
সাল ২০২৪। জানুয়ারি মাসের গোড়ায় ভোট কভার করতে ঢাকা গেছি। ভোটের আগেই ফলাফল জানা ছিল সারা পৃথিবীর। বিরোধী পক্ষ বলে কিছুর অস্তিত্বই নেই বলতে গেলে। আওয়ামী লীগ আর তার কিছু বিক্ষুব্ধ অথবা গোঁজ প্রার্থী 'স্বতন্ত্র' ব্যানারে লড়ছেন। তাঁদের বেশির ভাগই ফেরত এসেছিলেন সরকার গঠনের সময়। শেখ হাসিনার আমলে খালেদা জিয়ার দল বিএন পি নিষিদ্ধ। দেশ জুড়ে পথেঘাটে শুধুই আওয়ামী লীগের নৌকো প্রতীকের প্রচার। দুর্জনে বলত, ভোটের আগের সন্ধেতেই ভোট হয়ে যেত বাংলাদেশে। ভোটের দিন শুধুই আই ওয়াশ। প্রত্যাশিত নিরঙ্কুশ জয়ের পর দেশ বিদেশের অসংখ্য সংবাদ প্রতিনিধিদের সম্মেলনে শেখ হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসের বিচ্ছুরণ। গণ ভবনের লনে সেই বিকেলে আন্তরিক আপ্যায়নের দায়িত্ব ছিল বোন রেহানা আর কন্যা পুতুলের ওপর। ঢাকার বিখ্যাত চটপটা থেকে মাংসের প্যাটিস, পাটিসাপটা, এলাহী আয়োজন। উৎসবের সেই মুহূর্তে হাসিনা বা তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা তো দূরস্থান, অতি বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকও ঘুণাক্ষরে আঁচ করতে পারেননি, কয়েকমাসের মধ্যেই উল্টে যাবে পাশার দান। তথাকথিত ছাত্র আন্দোলনের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হবেন প্রবল প্রতাপান্বিত, মতান্তরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক শেখ হাসিনা। যাঁকে ম্যাডাম না বলে স্যার বলাটাই ছিল দস্তুর। শুধু প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি নয়, হাসিনা বাধ্য হলেন দেশত্যাগে এবং তাঁকে আশ্রয় দিল প্রতিবেশী বন্ধু

ভারত।
হাসিনা - আচ্ছন্ন সেই ভোটে বিএনপিকে নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবু ভাবলাম, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ একটা রাজনৈতিক দলের অফিসের কী হাল, একবার দেখে আসি। নয়া পল্টনে বিএনপির অফিসের সামনে গিয়ে দেখলাম, কেউ কোথাও নেই। বন্ধ কোলাপসিবল গেট দেখলেই বোঝা যায়, বহুকাল খোলা হয়নি। ভেতরে উঁকি দিয়ে যেটুকু দেখলাম, পুরু ধুলোর আস্তরণে ঢাকা চেয়ার, টেবিল, আলমারি, মাকড়সার জাল আর ঝুলে ভরা। মোবাইল বার করে ছবি তুলছি, হঠাৎ পায়ের কাছে আধলা ইঁট উড়ে এসে পড়ল। লাফিয়ে সরে গিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম, পাগলাটে চেহারার এক মহিলা আরও একটা ইঁট তুলেছে মারবে বলে। দৌড়ে একটু দূরে দাঁড়ানো পুলিশদের কাছে গেলাম। মহিলা তখন গালাগালির বন্যা বওয়াচ্ছে। পুলিশরা বলল, সে নাকি একনিষ্ঠ বিএনপি ক্যাডার ছিল। দলের দুঃসময়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এরপর তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ইন্টারভিউ রেকর্ড করলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই সাক্ষাৎকার কোথাও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি কারণ যতবার তাকে তার দল নিয়ে প্রশ্ন করেছি, ততবার জবাবে শেখ হাসিনার উদ্দেশে অকথ্য গালাগালি ছাড়া আর কিছুই শুনিনি। কিন্তু দেখলাম, আশেপাশের সবাই তাকে ভালবেসে খেতে পরতে দেয় কারণ বিএনপির প্রতি তার নিষ্ঠায় কোনো খাদ নেই।

হাসিনার পতনের দেড় বছর পর যে সাধারণ নির্বাচন হল, সেখানে তাঁর দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯ টিতে ভোট হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে বিএনপি। জামাত ভোটের আগে যতই লাফালাফি করুক, বিএনপির ধারে পাশে আসতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীর আসনে দীর্ঘদিন বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসনের পর দেশে ফেরা খালেদা - পুত্র তারেক রহমান। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে তাঁকে। এবার দেখার, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে ভারত বিরোধিতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, হিংসা, অনুন্নয়নের আবহ তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কিনা নতুন সরকার। শেখ হাসিনাকে নিয়েই বা কী অবস্থান নেয় তারা। চিন এবং আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোন খাতে প্রবাহিত হয়।