এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়

পরিচালক রঞ্জন ঘোষের ছবিটি ‘অদম্য’ ছোটো ইউনিট, কম বাজেট এবং সম্পূর্ণ আউটডোরে তৈরি। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই ছবির আসল শক্তি নয়। ছবির প্রধান বিশেষত্ব হল—এটি নিখাদ একটি সিনেমা। অর্থাৎ, এখানে গল্প বলার ভাষা মূলত দৃশ্য, নীরবতা, ফ্রেম এবং পরিবেশের মাধ্যমে তৈরি হয়। সংলাপ বা নাটকীয়তার ওপর নির্ভর না করে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় কথা বলার যে ক্ষমতা, ‘অদম্য’ সেই বিরল গুণের পরিচয় দেয়। সাম্প্রতিক বাংলা সিনেমায় যেখানে অনেক সময় চিত্রভাষাই দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে এই ছবি এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
‘অদম্য’ কেন সমকালীন বাংলা সিনেমায় এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় ? দেয় এই জন্যেই যে, এ ছবির ভেতরে একটি গভীর রাজনৈতিক স্রোত আছে বটে, কিন্তু সেটি কখনও প্রচারমূলক বা ভারী হয়ে ওঠে না। এখানে রাজনীতি মূল বিষয় নয়, বরং প্রেক্ষাপট। তা গল্পের ভেতরে স্রেফ অনুঘটকের মতো কাজ করে—চরিত্রদের অবস্থান, দ্বন্দ্ব এবং সিদ্ধান্তকে স্পষ্ট করে তোলে। ফলে, যে বিষয়টি সহজেই উপদেশমূলক হয়ে উঠতে পারত, তা সংযত ও আত্মবিশ্বাসী নির্মাণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। দর্শক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
এই ভারসাম্যটাই ছ্যবিতে বড়ো কথা, এবং এখানে তা রক্ষা করেছেন পরিচালক নিজেই। রঞ্জন ঘোষ পুরো ছবিজুড়ে এক সংযত ও অনাবেগী ভঙ্গি বজায় রেখেছেন। এবং আলাদা করে বলার যে, তিনি সচেতনভাবে মেলোড্রামা ব্যাপারটাকে এড়িয়ে গেছেন। কোথাও অকারণ আবেগের বিস্ফোরণ নেই, নেই অতি নাটকীয়তা। বরং আদর্শ, সন্দেহ, ভয় এবং মানবিক টানাপোড়েন—এসব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে প্রকাশ পেয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘অদম্য’-কে একটি ‘অথর ফিল্ম’ বলা যায়—যেখানে পরিচালকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে উপস্থিত।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা। রাজনৈতিক হত্যার পরিকল্পনা, ব্যর্থতা এবং তার পরবর্তী পালিয়ে বেড়ানো—এসব উপাদান থাকলেও ছবিটি প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক থ্রিলার নয়। এর আসল শক্তি মোটেই বাহ্যিক ঘটনায় নয়, বরং নায়কের অন্তর্জগতে।
ছবির প্রধান চরিত্রটি আদর্শবাদী—সে অনুপ্রাণিত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং বিপ্লবী ভগত সিংহ–এর চিন্তায়। কিন্তু বাস্তব জীবনের জটিলতা তাকে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে থাকে। চরিত্রটির ভেতরে চলতে থাকে এক গভীর নৈতিক দ্বন্দ্ব। একদিকে তার আদর্শ ও বিশ্বাস, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন মুখ। সে কি সহিংসতার পথে এগিয়ে যাবে, নাকি মানবিক বোধ তাকে থামিয়ে দেবে ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছবিটি সরাসরি দেয় না। বরং দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। চরিত্রটির সংশয়, ভয়, অপরাধবোধ এবং দৃঢ়তা—সবকিছুই ছবিতে সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। ফলে সে একমাত্রিক নায়ক হয়ে ওঠেনি; বরং হয়ে উঠেছে এক জটিল, মানবিক চরিত্র।
