তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
পাওয়া না-পাওয়ার ভিড়ে বইমেলা

বইমেলা এ বছরের মতো শেষ হতে না হতেই, প্রতিবারের মতোই বাৎসরিক  তরজা শুরু – আগে  লোকে গোঁসা করত, বাঙালি বইমেলায় গিয়ে ফিশফ্রাই খেত বলে, এখন তারা নাক কুঁচকে সেলফির পেছনে পড়েছে।  কেউ কেউ আবার এত বুড়ো হয়েছে যে, ছেলে-মেয়েদের হইহল্লাকে ‘কর্পোরেট’ বলে, লিটিল ম্যাগ প্যাভিলিয়নে পাজামা এট্টু উঁচুতে তুলে ঘুরেছে। মায়াজলের ফেরে পরে বমি করেছে আপন হতাশা – নতুন লিখিয়ের  এগিয়ে আসা হাসিমুখের ছবি দেখে যাঁদের অসূয়া হয়, সামান্য মানুষের আনন্দিত মুখের রেখায় যাঁরা আত্মপ্রচার খোঁজেন, সামান্য পুঁজির প্রকাশকের সানন্দ পোস্টে দাঁত কিড়মিড় করেন, তাঁদের পাশ কাটিয়ে আমি রোজ রোজ চলে যাই  সেই সব কবিদের কাছে, যাঁদের হাতের অদৃশ্য জাদুদণ্ড পড়ে থাকে বইমেলায় নানান কোণে।  বারবার গিয়ে দাঁড়াই, চোখে দেখতে না-পাওয়া কিছু মানুষের মুখোমুখি। এ বছরও  ৯ নং গেটের ও পাশ  থেকেই ছেঁড়া কাগজের মতো ছড়িয়ে থেকেছেন কিছু অন্ধ মানুষ, তাঁদের আশ্রমের জন্য সাহায্য প্রার্থনায়।  মায়ের সঙ্গে প্রথম বার বইমেলায় গিয়ে এঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার তখন ক্লাস ইলেভেন।  তখনকার মতোই, এবারও কথা হতে, বললেন, ‘আসবেন একবার আমাদের ওখানে’, আমিও প্রতিবারের মতোই জানিয়ে এলাম, যাবো। তারপর, বিপুল ভিড়ের অংশ হতে দেখা হল কত না অনুজ, অগ্রজদের সঙ্গে। দু-এক মিনিট দাঁড়িয়ে,  হাঁপিয়ে, এক নম্বর  থেকে নয় নম্বর টানা আসা-যাওয়া করে, অপমান এবং আবাহন সহ্য করেও তাই যাই  – বিকেলের ঝোঁকে পায়ে টান ধরতে গিয়ে বসি , বন্ধুর পেতে রাখা চেয়ারে। বসে বসে শুনি , শহরতলী থেকে আসা কিশোরীর জন্য তার বাবার বই কেনার জন্য খুচরো গোনার শব্দ, শুনি কলেজ থেকে আসা প্রেমিক-প্রেমিকার একখানা আইসক্রিম ভাগ করার কালের খুনসুটি – দেখি অগণিত মানুষের হাসি মুখ, জ্ঞান হারানো তরুণীকে ঘিরে উদ্বিগ্ন মুখ, জলের পাউচ ভাগ করে পান করা বন্ধু মুখ, আড়ালে ছু্রি হাতে,  সামনে ‘কেমন আছিস’-এর মুখোশের মুখ, অকালে চলে যাওয়া পুত্রের স্বপ্ন নিয়ে ম্যাগাজিন করা মায়ের মুখ। দেখতে দেখতে ভুলে গেছি, পত্রিকা নেওয়া হয়নি, ভুলে গেছি ধুলোতে আমারও চোখের জল লেগে আছে। মেলায় ঢুকতে দেখি  রুচিরাদিকে – সেই রুচিরাদি, যে কিনা গত এক দশক ধরে সন্তানের অকাল মৃত্যুর কারণ জানতে লড়ে যাচ্ছে, সে এসে জড়িয়ে ধরে আর আমি উলটো দিকে তাকিয়ে দেখি, ডুবন্ত সূর্য জানিয়ে যাচ্ছে, সে আবার আসবে। সামান্য দূরে ছবি তুলছে কারা – ডাকছে কাকে চিৎকার করে, এদিকে এসো। কোনদিকে যে যাব ? বাবা, মেয়ে মুড়ির দোকান দিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের পাশে। সেখানে