১

যেদিন আমার মনে সরস্বতী মূর্তি দেবী হিসেবে স্থাপিত হলেন, টুকটুক করে আরেকটা সরস্বতী
এসে হাজির হল। সুধা... আমার সুধা সরস্বতী। সুধা মেনকা মাসির মেয়ে। মেনকা মাসি খোলাপোতার বাসি বউ। বরের খেদানি খেয়ে কলকাতার ইন্দ্রবিশ্বাস রোডে। ভুঁড়ির কাছে সুধার মাথা ঠাসিয়ে, আমাদের বাড়ি বাসন মাজে। সুধার মাথা ডালিম। তাতে প্রতি চুল আধইঞ্চি লম্বা। ফলে সেটা ডালিম, হাত বোলালে শিরশির করে। ও হ্যাঁ --আরেকটি অনিবার্য বৈশিষ্ট্য ছিল সুধার। চব্বিশ ঘন্টা হলুদ শিকনি ঝরত। নাকের দুপাশে হদ্দ মোটা শিকনি রেখা। সুধামণির সিল্ক রুট।
সরস্বতী পুজোর দিন - দুয়েক আগে সুধা এল খোলাপোতা থেকে। তার বাপ তাকে রেখে গেল মায়ের কাছে। তখন তো বুঝিনি, এই তার ফাইনাল কলকাতায় আসা। ভাবলাম, দুদিন বাদেই তো যাবে চলে! এখন একটু ডালিম মাথায় বেশি করে হাত বুলিয়ে নিই। আঠা আঠা ভালোবাসলাম সুধাকে। ওইদিনই। শিশুর ভালোবাসার সাইজও 'শিশু'। সে ভালোবাসার দিনক্ষণও পুট্টুস। লুডোর পুট।
সুধা এল আর সেদিনই বিকেলবেলা ঠাকুরদা শ্যামবাজার থেকে সরস্বতী নিয়ে এলেন। এখানে বলে রাখি, ট্রাম থাকা সত্ত্বেও সরস্বতী আনতাম বেলগাছিয়া ব্রিজ দিয়ে হেঁটে হেঁটে। ঠাকুরদা খুব হলুদ পছন্দ করতেন। অন্তত সরস্বতী মূর্তির রং হিসেবে বরাবর তাঁকে হলুদ পছন্দ করতেই দেখেছি। বিকেলের রোদ মাখাতে মাখাতে আমি আর আমার ফ্ল্যাটবাড়ির বন্ধু বাপ্পা, সরস্বতী নিয়ে হাঁটতাম। উঁচুতে আলো বেশি - এ সত্য কি মনুষ্যকূল ছোটো থেকেই বোঝে? নইলে ব্রিজ শেষ হলেও কেন নামতে চাইতাম না সরস্বতী নিয়ে। খালি মনে হত, এই রে! নীচু রাস্তায় নেমে পড়লাম। বিদ্যের দেবীই যদি ঠিকঠাক আলো না পায়! তবে তো আমার মুখ্যুর ডিম হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।
মুখ্যুর ডিম মানে মুখ্যু দেবীর ডিম। ডিমফোটা বাচ্চা আমি।

সেবারও নিয়ে আসছি তিনজনে মিলে। আমি, বাপ্পা আর সুধা। সেবারের সরস্বতী- বস্ত্র আরও হলুদ, আরও আলোময়। সেই কোন ছোটোবেলায় দেখা হলুদ, আজও রং লেগে। মনে হচ্ছিল, দুপাশের চওড়া সেতুপথ, পরেশনাথের লাল বাড়িটা --- সব...সবাই আমার সরস্বতী আর সুধাকে একযোগে দেখছে। তিনজন আছি বলে ঠাকুরদাকে ধারেকাছে আসতে দিচ্ছি না। সুধা একবার শুধু চেঁচালে --পোঁটা... পোঁটা পড়ছে। ধপাস। ঠ্যাং ভেঙে সরস্বতী ফুটপাতে। ঠাকুরদা... ঠাস ঠাস । আমি আর বাপ্পা খেলাম। সুধা নতুন। তার ঠাস নেই।
বাড়ি এসে ভাঙা সরস্বতী গুছিয়ে রাখল সুধা। ভাঙা গোছানোয় তার মন খুব। স্বরস্বতীর ভাঙা পায়ের শূন্য জায়গাটায় পা-এর টুকরো সেট করে দিল। পাড়ার কুমোরপাড়ায় যাওয়া হল নতুন মূর্তি আনতে। একপাশে একটা কুমিরের মতো দেখতে জীব পড়েছিল। এমন গোল গোল কুমির মাইরি জীবনে দেখিনি। সুধা ফিসফিসিয়ে বললে-- তুলে নে। কুমিরটা কুমিরের মতো দেখতে নয়।
