
বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপির এই বিপুল জয়লাভের পর দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারের পর এবার একটা গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠা সবসময়ই গণতন্ত্রের জন্য ভালো।
বাংলাদেশের এয়োদশ সাধারণ নির্বাচন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে সম্পন্ন হল। জুলাই আন্দোলনের পর আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা দেশ থেকে চলে আসতে বাধ্য হলেন। তিনি এখন ভারতের রাজনৈতিক সুরক্ষায় ভারতে আছেন। এবারের ভোটে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ জারি করা হয়েছিল। ফলে, আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক ছাড়াই বাংলাদেশ এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে। মূল লড়াইটা ছিল বিএনপি (বাংলাদেশের জাতীয় পার্টি) বনাম জামাত। বিএনপি এবং জামাত শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন দীর্ঘদিন একসঙ্গে ঘর করেছে। খালেদা যখন ক্ষমতাসীন ছিলেন তখনও জামাত তাঁর সঙ্গে ছিল। একটা দীর্ঘ সময় বিএনপি এবং জামাত মতাদর্শগতভাবে অনেক কাছাকাছি ছিল ঘোষিত অর্থেই।
এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে বিএনপি এবার ভোটে অবতীর্ণ হল, তার মতাদর্শগত ঘোষণা ছিল আলাদা। রহমান বললেন, তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন চান। একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। তাঁর বয়স এখন ষাট। এখনও বৃদ্ধত্বের কারণে ঝুঁকে যাননি। তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করার কথা বললেন। বিএনপি বাণিজ্য বান্ধব দল। এমনকি জামাতের সঙ্গেও তাঁর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এল। অন্যদিকে জামাতের উগ্র ইসলামিক মতাদর্শের সঙ্গে অনেকে মৌলবাদী মনোভাবের যোগসূত্র পেল। যদিও জামাতও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের কথা বলেছিল। জামাত এখনও ভারতের সঙ্গে শুধু সুসম্পর্ক নয়, জামাতের প্রধান এখনো বলেছেন, সংখ্যালঘু হিন্দুদের সুরক্ষার দায়িত্ব জামাতেরও। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে না। বাংলাদেশে তারা শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়। জামাতের প্রচারের মূল বিষয়বস্তু ছিল শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার যুগে প্রবল দুর্নীতি হয়েছে। জামাত নবীন প্রজন্মের পাশে। আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের পাশে। তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ গঠনের পাশে। আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তাই যে দলকে এতদিন বাংলাদেশের মানুষ সুযোগ দেয়নি, যাকে বলা হয় নট টেস্টেড (Not tested) রাজনৈতিক দল, তাকে একটা সুযোগ দেওয়া হোক। শেষবার যখন নির্বাচন হয়েছিল তখন জামাতের ভোট ব্যাংক শতকরা আট-নয় ভাগ ভোট পেয়েছিল। কোনো কোনো বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, এবার হয়তো হাসিনা মুক্ত বাংলাদেশে, বাংলাদেশের মানুষ ইসলামিক মতাদর্শের প্রতি আরও বেশি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে জামাতের পাশে এসে দাঁড়াবেন।
আরেকটা প্রশ্নও এই নির্বাচনের পর উঠছে যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সম্পর্ক কী হবে? আওয়ামী লীগের শতকরা ভোট ব্যাংকের একটা অংশ বিএনপির দিকে ভোট দিয়েছে এমনটা অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। এমনকি জামাতও মনে করছে যে এটাই হয়েছে। বিএনপিও ভারত বিরোধী অবস্থান নেয়নি। জামাতকে ভারত বিরোধী দল বলে একটা ধারণা বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল। ভারত বিরোধিতার তাস জামাত খেলেছিল। বিএনপি সেভাবে খেলেনি। তারপরেও এই ভোটে জয়ের ফলে ভারতের মধ্যে একটা ধারণা দেখা দিচ্ছে যে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ আসলে ভারত বিরোধী নন। তাই যদি হত, তাহলে তো জামাত অনেক বেশি ভোট পেতে পারত। তারপরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত যাই থাক না কেন, ভারত বিরোধী জনমত সেভাবে বড়ো অংশের মধ্যে নেই। সাধারণ ভোটের পাশাপাশি একটা রেফারেন্ডামও হয়েছে। সেখানে বিপুল ভাবে রেফারেন্ডামের জয় হয়েছে। যেটা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এবং রেফারেন্ডামের জয়লাভের ফলে সংসদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার ফলে শুধু ক্যাবিনেট নয়, সংসদের মাধ্যমেও বিএনপিকে চলতে হবে। ভারতকে এখন বিএনপি বার্তা দিয়েছে ১৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের দিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দিবস। দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভোটের ফলাফল বেরোনোর আগেই যে, তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনে উৎসব পালন করবে। কাজেই ‘৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বিএনপি সমর্থন করছে। অতীতেও সমর্থন করছিল। জামাত ক্ষমতায় এলে এ উৎসব কী বন্ধ হয়ে যেত? জামাত কী ‘৭১ সালের আগের অবিভক্ত পাকিস্তানের দিকে যেতে চাইছে? জামাত কী মুক্তিযুদ্ধের সমালোচনা করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পক্ষকে নিয়ে আসতে চাইছে? যেভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সদ্ভাব তৈরি হচ্ছিল।
কোনো সন্দেহ নেই ভারতের দিক থেকে সম্পর্কটাকে দ্রুত মেরামত করার চেষ্টা থাকবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফলাফল ঘোষণার দিনই তারেক সাহেবকে ফোন করেন। প্রধানমন্ত্রী ফোন করে দীর্ঘ সময় কথা বলেন, বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীকে বার্তা দিয়েছেন। এমনকি বিরোধী দলের নেতা কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খড়গেও ফোন করেন তারেক রহমানকে।
ফলে, এখন কীভাবে বাংলাদেশ এগোবে সেটাও একটা বড়ো প্রশ্ন। তার কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কটাকে বিএনপির পক্ষে ছিন্ন করা সম্ভব নয়। সম্পর্ক মধুর করতে চাইলেও আগামীদিনে জটিলতা অনেক আসবে। তার কারণ একদিকে যেমন শেখ হাসিনা ভারতে আছেন। তিনি বাংলাদেশে চলে যাচ্ছেন না। নতুন সরকার এখনই তাঁকে বাংলাদেশে ফেরৎ আনতে উদ্যোগী হবে না। আবার আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে বোঝাপড়া করার চেষ্টা, হাসিনার পুত্র জয়কে বাংলাদেশে নিয়ে আসার উদ্দ্যোগ যাঁরা করতে চাইছেন, সেটাও এত সহজ হবে না। তার কারণ বাংলাদেশের জনমত কিন্তু এখনও ভয়ঙ্করভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই রয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনের যে অ্যান্টি ইনকামবেন্সি সেটাও কিন্তু ঘুচে যায়নি। তাহলে সেদিক থেকেও পরিস্থিতি সহজ নয়।
তাই ধীরে ধীরে এগোনো দু'পক্ষেরই ভালো। এখনই যদি তারেক তিস্তা প্রসঙ্গ তোলেন তবে সেটা অনুচিত হবে। আবার এখনই হাসিনাকে নিয়েও কোনো বিতর্কে জড়িয়ে পড়া তাঁর অনুচিত। নতুন বাংলাদেশ গঠন, উন্নয়ন এগুলিই হবে এখন সবথেকে বড়ো উদ্যোগ।