
কলকাতার ভেতরেও আর এক কলকাতা থাকে! তাকে দেখা যায় না। জল ছিটিয়ে স্নান করে যুবক টবিন রোডে। স্রোত নয়, ফোয়ারা ছিটে আসে বাসের জানলায়। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধারে শহরের কলুষিত বিষের বিশাল স্তূপকেই মনে হয় মালিখা পাহাড়। রাতে চূড়ায় জ্বলে মিথেন গ্যাস—ধিকি ধিকি আগুন। যেন শাল-মহুয়ার জঙ্গলের ফাঁকে পাহাড়ে জুম চাষের আগুন লেগেছে। হা-হা করে কী যেন ডেকে যায় রাতের বাতাসে, চমকে মনে হয় জঙ্গুলে জীব! আহা, কলকাতায় শিয়াল নেই, হৃদয়ের হাহাকার তো আছে।
নয়ানজুলিতে দাঁড়ানো রাতের বাসে খালাসি ঘুমায় নীল মশারি টাঙিয়ে। ফাল্গুনের জ্যোৎস্নার রং রাতের দিকে অকলুষ সাদা হয়ে যায়। মশারির ফাঁকে অভূতপূর্ব ভয়মিশ্রিত ছায়া দুলে দুলে ঘোরে। হয়তো কেউ তার অপেক্ষায় থাকে না আর! তার ঘুমন্ত মুখ ছুঁয়ে থাকে বসন্তের চাঁদ।
কলকাতার ভেতরের কলকাতায় বয়ে যায় মন-কেমনের শিরশিরে হাওয়া। ফেব্রুয়ারি থেকে জাম্প মেরে সোজা গ্রীষ্মে চলে যায় এ শহর। ফ্লাইওভারের হলুদ ভেপার ল্যাম্পের আলো যেখানে আকাশ থেকে নেমে নীল আলোর সঙ্গে দেখা করতে আসে, ওখানটায় সে চুপ করে বসে থাকে। চোরা শিরশিরানির মতো টের পাওয়া যায় তাকে। বাসের জানলায় দুপুরে রোদের রং বদলে যায়। বাতাস একলা ওড়াউড়ি করে মানিকতলা ক্রসিং-এ, কলেজ স্কোয়ারের পেছনের পুরনো খেজুর গাছে। ঠিক এই সময় চৌরঙ্গী লেনে বিশপের বাগানবাড়ি থেকে কোকিল ডাকে। আর ফ্যাঁচ করে হাঁচি পড়ে। অল্প সেঁকা পাউরুটির মতো বাদামী মুচমুচে তাপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে অন্য দুপুর। গলার কাছটা ব্যথা করে, নাক চুলকায়। চৈত্রের ধুলোবালির মধ্য দিয়ে চলে যায় ট্রামের লম্বা ল্যাজ। ৩৪/সি কিংবা ২৩০-এর কাঠের দরজায় দাঁড়িয়ে চ্যাপ্টা নোংরা বোতল থেকে উঁচু করে গলায় জল ঢালে খালাসি; হাতকাটা জালি গেঞ্জি ঘামে সেঁটে থাকে পিঠে। তখন লুকিয়ে ট্রামের তার থেকে ঈষৎ ঠান্ডা একটা হাওয়া নেমে আসে। নিন্দুকেরা যাই বলুক, সে আছে—তাকে চেনা যায়। গ্রীষ্মের বিশাল খ্যাপা জোব্বা তার গায়ে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বসন্তের শিরশিরানি। যার টের পাওয়ার, সে পায়।
মধ্যিখানে ওই কটা দিন ভবঘুরের ঝোলা ব্যাগে করে মন চলে যায় সেই সব ধুলো ওড়া জঙ্গলের ধারে, যেখানে ঝুন্ড কে ঝুন্ড ময়ূরের ডাকে সন্ধে চুপিসারে পেরোয় শালবন।
এই ফাল্গুন মাসেই মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠে অদ্ভুত ভূখণ্ড আর কেউ কেউ তাকে রোমহর্ষক বানায়। নিউটাউনের পেঁচার মোড়, পাতিহাল, চাঁদপুর, হাতিয়ারা, চকপাচুরিয়া ছাড়িয়ে রাস্তা উধাও। ঠিক এই সময়েই দক্ষিণ দিক থেকে বেমক্কা হাওয়া দেয়।
