারাতি ভারতের বিচার ব্যবস্থা ও মিডিয়ার সামনে চলে আসে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে যখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকি চরমে, তখন বেশ কয়েকজন তারকা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন। ২০০১ সালে 'চোরি চোরি চুপকে চুপকে' ছবির প্রযোজকের ওপর আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাপ সৃষ্টির ঘটনায় যখন মামলা হয়, তখন বলিউডের প্রথম সারির তারকারা, যেমন প্রীতি জিন্টা, শাহরুখ খান, রাকেশ রোশন প্রমুখ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। রাকেশ রোশনকে এর আগে গ্যাংস্টাররা গুলিও করেছিল, কিন্তু পুলিশ ও আদালতের কড়া অবস্থানের কারণে সেই ত্রাসের রাজত্ব ভাঙতে শুরু করে।
  নব্বইয়ের দশকে বম্বের অপরাধ জগত এক ভয়ঙ্কর মোড় নিল। এতদিনকার চোরাচালান আর গ্যাংওয়ারের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে মাফিয়ারা এবার সোজা ঢুকে পড়ল ভূ-রাজনীতির রক্তক্ষয়ী খেলায়। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফাটল ধরল। দেশপ্রেমের জিগির তুলে ছোটা রাজন সরে দাঁড়াল দাউদের সাম্রাজ্য থেকে।
ঠিক তার আগেই কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের অস্ত্রভাণ্ডারে এসেছে আমূল পরিবর্তন। নব্বইয়ের দশকের শুরু—দাউদ আর রাজনের মধ্যে তখনও বিচ্ছেদ ঘটেনি। আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডি-কোম্পানির একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করার জন্য তারা একে একে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোকে খতম করছে। এরকমই এক রাতে বম্বের গ্রান্ট রোড এলাকায় এক নামী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর বাড়িতে হানা দেয় ডি-কোম্পানির কিলার স্কোয়াড। টার্গেট ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের মদতদাতা এক মাফিয়া। শুটারদের হাতে একে-৪৭ এর মতো আধুনিক অস্ত্র। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে এই প্রথমবার বম্বের প্রকাশ্য রাস্তায় রুদ্ধশ্বাস ব্রাশফায়ার করা হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে রক্ত আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে, পুরো ঘরটা যেন একটা কসাইখানা। এই ঘটনার পরেই বম্বের মানুষ প্রথম বুঝতে পেল যে আন্ডারওয়ার্ল্ড আর স্রেফ বোমা, চপার বা পিস্তলের লড়াইয়ে আটকে নেই; আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে হাত বাড়িয়ে তারা এমন এক ভয়ংকর শক্তির জন্ম দিয়েছে, যা নিমেষে গোটা শহরকে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে।
  ঠিক এর কিছুদিন পরেই দাউদ ইব্রাহিম সোজা গিয়ে আশ্রয় নিল পাকিস্তানে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা  সংস্থা আইএসআই-এর ছাতার তলায় বসা আন্ডারওয়ার্ল্ড তখন আর কেবল অপরাধচক্র রইল না, তা ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতার গ্লোবাল অস্ত্রে পরিণত হল। কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবারের মতো দাউদও পাকিস্তানের মাটিতে  দক্ষিণ এশিয়ার প্রক্সি ওয়্যার ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচারের একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে বসল। জাল নোট তৈরি থেকে আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচার—সবকিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দু তখন করাচি ও করাচির পেছনের অদৃশ্য হাত।
