পরিষ্কার ও রুচিশীল, কিন্তু খুব বেশি পরীক্ষামূলক নয়

বাংলা সাহিত্যে পপুলিস্ট চরিত্র কাকাবাবু। এর আগে চারবার তাকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে। কাকাবাবু সিরিজ শুরু করেন স্বয়ং তপন সিংহ। সেখানে অবশ্য কাকাবাবু হলেন শমিত ভঞ্জ। পরের তিনটি করেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। তাঁর কাকাবাবু অবশ্য প্রসেনজিৎ। কাকাবাবু প্রতিবন্ধী। তাঁর এক পা সচল। আরেক পায়ে ক্রাচ। তিনি মধ্যবয়সী অবসরপ্রাপ্ত বুদ্ধিদীপ্ত এক মানুষ, যিনি অসম্ভব সাহসী ও পণ্ডিত ব্যক্তি। বিভিন্ন অমীমাংসিত রহস্য উদ্ঘাটন তাঁর নেশা। এমনি এক রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবুও তিনি থেমে না থেকে একটি ক্রাচ ও ভাইপো সন্তুকে সঙ্গী করে রহস্য উদ্ঘাটনের অভিযানে নেমে পড়েন। মোটকথা এমন এক চরিত্র, যাঁর উপস্থিতি মানেই এক ধরনের বক্সঅফিস। বহু দশক ধরে পাঠক-দর্শকের কল্পনায় একটি স্থায়ী জায়গা দখল করে রেখেছে কাকাবাবু। ফলে কাকাবাবু মানেই শুধুই গল্প নয়, বরং স্মৃতি, শৈশব ও নির্ভরযোগ্য বিনোদনের প্রতিশ্রুতি। পঞ্চম বার কাকাবাবুকে চলচ্চিত্র নিয়ে এলেন চন্দ্রাশিস রার। তাঁর পরিচালনায় ‘বিজয়নগরের হীরে’ সেই প্রতিশ্রুতিকে ভাঙে না। বরং সচেতনভাবেই তাকে আগলে রাখে। এই ছবি মূলত কাকাবাবু সিরিজের উত্তরাধিকার বজায় রাখার একটি নিরাপদ প্রয়াস—যেখানে নস্টালজিয়া প্রধান চালিকাশক্তি, আর ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।
ছবির সূচনাতেই পরিচালক দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করতে চান। শিশুদের জিম্মি করে প্রাচীন নিদর্শন পাচারের চেষ্টা—এই দৃশ্য একদিকে বিপদের আভাস দেয়, অন্যদিকে গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুকেও পরিষ্কার করে দেয়। এখানেই কাকাবাবুর প্রবেশ। তাঁর আগমন কার্যত একটি ঘোষণার মতো—এই গল্পে নায়ক উপস্থিত, এখন সব কিছু তার নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। ‘এটা রাজা রায়চৌধুরীর শহর’ —এই সংলাপ শুধু কাকাবাবুর পরিচয় দেয় না, বরং তাঁর চারপাশে তৈরি হওয়া মিথকেও জোরদার করে। তবে একই সঙ্গে এই মুহূর্তটি খানিকটা পরিকল্পিত ‘হিরো-মোমেন্ট’-এর মতো লাগে। পরিচালক এখানে চরিত্রের জনপ্রিয়তার উপর ভরসা করেন, দৃশ্যের নিজস্ব নাটকীয়তা দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করার বদলে।
এই প্রবণতা ছবির বিভিন্ন অংশে ফিরে আসে। নাটকীয়তা প্রায়শই সূক্ষ্মতার জায়গা দখল করে নেয়। দর্শক উত্তেজিত হন ঠিকই, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই অপ্রস্তুত বা চমকে ওঠেন।
এই ছবির সবচেয়ে বড়ো শক্তি নিঃসন্দেহে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়। বয়স তাঁর কাকাবাবুকে আরও সংহত করেছে। এখানে তিনি আর শুধু অ্যাকশন-নির্ভর নায়ক নন, বরং একজন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী—যিনি জানেন কখন কথা বলতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে।
তবে এই পরিণত অভিনয়ের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। কাকাবাবু এখানে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম যে প্রকৃত বিপদের অনুভূতি অনেক সময়ই অনুপস্থিত থাকে। তিনি খুব কম সময়েই সত্যিকারের ঝুঁকির মধ্যে পড়েন বলে মনে হয়। সমস্যাগুলি তাঁর জন্য যেন ধাঁধার মতো—সমাধানযোগ্য, কিন্তু ভয়ংকর নয়। অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার মূল শক্তি যে অনিশ্চয়তা, তা এখানে ফলত খানিকটা দুর্বলই হয়ে পড়ে। দর্শক প্রায় নিশ্চিত থাকেন—কাকাবাবু শেষ পর্যন্ত ঠিকই সব সামলে নেবেন।
রহস্য যখন দক্ষিণ ভারতের হাম্পিতে পৌঁছয়, তখন ছবিটি তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি সামনে আনে। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ইতিহাস, স্থাপত্য ও কিংবদন্তিকে রহস্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এখানে ইতিহাস আলাদা করে বোঝানোর পাঠ্যপুস্তকীয় ভঙ্গি নেই। বরং ক্লু, সংকেত ও সূত্রের মাধ্যমে তা গল্পের অঙ্গ হয়ে ওঠে।
