
আজকের দিনে রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার মানে সাধারণত শিরোনাম–যোগ্য উদ্ধৃতি, তড়িঘড়ি পাল্টা প্রশ্ন আর সোশ্যাল মিডিয়ার উপযোগী উত্তেজনা। সেই চেনা কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে ‘সঙ্গে সুমন’-এর মঞ্চে হাজির হলেন বিমান বসু। তিনি এখানে সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি। এসেছেন স্মৃতির ভিতর দিয়ে রাজনীতি ও সময়কে বুঝতে—এবং বোঝাতে। এই কথোপকথন তাই কোনো ব্যক্তিগত আড্ডা নয়; আবার শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্যও নয়। বরং এটি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক স্মৃতিলেখ, যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে বর্তমানকে বিচার করার চেষ্টা স্পষ্ট।
বাম রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের জীবন্ত দলিল বিমান বসু। তাঁর কথায় বারবার ফিরে আসে সেই সময়, যখন রাজনীতি ছিল সংগঠননির্ভর, আদর্শকেন্দ্রিক এবং ত্যাগের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রজীবন, আন্দোলনের দিন, সংগঠনের ভিতরের শৃঙ্খলা -- এই সব স্মৃতির উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি কার্যত আজকের রাজনীতির সঙ্গে এক নিঃশব্দ তুলনা টেনে দেন। কোথাও সরাসরি আক্রমণ নেই, কিন্তু প্রতিটি স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন জমতে থাকে।

এই পর্বের আলাপ কোনো তৈরি স্ক্রিপ্টে বাঁধা নয়। কথাবার্তা এগোয় স্মৃতির টানে---কখনও আন্দোলনের ময়দানে, কখনও প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, আবার কখনও সেখান থেকে সরে আসার পরের নিঃসঙ্গ বাস্তবতায়। ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতার বাইরে থাকা—এই দুই অভিজ্ঞতার কথাই তাঁর বয়ানে সমান গুরুত্ব পায়। কোথাও বিজয়ের আত্মতৃপ্তি নেই, আবার কোথাও পরাজয়ের বিলাপও নয়। বরং আছে রাজনৈতিক জীবনের এক নির্মোহ আত্মসমালোচনার সুর।
আড্ডার ছলে উঠে আসে সংগঠনের ভিতরের সংস্কৃতি, কর্মীদের ভূমিকা এবং নেতাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। বিমান বসুর কথায় রাজনীতি মানে শুধু নির্বাচন বা ক্ষমতার অঙ্ক নয়; রাজনীতি মানে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় থাকা, কথা বলা, বিশ্বাস তৈরি করা। এই বক্তব্য আজকের রাজনীতির ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়। দলবদল, তাৎক্ষণিক লাভের হিসেব আর জনপ্রিয়তার দৌড়ে আদর্শের ক্ষয়—এই সব প্রসঙ্গ সরাসরি উচ্চারিত না হলেও, কথোপকথনের প্রতিটি বাঁকে তা ছায়ার মতো উপস্থিত।
এই পর্বে বর্তমান সময়ও অনিবার্যভাবে ঢুকে পড়ে। রাজনীতির ভাষা কেন এত কঠোর হয়ে উঠেছে, গণতন্ত্রের চর্চা কেন ক্রমশ সংকুচিত—এই প্রশ্নগুলো বিমান বসু উত্থাপন করেন ইঙ্গিতে। নাম না করে তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা বলেন, যেখানে বিরোধিতা মানেই শত্রুতা, আর সহমত না হওয়াই অপরাধ। এই নীরব সমালোচনা অনুষ্ঠানটিকে নিছক স্মৃতিচারণের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেয়।

তবে ‘সঙ্গে সুমন’-এর এই পর্ব শুধুই গম্ভীর রাজনৈতিক মূল্যায়নে আবদ্ধ নয়। ব্যক্তিমানুষ বিমান বসুকেও সামনে আনা হয়েছে সচেতনভাবেই। দৈনন্দিন অভ্যাস, ছোট ছোট ব্যক্তিগত স্মৃতি, সম্পর্কের টুকরো গল্প—এই সবই কথোপকথনে জায়গা পেয়েছে। কিন্তু এই ব্যক্তিগত পরিসর আলাদা কোনও আলাপ নয়; বরং এর মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এমন এক সময়, যখন রাজনীতি ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আলাদা কোনও পেশা বা ক্যারিয়ারের সিঁড়ি নয়।
এই অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই—স্মৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছে বর্তমানের আয়না হিসেবে। অতীতের আন্দোলন, সংগঠনের শক্ত ভিত, কর্মীদের প্রতি নেতাদের দায়—এই সব স্মৃতি বারবার বর্তমানের শূন্যতার দিকেই ইঙ্গিত করে। দর্শকের সামনে প্রশ্ন উঠে আসে—রাজনীতি কি আদর্শ থেকে পুরোপুরি সরে গেছে? নাকি আমরা সেই স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কটাই হারিয়ে ফেলেছি?
‘সঙ্গে সুমন’এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর দেয় না। কিন্তু বিমান বসুর অভিজ্ঞতার ভাষা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। এখানে চিৎকার নেই, উত্তেজনার নাটক নেই। বরং আছে এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। প্রশ্ন না করেও প্রশ্ন তোলা, অভিযোগ না করেও দায় সামনে আনা—এই সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশলই এই পর্বকে আলাদা করে তোলে।
সব মিলিয়ে, এই অনুষ্ঠান সাক্ষাৎকার কম, রাজনৈতিক সংলাপ বেশি। এটি আরামদায়ক নস্টালজিয়ার জায়গায় থেমে থাকে না। স্মৃতির ভিতর দিয়ে বর্তমানকে চ্যালেঞ্জ করে। এমন এক সময়ে, যখন রাজনীতির আলোচনা ক্রমশ শ্লোগাননির্ভর হয়ে উঠছে, ‘সঙ্গে সুমন’-এর এই পর্ব মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি আসলে সময়ের সঙ্গে চলা এক গভীর সংলাপ। আর সেই সংলাপ যত স্মৃতিবহ, ততই তা ধারালো।