নায়ক পলাশের ভূমিকায় আর্যুন ঘোষ ছবির অন্যতম শক্তি। ছবির শুরুতে তাঁর অভিনয়ে কিছুটা সংযম বা দ্বিধা চোখে পড়ে, কিন্তু গল্প যত এগোয়, তাঁর উপস্থিতি তত দৃঢ় হয়। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে, যখন চরিত্রের মানসিক চাপ বাড়ে, তখন তাঁর অভিনয় আরও গভীর ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তাঁর চোখের দৃষ্টি, নীরবতা এবং শরীরী ভাষা চরিত্রটির ভেতরের অস্থিরতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তিনি একই সঙ্গে ভঙ্গুর এবং দৃঢ়—এই দ্বৈত অনুভূতিকে সমান শক্তিতে প্রকাশ করেছেন।
চিত্রগ্রহণ এই ছবির আরেকটি বড়ো শক্তি। চিত্রগ্রাহক অর্কপ্রভ দাস–এর ক্যামেরা ছবিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। প্রতিটি ফ্রেম শুধু সুন্দর নয়, অর্থপূর্ণও অবশ্যই। অনেক দৃশ্যে সংলাপ নেই, কিন্তু ফ্রেম নিজেই কথা বলে। আলো-আঁধারি, খোলা প্রাকৃতিক পরিবেশ, নির্জনতা—এসব উপাদান চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিশে গেছে। এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণ করেনি, বরং চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে। মূলধারার বাংলা সিনেমায় যেখানে চিত্রগ্রহণ অনেক সময় কেবল নথিভুক্তির কাজ করে, সেখানে ‘অদম্য’ প্রমাণ করে ক্যামেরা গল্প বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
ছবিটি পশ্চিমবঙ্গের বাস্তব লোকেশনে শুট করা হয়েছে। বড়ো সেট বা কৃত্রিমতা নেই। এই বাস্তব পরিবেশ ছবিটিকে স্পর্শযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। দর্শক যেন চরিত্রগুলোর সঙ্গে একই জায়গায় হাঁটে, একই ভয় অনুভব করে। সীমিত বাজেট সত্ত্বেও ছবির জগৎ কখনও ছোটো মনে হয় না। বরং সংযমী নির্মাণই ছবিকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।
সাউন্ড ডিজাইন ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও উল্লেখযোগ্য। পরীক্ষামূলক হলেও কখনও গল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না। নীরবতার ব্যবহার এছবিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শব্দের অনুপস্থিতিই দৃশ্যকে আরও গভীর করে তুলেছে। ফলে, ছবির সামগ্রিক ছন্দ অটুট থাকে।
সব মিলিয়ে ‘অদম্য’ একটি সাহসী অথচ সংযত চলচ্চিত্র। এখানে রাজনীতি আছে, কিন্তু তা প্রচারের ভাষায় নয় ; মানবিক প্রশ্নের ভেতর দিয়ে। এখানে উত্তেজনা আছে, কিন্তু তা চিৎকারে নয় ; নীরব টানাপোড়েনে। এটি দেখায় যে ভালো সিনেমা তৈরি করতে বিশাল বাজেট বা আড়ম্বরের প্রয়োজন নেই—প্রয়োজন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং কারিগরি দক্ষতা।
‘অদম্য’ সমকালীন বাংলা সিনেমায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, চলচ্চিত্র এখনও ভাবনার জায়গা তৈরি করতে পারে, দর্শককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে এবং প্রচলিত রীতিনীতিকে ভেঙে নতুন পথ দেখাতে পারে। এই অর্থে ‘অদম্য’ শুধু একটি ছবি নয়, বরং একটি সম্ভাবনার নাম—যা ভবিষ্যতের বাংলা সিনেমাকে নতুন আকাশ দেখাতে সক্ষম।