তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
সুভাষচন্দ্রের ‘দ্বিতীয়’ প্রেম আসলে অদ্বিতীয়

১৯৩৪ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে ভিয়েনায় দেখা হল এমিলি শেঙ্কলের। সুভাষ তখন 'দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল' রচনায় মগ্ন। ইংরেজি জানা শেঙ্কল তাঁর সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন। পরবর্তী কয়েক বছরে সুভাষ এবং শেঙ্কলের বারবার দেখা হয়েছে। এমিলি তাঁকে ব্যাডগাস্টাইন এবং আল্পসের অন্যান্য জায়গায় ভ্রমণে নিয়ে যান। সুভাষ ভারতে ফেরেন কিংবা ইউরোপ ভ্রমণে যান, দুজনের মধ্যে পত্র বিনিময় অব্যাহত। পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকেও তিনি এমিলিকে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে মিত্রশক্তির ভিয়েনা দখলের সময় শেঙ্কলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ব্রিটিশ অফিসারেরা সেগুলি বাজেয়াপ্ত করে।

'তুমিই প্রথম নারী যাকে আমি ভালোবেসেছি',   লিখেছিলেন সুভাষ, 'ঈশ্বর করুন তুমিই হও শেষ।' ১৯৩৬ সালের বসন্তে, ভারতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, দেশকে তাঁর 'প্রথম প্রেম' হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু শেঙ্কলকে 'আমার হৃদয়ের রানী' বলে সম্বোধন করেছিলেন।

দেশ, মানুষ, ঐতিহ্য, রীতিনীতি - প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর  বিভেদ ভুলিয়ে দিয়েছিলেন এমিলি। 'আগে কখনও ভাবিনি যে একজন নারীর ভালোবাসা আমাকে এমন বন্ধনে জড়াতে পারে। আগে অনেকেই আমাকে ভালোবেসেছে, কিন্তু আমি কখনও তাদের দিকে তাকাইনি'।

 অনেকেরই অজানা, ইউরোপ ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুভাষের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভারতে কারাবাসের নিশ্চয়তা নয়, বরং প্রিয় নারীর থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। সেকথা স্বীকার করে চিঠিও লিখেছিলেন এমিলিকে। 'এমনকি কখনও হিমশৈলও গলে যায়, যেমনটা এখন আমার হচ্ছে।' তবে প্রথম প্রেম দেশের কাছে তো ফিরতেই হবে।  ভবিষ্যৎ ঘোর অনিশ্চিত। 'জানি না আগামী দিন কী নিয়ে অপেক্ষা করছে। হয়তো আমার জীবন জেলে কাটবে অথবা গুলিতে কি ফাঁসির দড়িতে প্রাণ যাবে। যাই ঘটুক, তোমার কথা ভাবব, আমাকে ভালবাসার জন্য নীরবে জানাব কৃতজ্ঞতা। হয়তো আর কখনও দেখা হবে না, আর কখনও চিঠি লেখা হবে না, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার হৃদয়ে, আমার ভাবনায় , আমার স্বপ্নে তুমি থাকবে চিরকাল। যদি এই জন্মে ভাগ্য আমাদের আলাদা করে দেয়, পরজন্মে তোমাকেই চাইব।'

         ১৯৩৬ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ  - ভারত যাত্রার আগের শেষ কয়েক দিন এমিলির সঙ্গে ব্যাডগাস্টাইনে কাটিয়েছিলেন সুভাষ। তার আগে প্রেয়সীকে লিখেছিলেন ,'তুমি কি এখানে এক সপ্তাহের জন্য আসতে পারবে? তোমার বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা কর যে তাঁরা তোমাকে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় বাড়ি থেকে দূরে থাকতে দেবেন কিনা।' ব্যাডগাস্টাইনের অলোকসামান্য পাহাড় এবং উপত্যকা সুভাষকে যেন জাদু করেছিল। ১৯৩৭ সালের নভেম্বরে, শীতকালে ব্যাডগাস্টাইনে এমিলির সঙ্গে দেখা হল। সুভাষচন্দ্র তখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মনোনীত সভাপতি। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে ব্যাডগাস্টাইনে তিনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী 'অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম' লিখেছিলেন। 'আমার কাছে, বাস্তবতার মূল স্বরূপ হল প্রেম। প্রেম হল মহাবিশ্বের সারাংশ এবং মানব জীবনের অপরিহার্য বোধ... আমি আমার চারপাশে প্রেমের উদ্ভাস দেখতে পাই; আমার মধ্যে একইরকম অনুভব করি; আমি উপলব্ধি করেছি, নিজেকে পরিপূর্ণ করার জন্য আমাকে ভালবাসতে হবে এবং জীবন পুনর্গঠনের জন্য প্রেমের প্রয়োজন।'

এমিলি পরে তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে ২৬ শে ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিনে ব্যাডগাস্টাইনে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে। ১৯৪১ সালে যখন বার্লিন গেলেন সুভাষ, এমিলি তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করলেন। ৪১-৪২ সাল তাঁদের জীবনে সবচেয়ে সুখের সময়। ১৯৪২ সালের ২৯শে নভেম্বর জন্ম হল মেয়ে অনিতার। ১৯৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি স্ত্রী-কন্যাকে রেখে সুভাষ আবার চললেন অজানা পথে। তাঁর প্রথম প্রেম দেশ, দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির শপথ নিয়েছেন তিনি। সুভাষ জানতেন পরিণতি কী হতে পারে। তাই চিঠি লিখেছিলেন দাদা শরৎচন্দ্রকে, বিয়ে আর কন্যার জন্মের খবর জানিয়ে। অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁরা বসু পরিবারে তাঁর মতই ভালবাসা পায়। আশা প্রকাশ করেছিলেন, অনিতা একদিন তার বাবার অপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করবে।

কৃষ্ণা বসু 'ইতিহাসের সন্ধানে' বইতে লিখেছেন, এমিলি বলেছিলেন, '১৯৪৫ সালের অগাস্টের সেই অভিশপ্ত দিনে ভিয়েনার বাড়িতে আমি রান্নাঘরে বসে উল গুটিয়ে গোলা করছিলাম। রেডিওতে সন্ধের খবরে শুনলাম, বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে সুভাষচন্দ্র বসুর। আমি উঠে শোওয়ার ঘরে গেলাম। অনিতা ঘুমিয়ে ছিল। ওর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।'

জার্মানিতে অনেক কষ্ট করে মেয়েকে বড় করে তুলেছিলেন এমিলি। রোজ মনে হত, ঐ বেল বাজল। এখুনি নাটকীয় আবির্ভাব ঘটবে সুভাষের। এভাবেই দীর্ঘ ৫১ বছর অপেক্ষায় কেটেছে। 'সুভাষ ফেরে নাই।'


Scroll to Top