  সবচেয়ে রোমহর্ষক ব্যাপার হল এই ডনদের পারস্পরিক যোগসাজশের পদ্ধতি। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়, ঠিক যখন বম্বের গ্রান্ট রোডের মাটিতে একে-৪৭ এর ব্রাশফায়ার চলছে, তার ঠিক সমসাময়িক সময়ে ইউরোপের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দাউদের এক বিশেষ শীর্ষ বৈঠক বসেছিল তৎকালীন ইউরোপের এক গোপন আস্তানায়। সেখানে উপস্থিত ছিল মেক্সিকান কার্টেলের কিছু মোস্ট ওয়ান্টেড প্রতিনিধি এবং ইতালীয় মাফিয়ার সিন্ডিকেট বস। সেই বৈঠকে ঠিক হয়েছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রক্সি ওয়্যার, নকল নোটের বিস্তার এবং গ্লোবাল অস্ত্র পাচারের গ্র্যান্ড ব্লুপ্রিন্ট কীভাবে এক্সিকিউট করা হবে। একদম কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবারের কায়দায় ব্যক্তিগত প্রাইভেট আর্মি এবং রাষ্ট্রহীন শক্তির মতো ডনরা নিজেদের স্বাধীন সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল। ইতালির মাফিয়ারা যেমন স্থানীয় জাজ বা পুলিশ কমিশনারদের ওপর গ্যাংওয়ারের আঁচ পড়তে দিত না, বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডও ঠিক সেই কায়দায় শহরের ওপরতলার ক্ষমতার করিডরে নিজেদের অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে রেখেছিল।
  নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বম্বে পুলিশের এনকাউন্টার স্কোয়াড (প্রদীপ শর্মা, দয়া নায়ক কিংবা বিজয় সালস্কাররা) যখন একে একে গ্যাংস্টারদের খতম করছিল, তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে, এই পুলিশ অফিসারদের একটা বড় অংশকে নাকি পরোক্ষভাবে ফাণ্ড করছে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংস্টার ছোটা রাজন! দাউদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অংশ পুলিশকে ব্যবহার করছিল । গ্রান্ট রোডের সেই রক্তক্ষয়ী একে-৪৭ ব্রাশফায়ারের পর যখন পুলিশ একের পর এক আন্ডারওয়ার্ল্ড শ্যুটারদের এনকাউন্টার করতে শুরু করে, তখন অনেক গ্যাংস্টার ভয়ে পুলিশের কাছে নিজে থেকেই আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিল, যাতে অন্তত ক্রসফায়ারে মরতে না হয়। মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি এটাই—যে পুলিশ একদিন গ্যাংস্টারদের পকেট ভরত, তারাই আবার নব্বইয়ের দশকে সেই গ্যাংস্টারদের মাথার দাম ঠিক করে ডায়েরির পাতা কালো করেছিল।


  আজকের মুম্বইয়ের রাজপথে বা রুপোলি পর্দায় সত্তর বা আশির দশকের সেই গ্যাংওয়ারের গুলির বা হুমকির শব্দ আর তেমন শোনা যায় না। মহারাষ্ট্র পুলিশের এনকাউন্টার স্কোয়াড, কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং বলিউডের কর্পোরেটাইজেশন মাফিয়াদের কোণঠাসা করে দিয়েছে। অপরাধ দুনিয়ার কিন্তু অবসান ঘটেনি, বরং তার রূপ হয়েছে আরও বেশি ইন্টেলেকচুয়াল এবং গ্লোবাল।
বর্তমান যুগের আন্ডারওয়ার্ল্ড আর ডোংরি বা নাগপাড়ার গলি কিংবা ফিল্ম সিটির মেকআপ রুমেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের ড্রাগ সিন্ডিকেট, পূর্ব ইউরোপের সাইবার হ্যাকার গ্যাং এবং পূর্ব এশিয়ার ক্রিপ্টো মানিলন্ডারিং চক্রের সঙ্গে সেল-ভিত্তিক মডেলে কাজ করছে বম্বের পুরনো মাফিয়া নেটওয়ার্ক। দুবাই বা ইউরোপের বিলাসবহুল ভিলা থেকে এনক্রিপ্টেড চ্যাট অ্যাপে এখন হুকুম জারি হয়। রাশিয়ান মাফিয়া বা মেক্সিকান কার্টেলদের মতো আজকের মুম্বই-সংশ্লিষ্ট অপরাধ চক্রগুলোও ফিনটেক ও ব্লকচেইনের যুগে অদৃশ্য থেকেই চালাচ্ছে তাদের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য।
  পর্তুগিজদের দেওয়া 'বম বাইয়া' থেকে ব্রিটিশদের 'বম্বে', আর সেখান থেকে আজকের 'মুম্বই'—নাম বদলালেও আরব সাগরের এই মহানগরের পেটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার ইতিহাসটি চিরকালই রোমহর্ষক। গোড়ার সেই কাঠের নৌকার বৈঠা, হাজি মাস্তানের ফ্রেঞ্চ কানেকশন ও ছদ্মবেশে চা খাওয়ার কায়দা, শারজার ফ্লাডলাইটে মার্সিডিজের প্রস্তাব, গুলশানের রক্তে ভেজা সকাল, আন্তর্জাতিক কার্টেল ও ইতালীয় মাফিয়াদের সেই সমান্তরাল ছায়া, পুলিশের এনকাউন্টার ফাইলের হিসাব থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল ডার্ক ওয়েবের স্ক্রিন—বম্বের মাফিয়া ও সিনেমার এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষমতার লোভ, ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচ এবং অপরাধের সঙ্গে গ্ল্যামারের এক অবিচ্ছেদ্য নাড়ির টান।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top