
উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গের সীমান্ত—বাতাসে বারুদের গন্ধ নেই, তবু আতঙ্ক আছে। সেই আতঙ্কের নাম—পরিচয় হারানোর ভয়। ভোটার তালিকা থেকে নাম উধাও হওয়ার ভয়। নাগরিক হয়েও ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে যাওয়ার ভয়।
নির্বাচন কমিশনের ‘ক্লিনিং ড্রাইভ’—শুনতে নিরীহ প্রশাসনিক শব্দবন্ধ। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই? নাকি এর আড়ালে চলছে এক সুপরিকল্পিত ডেমোগ্রাফিক পুনর্গঠন—যেখানে কাগজের সূক্ষ্ম কাটাছেঁড়ায় বদলে দেওয়া হচ্ছে ভোটের অঙ্ক?
কোচবিহারের শীতলকুচি, দিনহাটা, সিতাই—বা উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, ইসলামপুর—এমনকি দক্ষিণবঙ্গের বনগাঁ—প্রতিটি সীমান্ত অঞ্চলে একই ছবি। হাজার হাজার নাম রাতারাতি ‘ডিলিটেড’, ‘শিফটেড’ বা ‘সন্দেহজনক’ হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নটা এখানেই—ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে নাগরিকত্ব কি এখনও কাগজের বানান ভুলের কাছে পরাজিত?
সরকারি যুক্তি বলছে—মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবের অঙ্ক বলছে অন্য কথা। যেখানে নতুন ভোটার যোগ হওয়ার হার ৫% ছুঁতে পারত, সেখানে কিছু বুথে উল্টে ১.৫% থেকে ২% পর্যন্ত কমে গেছে ভোটার সংখ্যা। কোচবিহারের নির্দিষ্ট ব্লকগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার নাম বাদ পড়ার ঘটনায় বড় অংশই রাজবংশী এবং স্থানীয় বাসিন্দা।
তাহলে প্রশ্ন—যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই মাটিতে বাস করছেন, তাঁরা হঠাৎ ‘শিফটেড’ হলেন কবে এবং কীভাবে?
আরও উদ্বেগজনক ছবি উত্তর দিনাজপুরে। চোপড়া ও ইসলামপুরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রায় ১৫ হাজারের বেশি নাম ‘ভেরিফিকেশন পেন্ডিং’। অর্থাৎ তাঁরা এখনো নাগরিক কি না, সেটাই অনিশ্চিত। ডিজিটাল পোর্টালে বানান ভুল, নথির অস্পষ্টতা—এইসব ‘প্রযুক্তিগত’ কারণে যাঁদের নাম বাদ পড়ছে, তাঁদের সিংহভাগই প্রান্তিক, দরিদ্র, এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষ।
এখানেই উঠছে বড়ো প্রশ্ন যে, এটা কি শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি ? নাকি লক্ষ্যভিত্তিক বাছাই?
কোচবিহারের সীমান্ত ব্লকগুলিতে গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এবারের ড্রাফট রোলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়ছে। নতুন ভোটার বৃদ্ধির বদলে ৩–৪% পর্যন্ত সরাসরি নাম ‘ডিলিটেড’। আর সেই কাটছাঁটের বড় অংশই রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকায়—যেখানে ‘Dead’ বা ‘Shifted’ ট্যাগ সবচেয়ে বেশি।
এই প্রবণতা কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটা রাজনীতির অঙ্ক। কারণ, সীমান্ত জেলার ভোটই ঠিক করে দেয় ক্ষমতার ভারসাম্য। সংখ্যালঘু, আদিবাসী, রাজবংশী—এই তিন স্তম্ভের ভোট ব্যাঙ্কে সামান্য পরিবর্তন মানেই গোটা নির্বাচনী ফলাফল বদলে যেতে পারে। তাহলে কি এই নীরব নাম কাটা আসলে নির্বাচনের আগের ‘সফট রিগিং’? কাগজে-কলমে নয়, ডেটাবেসেই বদলে দেওয়া হচ্ছে ভোটের মানচিত্র , যাতে আর কখনোই এই ছবিতে বদল না করা যায় ?
প্রশাসনের যুক্তি যতই নিরপেক্ষতার কথা বলুক, বাস্তবের প্রশ্নগুলো কিন্তু ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। কারণ, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো শক্তি—ভোটাধিকার। আর সেই অধিকারই যদি নিঃশব্দে খর্ব হয়, তাহলে গণতন্ত্রের উৎসব কি সত্যিই উৎসব থাকে ? নাকি তা পরিণত হয়—এক নিঃশব্দ উচ্ছেদের মহড়ায়?