--- এই শয়তান! তাহলে শুধু শুধু চুরি করব কেন? এ শালার গোল কুমির ঢুকলে ইজেরের পকেট ছিঁড়ে যাবে আমার।
তখনও পর্যন্ত ধারণা ছিল, কারণ থাকলে চুরিটা
"খেলু-মেলু " হয়ে যায়।
সুধা বলল -- যেটা যার মতো দেখতে হওয়া উচিত, সেটা তার মতো না হলে, তাকে ভগমান বাহন করে নেয়। এবারে আমাদের সরস্বতীর দুটো বাহন হাঁস আর গোল কুমির।
বলাবাহুল্য, সুধার বায়নাতেই সেবার নতুনের পাশে ভাঙা পা নিয়ে আরেকটা বসে হাসে । ভাঙা পায়ের মূর্তিটির নাম দিলাম --সুধা। মঠ -মিষ্টি - গাঁদায় সাজল জোড়া বিদ্যামূর্তি। একজোড়া বিদ্যার মাঝে আমাদের চার নম্বর বন্ধু -- গোল্লু কুমির।
সে-রাতে মূর্তির কাছেই ঘুমোলাম তিনটেতে। সুধা বলল -- রাতে যদি হাঁস আর কুমির দুটোয় মিলে সরস্বতী নিয়ে পালায়। চ,ওখানেই ঘুমোই।
সরস্বতী ফাগুনে এলেও, এইসময় ফাগুন তত কড়া হয় না । শুতেই ঠান্ডা চামড়া কামড়ে ধরছে। খস.. খস.. খস...! জোড়ামূর্তি নড়ে।
--- ওঠ ওঠ সুধা। কী বুদ্ধি তোর! যা বললি সব এত ঠিক কী করে হয়ে গেল! ওরে ওঠ। সরস্বতী নিয়ে হাঁস - কুমির উড়ে যাচ্ছে। মুখ্যু হয়ে যাব। আট-এর পরে দশ লিখে ফেলব। ওঠ সুধা। ধেড়ে বয়সেও জ লিখতে শিখি নি রে! ওঠ। --- কই তু্ই?
জোড়ামূর্তির ও-পার হতে আমার সুধামূর্তি হাসে।
নাক- মুখে দই খই।। সুধার হাত টানতে গিয়ে আমার হাত চটচট করে উঠল। ইস! গোলাপি মঠ আধচোষা করে হাতে চটকাচ্ছে মেয়েটা।
চোখ ভর্তি বোকা হাসি নিয়ে বললে -- রাতে তোদের খিদে পাবে বলে সব সরিয়ে রেখেছিলাম জোড়া মূর্তির পিছনে। তোদের ডাকতেই যাচ্ছিলাম -- এত হেঙলু তোরা! হুড়মুড় করে উঠে বসলি!
বাপ্পা চুপ ছিল।
এবার বলল -- খেয়ে নে সুধা। দলা করে করে খেয়ে নে। কুইক।
আরও দুটো গলা -- কুইক কুইক।
হাঁস -কুমির।
মানুষের খাদ্য যোগাবার দায়িত্ব, কবে থেকে যে দেবতাকূল পশু -পাখিকে দিয়ে রেখেছে!
২
বসন্ত পঞ্চমী ৷ আচ্ছা , তার আগের রাতটাকে কী বলে ! যে রাতে মা সরস্বতী পুজোর জন্য হলুদ শাড়ি - হাঁস আর বাদ্যযন্ত্রে সেজে ওঠেন ! নতুন আর কীই বা বলব সে রাতকে --- যে রাত বসন্তের মাত্তর চারদিন ভোগ করতে পেরেছে ! কত সুন্দর অগোচরে থেকে যায় ! কত সন্তান অনামী হয়ে মরে ! পৃথিবীর এক একটি দিন তো মানবেরই সন্তান ৷ সূর্য চাঁদ হাওয়া মেঘ যেমন দিন গড়ে , মানুষও তেমনি তার আনন্দ দুঃখ দিয়ে প্রতি দিনকে সুন্দর করে !
এবার সরস্বতী পুজোর আগের রাতে এক বন্ধুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল ৷ বন্ধু রোগীর নির্দিষ্ট কক্ষে যখন চলে গেলেন আমি হাসপাতালের জানলা দিয়ে দেখলাম কাছে পিঠের সব বাড়িতে টুনি বাল্ব জ্বলছে ৷ এত আলোয় সরস্বতীকে আজকাল সাজান গৃহস্থরা ! এত আলো বরাদ্দ করেছেন গৃহস্থরা বিদ্যের জন্য বা সব মালিন্যকে পাশ কাটিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলা উভচর হাঁসের জন্য !