তারা কফি বানিয়ে দেবে নিজেরা – মেশিনে নয় -  নবীন লেখক, কবি এদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখি, রিং রোড ফাঁকা। গয়না, হাতে গড়া কাজ নিয়ে আসা শিল্পীরা নেই, ওরা নাকি ‘বিপজ্জনক’ – তাই পাঁচ নম্বর গেটের উল্টোদিকে মেলার বাইরে, ওরা বসেছে। আমরা ওই  দিক দিয়ে আসি, যাই ওদের সঙ্গ করতে। কাপড়ের গয়না, ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনি। মেলার মাঠে অবিরাম কাজ করে যান সাফাইকর্মীরা। নিরাপত্তা রক্ষীরা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দ্যান কোন দিকে কী আছে। তবু  দিক ভুল হয়ে যায় আবার।  অবিশ্রাম ঘুরতে থাকা, ম্যাসকট  হাঁসা-হাঁসিকে দেখে ভাবি, এক গ্লাস জলও কি পেয়েছে ওরা সারাদিনে ? গিল্ড অফিসে হাসিমুখে মাইকে থাকে মুনিয়াদি, রাজদীপ। সেখানে বুড়ি ছুঁয়ে যাই, আরেকটু ভেতরে। হুইল চেয়ারে বসা,বয়স্ক মানুষ মনোযোগ দিয়ে বই দেখছেন, কিন্তু ভেতরে যাওয়া ব্যবস্থা নেই  – মুহূর্মুহু গান – বড়ো বড়ো প্রকাশনের বিপণীর সামনের লম্বা লাইন ডজ করে করে  খানিক দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসি ইউ টার্ন নিয়ে। ব্যাগ খুলে দেখি, পুরনো বন্ধুদের মিসড কল। বইয়ের পাশে বন্ধু থাকে বলেই না এই মেলা, বইমেলা ! যাব না আজ – জানিয়েও ফের  দুপুরে হাঁটা দিই, মেলার মাঠের দিকে। মেয়ে সঙ্গে যায় – তারপর আমাদের ‘ইরাদি’র জিম্মায় জমা হয়। গরম শিঙাড়া এনে – গর্বিত মুখে সার্ভ করে সবাইকে। তার নুরমামার কোলে বসে সন্দেশ খায়। তুমুল হল্লা শেষে ছলছল চোখে ফেরার পথে বলে, ‘আমাকে কাল আনবে তো?’ রিং রোড ধরে ফিরতে ফিরতে, আপন জন ফেলে আসার দুঃখ হয় আমার ! শেষ দিন বিকেলে দেখি, মা লক্ষ্মী আসছেন – লাল পাড় সাদা শাড়ি, কপালে সিঁদুর – ওমা এ যে,কবি আত্রেয়ী চক্রবর্তী। পেঁচা নেই তোর, বলে নিজের সম্ভাব্য ক্যান্ডিডেচার পেশ করতে যাব, পাশ থেকে রূপ, আমার ভাই বলে, দিদি, তুই বড্ড ভালো, কাওয়া খাই চ ! আমরা আবার হেঁটে হেঁটে কাশ্মিরী কাওয়া চা খেতে যাই। দই, পিৎজা, আইসক্রিমের স্টলে মানুষের ধাক্কা খাই – অজস্র স্যরির ভিড়ে, আকস্মিক কানে আসে, ‘দুঃখিত’। এই মেলাকে নিয়ে খিল্লি করলে, আমার ব্যক্তিগত দুঃখ হয়, বিশ্বাস করুন। শেষ বার আর নয়, নয় – এক নম্বার গেটের দিকে হাঁটতে থাকি, মরিয়া-জেদি এক রকম হাঁটা -  একবার জিতে যাওয়ার  জন্য, সর্বস্ব বাজি রাখা আদ্যোপান্ত হেরো আমি – সামনের দিকে এগোতে চেষ্টা করতে করতে দুপাশে  তাকিয়ে দেখি, দৃষ্টিহীন, বিষণ্ণ, বে-রোজগেরে, ব্যর্থ বিপুল জনগণ হাঁটছে আমার সঙ্গে। আমরা পিছিয়ে পড়ছি বটে, কিন্তু রয়ে যাচ্ছি – আপনাদের সমবেত সিনিসিজমের সামনে আমরা হেসে ফেলে পরবর্তী বইমেলায় যাবই,  ছবি তুলবই  – প্রমিস।


Scroll to Top