সাধারণ মানুষের স্বস্তির বদলে হাতে রইল পেনসিল

দেশ ছুটছে—এই বার্তাই দিতে চাইল ২০২৬–২৭-এর কেন্দ্রীয় বাজেট। রেল, সড়ক, হাই-স্পিড করিডোর, রেকর্ড ক্যাপেক্স—অঙ্কের বহর চোখ ধাঁধানো, কিন্তু যে মানুষটা সকালে বাজারে গিয়ে সবজির দাম শুনে মুখ গম্ভীর করে ফেরে, যে পরিবার মাসের মাঝামাঝি পৌঁছতেই হিসেবের খাতা উল্টে ফেলে—তাদের সামনে কিন্তু সেই একটাই প্রশ্ন : এই বাজেট কি আদৌ সাধারণ মানুষের ?
আয়কর কাঠামো ‘সহজ’ করা হয়েছে, করমুক্ত আয়ের গণ্ডি বাড়ানো হয়েছে—সরকারের দাবি, মধ্যবিত্তের হাতে টাকা বাড়বে। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় যে জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ঘোলাটেই হয়ে রইল, তা হল বাজারদর।
চাল-ডাল-তেল-গ্যাসের দামে লাগাম কোথায়? কর কমলে কী হবে, যদি সেই টাকা দোকানদারের কাউন্টারেই রেখে আসতে হয় ? বাজেট যেন বলছে—হাতের টাকা বাড়বে, কিন্তু সেই টাকা কতদিন হাতে থাকবে, তার নিশ্চয়তা দেবার ক্ষমতা সরকারের অন্তত নেই। অবকাঠামোতে রেকর্ড বরাদ্দ—প্রচারমূলক সাফল্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বাজেটের ভাষা ধোঁয়াটে। ‘চাকরি হবে’—এই ভবিষ্যৎবাণী বহু বছর ধরে শুনছে দেশ। যে যুবক চাকরির পরীক্ষায় বারবার ফেল করছে না বটে, কিন্তু পাশ করেও নিয়োগপত্র পাচ্ছে না, তার কাছে হাই-স্পিড রেল মানে তো শুধু দূরের পোস্টার। ফলে প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়ন কার, আর বেকারত্ব কার ভাগ্যে ? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে—খবরে সত্যিই ভালো শোনায়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে বেডের সংকট, ওষুধের অভাব, ডাক্তার না পাওয়ার বাস্তব ছবিটা বদলাবে কীভাবে—সে উত্তর বাজেটে নেই। শিক্ষায় সংস্কারের কথাও বলা হল, কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের স্কুল-কলেজের ফি কমানোর কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত তো কই দূরবীন কষেও তো কই ত্রিসীমানায় দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যৎ গড়ার খরচ এখনও তো সেই রয়ে যাচ্ছে পরিবারের ঘাড়েই।
নারী উদ্যোগ, আত্মনির্ভরতার প্রকল্প—গালভরা নামের অভাব নেই। কিন্তু হাতে কলমে ঋণ পেতে গেলে আজও যে ব্যাংকের দরজায় ঘুরতে হয়, সে সত্য বাজেটের পাতায় ঢোকেনি।
গরিব মানুষের জন্য ‘সহায়তা’ আছে, কিন্তু দারিদ্র্য থেকে বেরোনোর রাস্তাটা কোথায়—সে মানচিত্র এখনও অস্পষ্ট।
রাজকোষ সামলানো, ঘাটতি কমানো—এই প্রতিশ্রুতি তো সব সময়েই সরকারের মুখের লব্জ । কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্নটা তো খুব সোজা—এই বাজেট কি জীবনের তথা বেঁচে থাকার যে দৈনন্ইনন্দিন, সেটা কমাবে, নাকি কেবল উন্নয়নের গল্প শুনেই দিন কাটবে আমাদের মতো আমজনতার?
২০২৬–২৭-এর বাজেট এক কথায় বলতে গেলে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ফেলে দিল আমাদের। কাগজে কলমে স্বপ্ন যত বড়ো, বাস্তবে স্বস্তি তত ছোটো। ফলে সংবাদ পত্রের প্রথম পাতার শিরোনাম যতই উজ্জ্বল হোক, বাজারের থলে খুললেই বোঝা যাচ্ছে—হিসেব এখনও কিন্তু সেই সাধারণ মানুষের বিপক্ষেই।