তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
SIR নাহয় চলবে, কিন্তু সন্দেহ ?

ভোটার তালিকা থেকে রাজনীতির ধুলো ওড়াচ্ছে শীর্ষ আদালতের নির্দেশ

ভোটার তালিকার Special Intensive Revision বন্ধ করার আবেদন খারিজ হল। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা—নির্বাচন কমিশনের কাজে কোনো বাধা নয়। কিন্তু বাংলায় সেই নির্দেশ মানেই কি ভোটারের নিশ্চিন্তি, না কি আরও গভীর হবে মোদী–মমতা দ্বন্দ্ব?

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে বিতর্ক দিন দিন রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছিল, এই মুহূর্তে তার মঞ্চ হল সুপ্রিম কোর্ট। আর রায়—সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। SIR চলবে। কোনো বাধা দেওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কর্তব্যে আদালত আপাতত পূর্ণ সমর্থন দিল।

কিন্তু আদালতের নির্দেশেই কি থামে রাজনীতি? ভোটার তালিকার এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ বাংলায় যে ইতিমধ্যেই আস্থার সংকট তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই। এটা তো ঘটনা যে, ভোটার তালিকা ঠিক করতে গিয়ে যদি ভোটারই অনিশ্চিত হয়ে পড়েন, সেটাই সবচেয়ে বড়ো বিপদ।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদন ছিল স্পষ্ট—বর্তমান SIR প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ছে, কোথাও আবার জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে। রাজ্যের যুক্তি, নির্বাচন এখন ঘনিয়ে আসছে। এগোচ্ছে। আর, ঠিক সেই সময়েই এই ধরনের নিবিড় সংশোধন রাজনৈতিকভাবে যথেষ্টই চিন্তার। কেননা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা ছাড়া এই প্রক্রিয়া চালালে বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী। নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্য আরও কড়া। কমিশনের দাবি—ভোটার তালিকায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা গরমিল না কাটালে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ডুপ্লিকেট নাম, স্থানান্তরিত ভোটার, মৃত ব্যক্তির নাম—সব মিলিয়ে তালিকা সংশোধন জরুরি। আর এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া মানে তো সাংবিধানিক দায়িত্বে হস্তক্ষেপ। সুপ্রিম কোর্টও এই যুক্তির দিকেই ঝুঁকেছে।

দিল্লির আদালতকক্ষ থেকে আসা নির্দেশ বাংলার বুথস্তরে পৌঁছতে গিয়ে অন্য রূপ নিচ্ছে। বহু জায়গায় ভোটাররা এখনও জানেন না—নাম বাদ পড়লে কী করবেন ! কোথায় অভিযোগ জানাবেন ! কোন নথি যথেষ্ট !

ফলে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। আর আতঙ্ক মানেই সবাই জানেন কেবল নয়, মানেনও যে, রাজনীতির সুবর্ণ সুযোগ।

এই অবস্থায় এই SIR বিতর্ক নির্বাচন কমিশনকে ফের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনে ফেলেছে। বিরোধীদের অভিযোগ নতুন নয়—মোদী জমানায় কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো বারবার সরকারের পক্ষে যাচ্ছে। আচরণবিধির প্রয়োগ, সময় নির্ধারণ, নোটিফিকেশন—সবেতেই নিরপেক্ষতার প্রশ্ন উঠেছে। SIR সেই সন্দেহকে আরও উস্কে দিচ্ছে, কারণ ভোটার তালিকা মানেই সরাসরি ভোটের হিসেব। আর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির রাজনৈতিক শিকড় এখানেই—এটা শুধু প্রশাসনিক সংশোধন নয়, এটা নির্বাচনের আগে শক্তি তথা রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের চেষ্টা। । অন্য রাজ্যে SIR হয়তো নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলায় তো তা আলাদা মাত্রা পায়। কারণ, এখানে ভোটার তালিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিচয়, অভিবাসন, সংখ্যালঘু রাজনীতি। ফলে স্বভাবতই ‘ভুয়ো ভোটার’ বনাম ‘ভোট কাটা’—এই দুই বয়ানের সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়।

বিজেপির দাবি—বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে। আর, তৃণমূলের অভিযোগ—নাগরিককে সন্দেহভাজন বানানোর চেষ্টা চলছে। মাঝখানে সত্যটা কোথায়, তা বোঝার আগেই সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়ছেন।

ভোটার তালিকা শুদ্ধ করা দরকার—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি জটিল হয়, ভুল সংশোধনের পথ যদি দুর্গম হয়, তাহলে বাধ্যতামূলকভাবেই আস্থা নষ্ট হয়। একজন বৈধ ভোটার বাদ পড়লে তিনি শুধু ভোট হারান না—তিনি রাষ্ট্রের উপর বিশ্বাস হারান। আর সেই বিশ্বাস ফেরানো সবচেয়ে কঠিন। সুপ্রিম কোর্ট আজ না হয় প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতের দায়ও বাড়িয়ে দিয়েছে—নির্বাচন কমিশনের কাঁধে।

আদালত বলেছে—SIR চলবে।

রাজনীতি বলছে—লড়াই চলবে।

আর ভোটার?

তিনি কিন্তু এখনও তালিকা খুলে নিজের নাম খুঁজছেন। পাবেন তো ? প্রশ্ন তো থাকবেই। কারণ, সেটাই তো শেষমেশ সবথেকে বড়ো প্রশ্ন। যে, শেষমেশ কী হবে ? এবং প্রশ্ন লাখ নয়, কোটি কোটি কোটি টাকার।

স্বভাবতই, এই শুদ্ধি অভিযান যদি শেষে গিয়ে ভোটারের আস্থা ফিরিয়ে দিতে পারে, তবে তা ইতিহাসে সংস্কার হিসেবে লেখা হবে। আর যদি না পারে ? তবে তো SIR হয়ে থাকবে আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়, যেখানে গণতন্ত্র নিজের ছায়াকেই সন্দেহ করেছিল।


Scroll to Top