
'আমার স্বামী মজুরি চেয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে' - ডিএমকে-র সেই অত্যন্ত জনপ্রিয় স্লোগান যা মুহূর্তে মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। প্রয়াত কবি কুদিয়ারাসু, যিনি ভাইকোর এমডিএমকে-তে যাওয়ার আগে ডিএমকে-র সঙ্গে ছিলেন, তাঁর কথায় প্রায়ই ফিরে ফিরে আসত কীভাবে ডিএমকের প্রবীণ নেতা এম. করুণানিধির তৈরি এই স্লোগান ১৯৬৭ র বিধানসভা নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
ডিএমকে সেই নির্বাচনে জিতেছিল কেবল নয়, ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে তামিলনাড়ু রাজনীতিতে প্রায় মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তবে ডিএমকে-র ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ কিন্তু মোটেই চোখের পলকে হয়নি। ১৯৪৯ সালে তৈরি এই দলটিকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে ১৮টা ঘাম ঝরানো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে, এম.জি. রামচন্দ্রনের কাছে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, এই দল ১৩ বছরের জন্য বিরোধী আসনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
আন্নাদুরাইয়ের ক্যারিশমা এবং বাগ্মিতার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করা ছাড়াও ডিএমকে-র একঝাঁক বাকপটু নেতাও ছিলেন, যাঁদের পেছনে ছিল এক শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। দল গোটা তামিলনাড়ুর মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাতে পারত, যেখানে অবশ্য ভাষার প্রতি আবেগ প্রায়ই অন্যান্য বিষয়ের ঊর্ধ্বে চলে যেত। তাঁদের সঙ্গে কংগ্রেস তাল মেলাতে পারত না।

আন্নার মৃত্যুর পর, অনুগামীদের কাছে 'কালাইনার' হিসেবে সমাদৃত করুণানিধি নিজেকে আদর্শ উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। করুণানিধির রাজনৈতিক দক্ষতা এবং বিচক্ষণতার সামনে ম্লান হয়ে গিয়েছিলেন অন্য নেতারা। একের পর এক নির্বাচনে তিনি অসম্ভব দূরদৃষ্টির সঙ্গে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তো বটেই, এমনকি পরাজয়ের পরেও সংগঠনের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। যদি ক্ষমতাচ্যুতি এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ডিএমকে-কে তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করতে না পেরে থাকে, তবে তার কৃতিত্বের অনেকটাই করুণানিধির প্রাপ্য।
ডিএমকে-র যাত্রাপথের নিরিখে দেখলে বিশাল গণ-সম্মেলন এবং প্রকাশ্য সভা থেকে ভোটার আউটরিচের ডিজিটাল জগতে আসাটা তাদের জন্য অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তাঁরা এখন বড় বড় সম্মেলন আয়োজনের ব্যাপারটা এমনভাবে আইটি উইং-এর সাহায্যে করছে যাতে একদিনেই অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়।
আর. কান্নানের বই 'আন্না: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ সি.এন. আন্নাদুরাই'-তে ধরা আছে সেইসব বিশাল সম্মেলনের দিনগুলো। সি.এন. আন্নাদুরাইয়ের শক্তি প্রদর্শিত হয়েছিল বিরুগাম্বাক্কামে ১৯৬৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া চার দিনের সম্মেলনে।' মিছিলই চলেছিল ছ'ঘন্টা।
মিছিলে এমজিআর-এর উপস্থিতি জনতাকে আরও উজ্জীবিত করত। আন্নাদুরাই মন্তব্য করেছিলেন: 'শুধু ওর মুখ দেখিয়েই আমি তামিলনাড়ু জুড়ে কয়েক লক্ষ ভোট পেতে পারি।' ১৯৯৬ সালেও তিরুনেলভেলি সম্মেলন একই ধরনের ভিড় দেখেছিল। শুধু করুণানিধির কথা শোনার জন্য মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা দলের আবেদনকে আরও জোরদার করেছিল।

ডিএমকে সরকার, তাদের বিভিন্ন সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ — যেমন ভূমি সংস্কার, পরিবহনের জাতীয়করণ, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির নাম পরিবর্তন করে তামিলনাড়ু রাখা সত্ত্বেও দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়ে। আন্নাদুরাই গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সহযোদ্ধাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে আন্নার মৃত্যুর পর করুণানিধি এমজিআর-এর সমর্থনে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তবে, ১৯৭২ সালে দল থেকে এমজিআর-কে বহিষ্কারের জন্য তাঁকে চড়া মূল্য দিতে হয়।
এমজিআর-এর জীবদ্দশায় ডিএমকে আর ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। ১৯৮৪ সালে ভোটারদের উদ্দেশ্যে করুণানিধি বলেছিলেন, আমরা তোমাদের পায়ের চটি হয়ে সেবা করার জন্য প্রস্তুত। সেই সময়েও এমজিআর-এর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি অপরাজেয় থেকেছেন ।
ডিএমকে ফোর্ট সেন্ট জর্জে ফিরে আসে এমজিআর-এর মৃত্যুর পরেই। মনে রাখতে হবে তখন একটি বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে জয়ললিতা এবং এমজিআর-এর বিধবা স্ত্রী ভি.এন. জানকির নেতৃত্বাধীন দুটি এআইএডিএমকে উপদল তৈরি হয়েছিল। তবে সেই সরকার ছিল স্বল্পস্থায়ী, কারণ কেন্দ্র তাকে বরখাস্ত করে।

১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচন, যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরে হয়েছিল, ডিএমকে-কে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সেবার তারা মাত্র দুটি আসনে জয়ী হয়। তবে জয়ললিতা সরকারের বাড়াবাড়ি ডিএমকে-কে আবার ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করেছিল, এটাও ঘটনা। জি কে মুখপাত্রের তামিল ম্যানিলা কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত আর রজনীকান্তের সমর্থন ছাড়া সেটা সম্ভব ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষে জয়ললিতা সরকার জড়িয়ে পড়ে টু জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে। ২০১১ থেকে ২০২১, ডিএমকে ক্ষমতায় ছিল না। এম.কে. স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ২০২১ সালে ডিএমকে আবার ক্ষমতায় ফেরে।
২০২৬এর নির্বাচনের প্রেক্ষাপট হিসেবে বলার,

বর্তমানে অভিনেতা সি. জোসেফ বিজয়ের 'তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগাম' (TVK)-এর উত্থান এই নির্বাচনে রীতিমত একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডিএমকে-র রাজ্যসভা সদস্য কনস্ট্যান্টিন রবীন্দ্রন অবশ্য তা মানছেন না। তাঁর মতে, বিজয় কেবল তরুণ প্রজন্মকে অনুগামী হিসেবে পেয়েছেন। অন্যদিকে ডিএমকে-র সমাজের সব স্তরের সমর্থন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ডিএমকে-র ইশতেহার কেবল বিরোধীদের চেয়ে অনেক বেশি কথাই বলে না, তাদের দক্ষ আইটি উইং জনগণের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতেও সফল হয়েছে।
রবীন্দ্রনের মতে, যে কোনো নির্বাচনের শেষ তিন দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐ সময়েই ভোটাররা মন স্থির করেন। তামিলে একটি প্রবাদ আছে , অনভিজ্ঞদের চাষ করা ফসল শেষ পর্যন্ত আগাছার হয়। ডিএমকে-র সাংগঠনিক শক্তিই নির্বাচনে পার্থক্য গড়ে দেবে।
সৌজন্যেঃ দ্য হিন্দু