অদূরেই এক পরিত্যক্ত ব্রিজ; যাতে ওঠার কোনো সিঁড়ি নেই। কোনোক্রমে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ব্রিজ পেরোলেই আফ্রিকা! ব্রিজ তো শূন্যেই থাকে, নিচে থাকে জল—তা সে যে নদীই হোক। ব্রিজের কাজ জুড়ে দেওয়া। এ ব্রিজও জুড়েছে কলকাতা আর আফ্রিকাকে। পৃথিবীতে বাঁশ আছে, দড়ি আছে, লোহার স্ক্রু আছে। সেসব সংগ্রহ করার মানুষ আছে। দিকদিগন্ত থেকে তারা গন্ধ শুঁকে চলে আসে। কী অলীক ম্যাজিকে পথ নিজেই উজিয়ে উঠে জুড়ে যায় ব্রিজে। তলায় দিলীপের ছাতুয়া রেস্টুরেন্ট। এ জিনিস প্রতি বসন্তেই দেখে আসছে সে।
হালকা বাদামী বেড়ার ফুটোয় চোখ রাখলেই দেখা যায় দূর ধোঁয়াটে কিলিমাঞ্জারোর বরফ শিখর। ব্রিজের শেষ মাথায় গড়িয়ে নেমেছে একটা আধো-অন্ধকার নুড়ি পথ। পোকার কিটকিট আর বুনো গন্ধ—শুষ্ক, উষ্ণ, ঝাঁঝালো। বনপথ ডানে-বাঁয়ে বেঁকেছে। যেদিকেই যাও, পথ হারানোই দস্তুর এখানে। পথই আসলে তোমাকে হারায়।
বেশ কিছু লতা ঝোলানো গড়ানে রাস্তায় কিছু গেলেই সামনে বিস্তীর্ণ সাভানা। খোড়ো হলদেটে ঘাসের জঙ্গল। উন্মুক্ত প্রান্তর। বেঁটে বেঁটে খেজুর আর ঝাকড়া কুল গাছ। তাঞ্জানিয়ার সেরেঙ্গেটি। বিশাল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় তৃণভূমি। বিক্ষিপ্ত গাছপালা, লম্বা শুকনো বনতুলসীর ঝোপ, দিগন্ত অবধি বিস্তৃত। ফাল্গুনের মাঝামাঝি কলকাতায় গলার ভেতর শুকনো টান, খসখসে বালি কিরকিরে ভাব—বসন্তের নাম নিয়ে ভেতরে ভেতরে আসলে সেটা গ্রীষ্মই, কে না জানে! এইরকম ফাল্গুন-চৈত্রের একটা বিতর্কিত হাইফেনে ফি বছর এখানে আফ্রিকা নামে।
পশু চরছে। পাখি ডাকছে। ওয়াইল্ডবিস্ট, জিরাফ, জেব্রা নাই বা হলো—গরু-ছাগল বিস্তর। তবে এরা বন্য গরু, ভীষণ রাগী। যে কেউ হেথা এন্ট্রি মারবে—এ তাদের পছন্দ না। শিং বাগিয়ে ব্যাঁকা চোখে চাইছে, নাক দিয়ে ফোঁস করে বায়ু ছাড়ছে। সবুজ বাঁশপাতি পাখি উড়ছে ঝোপে। বাঁ দিকে পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডার উঁচু মালভূমি। অঞ্চলটি খাড়া ঢালবিশিষ্ট। আফ্রিকার রিফট উপত্যকা নিচে ঢালু হয়ে নেমেছে নদীতে। কোন নদী? তানা, জাম্বেসি, মারা—যা খুশি কিছু একটা হবে। অত কে ভাববে! খরস্রোতা বসন্তে সাদা জলের ধারা আলো ছড়াচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণে সাভানা আর রুক্ষ মরুভূমির মিশ্রণ। প্রায় নদীর তীর ঘেঁষে কলার বন। দূরে একলা বাওবাব, কাঁটা নাশপাতি, বোগেনভিলিয়া। সাড়ে আট হাজার বিঘা জমিতে এমন আফ্রিকা নেমেছে, নিশ্চয়ই মানুষ থাকবে। একটু মাটি আর জল থাকলেই মানুষ আসে। মাসাই, কিকয়ু—কারা আছে ধারে কাছে?
