
পুদুচেরির সমুদ্র হাওয়ায় এখন আর শুধু নোনার গন্ধ নেই। ভাসছে কাঁচা টাকার গন্ধ। লটারির স্ক্র্যাচকার্ডে অভ্যস্ত যে আঙুল এতদিন কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখত, ২০২৬-এর ভোটে সেই আঙুলই এখন ইভিএমের বোতামে চাপ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এ ভোটে লটারি জিতবেন না ভোটার—জিতবেন একজনই। নাম তাঁর সান্তিয়াগো মার্টিন। এবং তাঁর সংস্থা ফিউচার । তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া যে তথ্য প্রকাশ করেছে সেই অনুযায়ী এরা নির্বাচনী বন্ড কিনেছে ১৩৬৮ কোটি টাকার। এই নির্বাচনী বন্ডে যে দলগুলি সব থেকে বেশি টাকা পেয়েছে তার মধ্যে আছে বিজেপি, কংগ্রেস, টিএমসি এবং অন্যান্যরা। দক্ষিণ ভারতের দলগুলির মধ্যে ডি এম কে এই হিসেবে এগিয়ে রয়েছে। একমাত্র সিপিআই, সিপিআইএম সহ বাম দলগুলি এই বন্ডের সুযোগ নেয়নি। পরে অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট এই নির্বাচনী বন্ডকে অসংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন এবং হিসেব বলছে
পুদুচেরির নির্বাচন এ বার আদর্শের লড়াই নয়—এ যেন এক পরিবারের পলিটিক্যাল ইনস্যুরেন্স পলিসি।
ছেলে জোসে চার্লস মার্টিন ‘ভিশন ২০৫০’-এর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। পুদুচেরিকে ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘ডেনমার্ক’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর হলফনামার সংখ্যাগুলোই এখন বেশি আলোচনায়—তিনি ও তাঁর স্ত্রীর ঘোষিত সম্পত্তি প্রায় ৬১০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৪৫ কোটির হিরে, ৩৮ কোটির লাক্সারি ঘড়ি, ১৭.৫ কেজি সোনা।
প্রশ্ন উঠছে—এটা কি নির্বাচন, না বহুস্তরীয় রাজনৈতিক বিনিয়োগ?
পুদুচেরিতে জোসে চার্লসের দল লাচ্ছিয়া জননায়গা কাচ্চি (LJK) রয়েছে এন ডি এ জোটে। জোটের প্রধান শক্তি আর কেউ নয়, খোদ বিজেপি।
৩০ আসনের বিধানসভায় LJK পেয়েছে দুটি আসন।
নিজে লড়ছেন কামরাজ নগর কেন্দ্র থেকে।
এদিকে পাশের রাজ্য তামিলনাড়ুতে তাঁর মা লিমা রোজ মার্টিন এখন এআইএ ডিএমকে - র প্রার্থী। লালগুড়ি কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়ছেন। ভোটের ঠিক আগে ছোট দল LJK ছেড়ে সরাসরি এআইএডিএমকে-র মূল স্রোতে প্রবেশ—এটাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
আর পরিবারের জামাই আধাভ অর্জুন?
তিনি আবার তামিল সুপারস্টার বিজয়ের দল Tamilaga Vettri Kazhagam-এর জেনারেল সেক্রেটারি।
অর্থাৎ—
পুদুচেরিতে এনডিএ,
তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে,
আর একই সঙ্গে টিভিকে : এক পরিবারের রাজনৈতিক উপস্থিতি তিন আলাদা ফ্রন্টে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, 'এ যেন লটারি সাম্রাজ্যের বহুমুখী রাজনৈতিক বিনিয়োগ।'
জোসে চার্লস নিজেই হলফনামায় জানিয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে Enforcement Directorate, National Investigation Agency-সহ একাধিক তদন্ত সংস্থার মামলা। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালাতেও অভিযোগ ঝুলছে।
তবু রাজনীতির দরজা বন্ধ হয়নি।
পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী এন. রঙ্গস্বামী প্রথমে LJK-কে জোটে নিতে আগ্রহী ছিলেন না বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি। পরে নাকি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন অমিত শাহ। তার পরই জোটে জায়গা পায় LJK। মাত্র ৩০ আসনের বিধানসভা। এখানে দু’একটি আসনই সরকার গঠন বা পতনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
এক সমীক্ষা বলছে ,পুদুচেরির ভোটাররা এখন প্রতীক নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই বাস্তবতা বিজেপির কাছে যেমন সুযোগ, তেমনই ঝুঁকিও।
কারণ দক্ষিণ ভারতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইলে পুদুচেরিকে ‘গেটওয়ে’ হিসেবেই দেখতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
সুতরাং প্রশ্নটা এখন একটাই,
পুদুচুচেরি কি সত্যিই বিজেপির দক্ষিণ জয়ের সূচনা হতে চলেছে?
নাকি আবারও প্রমাণ হবে—দক্ষিণ ভারতের রাজনীতি এখনও দিল্লির কৌশলের বাইরে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
পুদুচেরির ভোটার কি প্রতিনিধি বেছে নেবেন?
না কি এক লটারি সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার ড্র-তে নিজেদের ভোট জমা রাখবেন?