
আমরা সবাই জানি ‘মুক্ত বায়ু’র সঙ্গে ‘আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু’র একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। তবুও বায়ুদূষণ অব্যাহত। একসময় শীত ছিল স্বাস্থ্য ফেরানোর সময়, এখন তা বদলে গেছে আতঙ্কে। কলকাতায় বছরভর বাতাসের গুণমান কি দাঁড়াচ্ছে তার ওপর একবার চোখ রাখলেই এই আশঙ্কা স্পষ্ট হয়।
শীত এবং উৎসবের সময় দূষণ বাড়াটা এখন এক সাধারণ নিয়ম। এ বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে শহরের বায়ুদূষণ ‘খারাপ’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে জানাচ্ছেন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। আমরা দেখছি, বছরের বেশিরভাগ সময়ে বায়ুদূষণ মাঝারি থাকলেও উৎসব ও শীতের সময় তা অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে, যা সত্যিই এক উদ্বেগের বিষয়। কারণ, শীত উপভোগ্য হলেও দূষণ উপভোগ্য নয়। মোদ্দা কথা হল, ২০২৫ সালে কলকাতা বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কিঞ্চিৎ সাফল্য পেলেও তা ঋতুভিত্তিক চ্যালেঞ্জ এবং উৎসবের কারণে স্বাস্থ্যসম্মত মানে পৌঁছতে পারেনি। ‘ক্লাইমেট ট্রেন্ডস’-এর সমীক্ষা বলছে কলকাতার বাতাসের গুণমান দিল্লি বা লখনৌ-এর চেয়ে ভালো হলেও নিরাপদ ছিল না।
ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রামের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি ও মেট্রোর প্রসারের ফলে শহরের যানদূষণ কমেছে। কিন্তু এই সুফল কাজে লাগানো যায়নি। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বল্গাহীন বর্জ্য পোড়ানো, পূর্ব কলকাতার জলাভূমি হ্রাসের ফলে দূষণ কমার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছতে পারেনি। সপ্তাহের কাজের দিনগুলিতে মধ্য কলকাতার একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যানবাহনের চাপ বাড়াও শহরে বায়ুদূষণ বাড়ার একটা বড়ো কারণ।
ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রামের ষষ্ঠ বার্ষিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি, মেট্রোর ব্যবহার বাড়া এবং দূষণ রোধে গণপরিবহণে বিনিয়োগের ফলে শহরে দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই একটা বড়ো সাফল্য, কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করতে হবে। দূষণ রোধ একদিনের কাজ নয়, এর কোনো সূচনা বা সমাপ্তি নেই। এটা একটা লাগাতার প্রক্রিয়া। তবে একথা মানতেই হবে বছরের শুরুতে কিছু উন্নতি দেখা গেলেও ২০২৫ সালে উৎসব ও শীতকালে দূষণের মাত্রা ‘অস্বাস্থ্যকর’ বা খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেওয়ালির পর দূষণ বেড়েছিল, তবুও সামগ্রিকভাবে তা দিল্লির তুলনায় ভালো ছিল, যদিও বছরের গড় <1>PM2.5 মাত্রা এখনও ‘হু’ নির্ধারিত সীমার ওপরে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুপ্রবাহ ভালো থাকায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কিছুটা উন্নতি দেখা যায়, তবে দূষণের মূল কারণগুলি, যেমন যানবাহন, ধুলো, শিল্প প্রায় বার্ষিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতকালে নির্মাণ কাজের ধুলোর পাশাপাশি একটু উষ্ণতার জন্য টায়ার ইত্যাদির মতো নানা বিপজ্জনক বর্জ্য পুড়িয়ে তাপ পোহানো কোয়ালিটি ইনডেক্সকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। শহরকে ঘিরে থাকা তপসিয়া, ট্যাংরা এবং হাওড়ার মতো শিল্পাঞ্চলের দূষণের কারণে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। ইলেকট্রিক ভেহিকেল আরও বাড়ানো এবং শীতে নির্মাণ কাজে ধুলো কমানো না গেলে এই অবস্থা পাল্টানো কঠিন।
কিছু বিশেষজ্ঞ জানাচ্ছেন, ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের দূষণ শীতকালে বাড়ার কারণ শুধুই যানবাহন বা কলকারখানার ধোঁয়া নয়, এটা ঘটায় আবহাওয়া। ঠান্ডা উত্তুরে বাতাস, কম বৃষ্টিপাত এবং ঘন জনবসতির কারণে ধূলিকণাগুলি এক জায়গায় আটকে যায়, যা দূষণকে ছড়িয়ে যেতে দেয় না। আবহাওয়া বিজ্ঞানী মহেশ গালাওয়াতের মতে, তাপমাত্রা কমলে বাতাসে ইনভার্সন লেয়ার বা তাপমাত্রার বীপরীত স্তর বাড়ে। এটা এমন একটা স্তর, যা বাতাস এবং সূর্যালোক ভেদ করে বায়ুকে পরিস্কার হতে দেয় না।
ক্লাইমেট ট্রেন্ডস-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি এবং বিজ্ঞানসম্মত নীতি গ্রহণ করা দরকার। নাহলে বায়ুদূষণের সমস্যা তীব্র হবে দেশের সব মহানগরে। তারা জানাচ্ছেন, ভারতের বড়ো শহরগুলির বাতাসের মান সাধারণভাবে নিরাপদ নয়। এর মধ্যে রয়েছে কলকাতাও। এই সমীক্ষা করা হয়েছে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। এই শহরের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বেশিরভাগ সময়েই ৮০ থেকে ১৪০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ফলে বাতাসের গুণমান এখানে সারা বছর মাঝারি শ্রেণিতে থাকলেও শীতে খারাপ শ্রেণিতে চলে যায়।