আমাদের সময়ে সরস্বতী ঝকঝকে এক দিনের দেবী । তার হলুদ শাড়ির সঙ্গে সূর্য পাল্লা দিয়ে ঝরে ! কে বেশি উজ্জ্বল বোঝা যায় না ! দুজনেই প্রাণহীন ৷ দুজনেই জগৎ আলোকিত করে ৷ সে সময় গরিব মানুষরাও সরস্বতী পুজো করতেন ৷ তাঁদের ভোগের থালায় সন্দেশ কম , হলুদ- গোলাপি মঠ বেশি ৷ আমি অবশ্য বুঝতেই পারতাম না -- কেন মঠ ফেলে মিষ্টি খুঁজছে সরস্বতীর বোকা ভক্তরা ! মঠে তো মিষ্টি বেশি ! কেমন মন্দিরের মতো দেখতে মিষ্টি।
আমাদের বাড়িতে ওইদিন মেনু ঠিক করতেন বাবা ৷ ঘি দিয়ে ফুলকপি , ঘরে -কাটা - ছানার ডালনা , টমেটো চাটনি , সিমুইয়ের পায়েস আর গোবিন্দভোগ চালের হলুদহীন সামান্য পাতলা খিচুড়ি ৷ আমাদের বাড়ির সামনে এজি প্রাইমারী স্কুল ৷ সেখানের বেশ কিছু বাচ্চা ,বিশেষত যারা পাঁচিল টপকাতে পারে , তারা আসত এই খিচুড়ি খেতে ৷ শর্তই ছিল - যারা পাঁচিল টপকাতে পারে তারাই খিচুড়ি পাবে ৷ বাবার দেওয়া আজব শর্তে স্কুলের ছাত্ররা মনে করতে শুরু করল ---বিদ্যালয়ের বেড়া ভাঙলে তবেই বিদ্যার দেবীর প্রসাদ পাওয়া যাবে ৷ বাবার মেনু সবার জন্য ৷ এ ব্যপারে তাঁর নিজের বাবার সঙ্গে খুব মিল। ফলে দুপুরের দিকে দেখা যেত , দোতলার বারান্দায় রোদ তার ইচ্ছেমতো খেলছে আর তাতে অনেক পাখি বসে সাদা খিচুড়ি খাচ্ছে ৷ ঘিয়ের গন্ধে ম-ম করত পাখিগুলোর গা ৷ কাকগুলো সবুজ- হলুদ পাখিদের থেকে একটু দূরে বসত ৷ ঠোঁটে তুলে ছানা চাটত ৷ কালো পাখির ঠোঁট সাদা হয়ে থাকত ৷ খিচুড়ি বাদ দিয়ে ছানা কিন্তু কাকেদের নিজস্ব চয়েস ৷ তবে তাদের আলাদা বসা থেকে সর্বজীবের সুন্দর-অসুন্দরের ভাগটা পঞ্চমীর রোদে ঝলমল করে উঠত ৷
জীবের মিলের গল্প আড়ালে থাকে ৷ভেদ শুধু প্রকাশমান হয় ৷
পরশু রাতে যখন বাড়ি ফিরছি তখন পঞ্চমী পড়ে গেছে ৷ একটি স্কুটার সারাবার চালাঘরে ছেলেরা কাগজ কেটে বেদীতে আটকাচ্ছে ৷
তাতে ক- খ লেখা ৷ কোনোটায় এক টিকিওয়ালা বড় মাথার লোকের ছবি ৷ তাঁকে বিদ্যাসাগর বলে বোঝা না গেলেও সে যে বিদ্যাসাগর ছাড়া আর কেউ নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে ৷ উফ ! এত আঠা লাগিয়েছে হতভাগাগুলো! বিদ্যের সাগর ভিজে কাগজের দই হয়ে যাচ্ছে গো !
আমার নাগেরবাজার বাড়ির দুয়োরেই ঠাকুরের মেলা বসে ৷ তখন অবশ্য বেশিরভাগ ঠাকুর বিক্রি হয়ে গেছে ৷ দোকানিরা অল্প কটা নিয়ে বসে বসে বিড়ি খাচ্ছেন। বললাম - এত রাতে কে কিনবে ! বললেন -- এগুলোর একটু করে খুঁত আছে ৷ এগুলো কেনারও মানুষ আছে ৷ পুঁজি কম অথচ যারা ভক্তিভরে পুজোটা করতে চায় ৷ শুধু ওই মূর্তিটা বিক্রি হবে না দিদি ৷ ওই যে আলাদা বসানো আছে মাটিতে ৷ ঐটা .....
দেখলাম - ভ্যানের ওপরকার সরস্বতীগুলোকে ছেড়ে একটি মূর্তি মাটির ওপর বসে ৷ তার মুখ কোমল। পরনের শাড়িতে বসন্তের রঙ ৷ এখানেও হাঁসটি ভাঙা ৷ এক ডানা নিয়ে সেটা একপাশে মুখ থুবড়ে ৷
ভাঙা হাঁসের ঠান্ডা গায়ে হাত দিয়ে বললাম--
মা পরের বার তুমি গাঙে ভেসে ভেসে দূরদেশ চলে যেও ৷ নদী কারোর ডানা ভাঙে না ৷ বরং জলে - ভাসা পাখির হাতে রোদ- জল একই ভাবে পড়ে ৷
আমার বন্ধু ভালো থাক ৷
তার বন্ধুরাও ...
তাদেরও আবার কত্ত বন্ধু ...