হাওয়া তেতে উঠেছে। মধ্যদুপুর। একটা শনশন ফিসফাস শব্দ হচ্ছে। নিচে নদীতে ভটভট করে মাছ ধরা নৌকা যাচ্ছে। দূরে দেখা যায় কালচে মতো চালা—পাটকাঠির দেওয়াল আর প্লাস্টিকের পর্দা ঝোলানো। প্লাস্টিক মানেই মানুষ। জল তেষ্টা পেয়েছে। ওমা! দেখি গরুর বাথান। ভেতরে অন্ধকারে লাল প্লাস্টিকের গামলায় জাবনা খাচ্ছে সেই রাগী গরু। এগিয়ে এসে ভসস্ করে নাক দিয়ে হাওয়া ছেড়ে তাড়িয়ে দিল। ঘরবাড়ি কিচ্ছু নেই। টিনের চাল রোদে চকচক করছে দূরে। এগিয়ে দেখি কারো পোড়ো ঘর। পাশে অল্প জমিতে মাথামোটা মদন আর পাঁচুর মা মাটি থেকে মিষ্টি আলু তুলে চটের ব্যাগে ভরছে। মদন বড়ই চোর, তবে সে আফ্রিকায় এসে মাসাইদের আলু চুরি করবে—এতটা ভাবিনি।
তামাম জায়গা জুড়ে ধুলো উড়ছে পশুদের খুড়ে। বাথানের পাশে টিপকল। সেরেঙ্গেটিতে মাসাইরা টিপকল বসিয়েছে! তা আশ্চর্যের কী! কিলিমাঞ্জারো পর্বতের ঢালে চাগা উপজাতিরা চাষে জল দেওয়ার জন্য উন্নত সেচ ব্যবস্থা করেছে।
পট পট শব্দ আর ধোঁয়ার গন্ধে ফেরে দেখি পশ্চিম দিক জুড়ে ধোঁয়ার মেঘ আকাশে পাকিয়ে উঠছে। শুকনো বনতুলসী, ঘাসের বনে আগুন লেগেছে। আগুন পশ্চিম দিক থেকে পুবে চলেছে। হঠাৎ রুক্ষ হাওয়া উঠল খোলা মাঠে, তাতে আগুনের হলকা। বায়ুধাবিত আগুন বেগে দিগন্তে মালার মতো দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল।
বসে বসে হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে একটা অ্যাকাসিয়া গাছের তলায় শতরঞ্জি পেতে ঝিমিয়ে পড়েছি। শীত শীত করছে। তন্দ্রা ভেঙে গেল। রোদ পড়ে এসেছে। নদীর ঠান্ডা হাওয়া আসছে। পশ্চিম দিকে বন দগ্ধ হয়ে কালো হয়ে গেছে। ধিক ধিক করছে এখনো আগুন। শতরঞ্জি ঝেড়ে তুলতে গিয়ে দেখলাম কী একটা কিম্ভুত জানোয়ার নিচ থেকে কোণাকুণি উঠে আসছে। কালো, খাড়া কান, মুখ সরু, খিঁচোনো দাঁত। দেহটা অদ্ভুত চারটে পায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন—যেন পেছন দিক থেকে কে চেঁছে নামিয়ে দিয়েছে। পেছনের গঠন অসমাপ্ত। লেজ নেই। পিঠের নিচে কালো পুচ্ছের মতো একটুখানি উঁচিয়ে আছে, কিন্তু তা আর বাড়েনি। চারটে পায়ের ওপর ধড় বেমানান রকমে ছোট বলে ঘাড়টা কুঁজো হয়ে আছে। এমনভাবে উঠে এল দেখে আঁতকে উঠতে হয়।
ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। সন্ধ্যাধূসর অনতিস্পষ্ট চারিধার। জন্তুটা ঘ্যাঁচ করে শব্দ করে বাওবাব গাছের পেছনে সেঁধাল। মনটা কেমন খচ করে উঠল। এ আবার কে এল, বুনিপের পিসেমশাই! ‘কেয়া হুয়া? কেয়া হুয়া?’ করে গাদা খানেক শিয়াল ডেকে উঠল।
তেসরা ফেব্রুয়ারি থেকে কোকিল ডাকে কলকাতায়, আর মেয়েরা বুদ্ধদেব গুহ পড়ে। তবে এখানে ‘ঘাঁপু ঘাঁপু’ করে কী একটা ডাকছে। চাঁদ উঠে এল। বসন্তের জ্যোৎস্নার রং নীল। এই সন্ধ্যা, পূর্বফাল্গুনী, পুষ্যা নক্ষত্রের আলোয় দিলীপ আর ৩৪/সি-এর খালাসিটা আলভারেজ আর শঙ্করের মতো হাত ধরাধরি করে গাঁজা খেতে আসে। দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে কালপুরুষের পায়ের তলায় শিকারি কুকুর লুব্ধক পাহারা দেয় তামাম তল্লাট।
কলকাতায় এক ছিটেল পাগলা হাওয়া ওঠে বসন্তে। বাসন্তী রং নদীর বাঁকে নবীন পলিতে জেগে ওঠে আফ্রিকা। হাতিবাগানের ফুটের নকল গেঞ্জির মতো—৬০ টাকায় গরিবের আফ্রিকা।