তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আয়কর আইন ২০২৫

ডিজিটাল সংস্কারের নামে কি মধ্যবিত্ত ও প্রবীণদের পকেট কাটা?

পয়লা এপ্রিল, ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি 'এপ্রিল ফুল' হলেও, ভারত সরকারের আয়কর দপ্তর কিন্তু মোটেই কোনো রসিকতা করছে না। আজ থেকে কার্যকর হল নতুন 'আয়কর আইন ২০২৫'। ১৯৬১ সালের সেই মান্ধাতা আমলের আইনকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে মোদি সরকার যে 'আধুনিক' ব্যবস্থার ঢাক পেটাচ্ছে, তার পর্দা ফাঁস করলে কী উঠে আসছে? এটা কি সত্যিই করদাতার স্বস্তি, নাকি এক চতুর ডিজিটাল খাঁচা?

এতদিন 'ফিনান্সিয়াল ইয়ার' আর 'অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার'-এর গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষ হাবুডুবু খেতেন। নতুন আইন সেই জটিলতা কাটিয়ে এনেছে একক 'ট্যাক্স ইয়ার'। সরকার একে 'সরলীকরণ' বললেও মূল প্রশ্নটা হল, আসলে এটি করদাতাদের ওপর রিয়েল-টাইম নজরদারি চালানোর এক ব্রহ্মাস্ত্র কিনা। যে বছরের আয়, সেই বছরেই কর --- এই হিসেবটা অবশ্যই পরিষ্কার, কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য ট্যাক্স প্ল্যানিংয়ের সময়টুকুও কেড়ে নেওয়া হল এটাও কি একই সঙ্গে ঘটনা নয় ?

নতুন কর কাঠামোয় ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয়ে কোনো কর দিতে হবে না (রিবেট সহ)। শুনতে পাহাড়প্রমাণ ছাড় মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্রূর সত্য। পুরনো কর কাঠামোর (Old Regime) সেভিংস বা বিনিয়োগের সুযোগগুলোকে পর্যন্ত কার্যত গলা টিপে মারা হচ্ছে। ২৪ লক্ষ টাকার ওপর আয় করলেই দিতে হবে সোজা ৩০%। মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কি আদতে কমল? নাকি স্লাবের অঙ্কে স্রেফ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া হল ?

অশীতিপর পেনশনভোগীদের চশমা দিয়ে দেখলে এই আইন আসলে এক প্রকারের 'আর্থিক অবমাননা'। সারা জীবন কষ্ট করে জমানো ফিক্সড ডিপোজিট (FD)-র ওপর নির্ভর করে যাঁদের সংসার চলে, মুদ্রাস্ফীতির বাজারে তাঁদের জন্য এই নতুন আইনে কোনো বিশেষ রক্ষাকবচ নেই। সরকার সঞ্চয়ে উৎসাহ দেওয়ার বদলে পরোক্ষভাবে প্রবীণদের বাধ্য করছে শেয়ার বাজারের ঝুঁকিপূর্ণ F&O (Future & Options)-এ টাকা ঢালতে, যেখানে লেনদেনের কর (STT) আজ থেকেই বাড়ানো হয়েছে। এ যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ ।

চিলড্রেনস এডুকেশন এলাওয়েন্স বা হোস্টেল এলাওয়েন্সের সীমা বাড়ানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সামান্য ছাড় 'সমুদ্রে বারিবিন্দু' ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়ামের ওপর জিএসটি (GST) কমানোর কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার দোহাই দিয়ে তাঁদের ওপর যে প্রযুক্তির বোঝা চাপানো হচ্ছে, তাতে সাইবার ফ্রড বা ভুল রিটার্ন দাখিলের আতঙ্ক প্রতি মুহূর্তে তাঁদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

একটা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে, ছোটখাটো ভুলকে এখন আর 'ফৌজদারি অপরাধ' বলা হবে না। ১০% জরিমানা দিয়ে ভুল শুধরে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ, জেলে ঢোকানোর ভয় দেখিয়ে নয়, বরং জরিমানা আদায় করেই রাজকোষের পেট ভরতে চায় কেন্দ্র।

আয়কর আইন ২০২৫ আসলে এক 'স্মার্ট' গোলকধাঁধা। যেখানে কাগজের ভিড় কমেছে ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তির অদৃশ্য ফাঁস আরও শক্ত হয়েছে। সঞ্চয় বিমুখ এই নতুন ব্যবস্থা কি আমাদের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই গেল।


Scroll to Top