এই অংশে ‘বিজয়নগরের হীরে’ সত্যিই আকর্ষণীয়। দর্শক ইতিহাস জানতে পারেন, আবার সেই জ্ঞান রহস্য সমাধানের হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। তবে ছবিটি এখানেই থেমে যায়। ইতিহাস চরিত্রদের ভেতরের দ্বন্দ্ব বা মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে খুব গভীরভাবে যুক্ত হয় না।
রহস্যের সমাধান হয় জ্ঞানের মাধ্যমে, কিন্তু সেই জ্ঞান চরিত্রগুলিকে বদলে দেয় না। কাকাবাবু, সন্তু বা অন্য সবাই-ই গল্পের শেষে প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন, যেখানে তাঁরা শুরু করেছিলেন।
‘বিজয়নগরের হীরে’ মূলত একটি পারিবারিক ছবি। সেই লক্ষ্য মাথায় রেখেই পরিচালক পরিচিত ও পরীক্ষিত ফর্মুলা অনুসরণ করেন। ফলে গল্পের বেশ কিছু মোড় আগেই অনুমান করা যায়। অভিজ্ঞ দর্শকের কাছে রহস্য খুব বড়ো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় না।
এখানেই ছবিটি কিছু সম্ভাবনা হারায়। বিজয়নগর, ইতিহাস ও গুপ্তধনের গল্প ব্যবহার করে আরও জটিল প্রশ্ন তোলা যেত—প্রাচীন সম্পদের মালিকানা, ইতিহাসের বাণিজ্যিক ব্যবহার, কিংবা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার নৈতিক দায়। কিন্তু ছবিটি সেসব পথে হাঁটে না। বরং সচেতনভাবেই বিতর্ক বা জটিলতা এড়িয়ে চলে। এই নিরাপদ অবস্থান একদিকে ছবিটিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে, অন্যদিকে তাকে সীমাবদ্ধও করে রাখে। সন্তু চরিত্রে আরিয়ান ভৌমিক তাঁর পরিচিত সংযত অভিনয়েই ভরসা রাখেন। কাকাবাবুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু সন্তু নিজে খুব কম ক্ষেত্রেই গল্পের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে। সে মূলত পর্যবেক্ষক, অংশগ্রহণকারী নয়। অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। তাঁরা গল্পের প্রয়োজনে হাজির হন, প্রয়োজন মিটলে হারিয়ে যান। খুব কম চরিত্রই আলাদা করে দর্শকের মনে থেকে যায়।
ছবিতে হালকা রসবোধ রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। কিছু সংলাপ ও পরিস্থিতিতে হাসির রেশ থাকে, যা ছবিকে অতিরিক্ত গম্ভীর হতে দেয় না। পারিবারিক দর্শকের জন্য এটি অবশ্যই স্বস্তিদায়ক। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই রসিকতা উত্তেজনার ধারাকে খানিকটা শিথিল করে দেয়। যেখানে গল্প আরও টানটান হতে পারত, সেখানে হালকা কৌতুক ঢুকে পড়ে। ফলে অ্যাডভেঞ্চার ও কমেডির ভারসাম্য সব জায়গায় সমান থাকে না। হাম্পির লোকেশন ছবির বড়ো সম্পদ। স্থাপত্য নিজেই এত শক্তিশালী যে আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। চিত্রগ্রহণ পরিষ্কার ও রুচিশীল, কিন্তু খুব বেশি পরীক্ষামূলক নয়। ভিএফএক্স ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত দিক গ্রহণযোগ্য হলেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। ছবিটি স্পষ্টতই ঝুঁকি কম নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘বিজয়নগরের হীরে’ একটি পরিমিত, নিরাপদ ও শ্রদ্ধাশীল কাকাবাবু ছবি। এটি সিরিজের ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখে এবং নস্টালজিয়ার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দর্শককে টানে। তবে নতুন কোনো দিগন্ত খুলে দেয় না। শিশু ও পারিবারিক দর্শকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উপযুক্ত। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক দর্শক, যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার ঘরানায় আরও জটিলতা, ঝুঁকি বা ভাবনার খোরাক খোঁজেন, তাঁদের কাছে ছবিটি খানিকটা পরিচিত ও সংযত বলে মনে হতে পারে। তবু আজকের দ্রুতগতির, বাজার-নির্ভর বিনোদনের যুগে দাঁড়িয়ে ধৈর্য, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের উপর বিশ্বাস রেখে এমন একটি ছবি তৈরি করাও কম সাহসের কাজ নয়। এই বিশ্বাসই ‘বিজয়নগরের হীরে’-র সবচেয়ে বড়ো শক্তি—আবার তার সীমাবদ্ধতার মূল কারণও।