তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
সময়ের গোপন ইতিহাস
সুপ্রিয় চৌধুরী নামী ঔপন্যাসিক। দ্রোহজ উপন্যাসটি একদা শারদীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে তাঁকে  যথেষ্ট পরিচিতি দিয়েছিল। ‘জলভৈরব’ এবং ‘বৃশ্চিককাল’ উপন্যাস দুটিও তাঁর খ্যাতি বৃদ্ধি করেছে। এ বাদেও একাধিক লেখায় তিনি পাঠকের নজর কেড়েছেন। বছর কয়েক আগে একটি সাময়িক পত্রে ধারাবাহিকভাবে যখন তিনি কলকাতা শহর তথা বাংলার অন্ধকার জগৎ নিয়ে লিখছিলেন সে লেখাও যথার্থ কারণে পাঠকের নজর টেনেছিল। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে একদম হালফিল বাংলা  তথা পশ্চিমবঙ্গের  অপরাধ জগতের এই সালতামামি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি খুঁজে নিয়েছেন চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের আনক্রাউনড কিং অফ ক্যালকাটা আন্ডারবেলি  গোপাল পাঁঠা, ভানু বোস, রাম চ্যাটার্জি থেকে আরম্ভ করে ৭০-৮০ দশকের ফাটাকেষ্ট, মীর মোহাম্মদ ওমর, রশিদ খানসহ সাট্টা ডন রাম অবতার প্রমুখের কুখ্যাত হয়ে ওঠার কাহিনিকে, যার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে এই রাজ্যের আর্থ সামাজিক তথা রাজনৈতিক বাস্তব। তিনি সরাসরি বলেছেন, ' একটা এলাকা, সমাজ বা জনগোষ্ঠীতে এত মানুষ থাকতে হাতেগোনা কয়েকজন কেন এরকম বেয়াড়া , বেখাপ্পা, মূল স্রোতের ভাষায় ' মিস ফিট ' বা কোট আনকোট সমাজ বিরোধী হয়ে ওঠে, সেসব জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাওয়ার এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা আমাকে পেত্নীজলার চোরাপাঁকের মতো বারবার টেনে নিয়ে গেছে আলো-আঁধারি, আবছায়া মাখা, কখনো চির কুয়াশা ঘেরা ভীষণ রহস্যময় ওই দুনিয়ার গলিঘুঁজিগুলোয়।' ' অপরাধ বিজ্ঞানের মতে কেউ জন্ম অপরাধী নয়। একজন মানুষের অপরাধী হয়ে ওঠার অন্যতম কারণগুলি হল --- দারিদ্র্য, সামাজিক অসাম্য, শিক্ষার অভাব ও চারপাশের পরিবেশ, যেখানে সে বেড়ে উঠেছে।' জানিয়েছেন সুপ্রিয়। ‘পাতাল পুরাণ’ কাফে টেবল বুকস থেকে বেরোনো ২৩৯ পাতার সেই বই যা এক অর্থে এক সামাজিক ইতিহাস, আমাদের পরিচিত উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের গল্প দিয়ে যে ইতিহাসকে আদপেই ধরা যাবে না। আর যাবে না বলেই সুপ্রিয় তাঁর এই পরিপার্শ্বকে স্রেফ পরিচিত ছবি বা ছবির আদল দিয়ে যেমন ধরতে চাননি, তেমনই এ পরিপার্শ্বকে তিনি মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন 'বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা, গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব শত্রুতায় বদলে যাওয়া, চক্রান্ত, গুপ্তহত্যা অথবা সরাসরি হনন, এক বাহুবলীকে সরিয়ে অন্য বাহুবলীর উঠে আসা, অপরাধীর নাগাল পাওয়ার বিষয়ে পুলিশের কাছে অপরাধচক্রের মধ্যে মিশে থাকা সোর্স বা ইনফরমারদের গুরুত্ব বা ভূমিকা, দুনিয়ার অন্য সমস্ত ক্রাইম সিন্ডিকেটগুলোর মতো' নানা টেক্সচারের ভেতর দিয়ে। সুপ্রিয়র লেখার মূল আকর্ষণ হল তাঁর মেদহীন, সুঠাম, নিজস্বরকম সরাসরি ভাষা। একদম সাংবাদিক সুলভ অভিনিবেশে তিনি কেবল সময়টাকেই চিনিয়ে দেন না, দিতে দিতে চকিতে পৌঁছে যান কাহিনির অন্দরমহলে। এবং আমরা যেহেতু তাঁর ওই ধরে ধরে চিনিয়ে দিতে দিতে এগোনো ভূগোলেরই বাসিন্দা, ফলে মুহূর্তে পাঠক থেকে বদলে যাই এসব ঘটনার প্রায় যেন প্রত্যক্ষদর্শীতে, যারা প্রত্যেক মুহূর্তে ওই সময় তথা ভূগোলের বাসিন্দা হিসেবে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে গভীরভাবে চিনি গোটা পরিবেশটাকে। এবং এটাই সুপ্রিয় লেখার মজা যে, তিনি এখানে কাউকে চিহ্নিত করেন না, কেবল নিষ্পৃহভাবে বিবৃত করে যান একের পর এক ঘটনাগুলোকে, যে বিবরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাঁর দেখা, তাঁর চকিত মন্তব্য, তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ। এবং মুহূর্তে ‘পাতাল পুরাণ’ হয়ে ওঠে একটা গোটা সময়কালের ক্রনিকল, যা আমরা নানা সময়ে একে অন্যের কাছে বিবৃত করেছি --- ফারাক কেবল সুপ্রিয় এখানে নিঃশব্দ দ্রষ্টা মাত্র, এবং বিবৃতিদাতাও --- যা আমরা হতে পারিনি। এ কাজ করতে করতে , সম্ভবত নিজের অজান্তে, ক্রনিকলারের আদলেই প্রায়, সুপ্রিয় ধরে ফেলেন সত্যটাকে, যেখান থেকে অনায়াসে বলে ওঠা যায়, এর সীমানায় রয়ে গেছে আরও একাধিক রাজ্য। ‘কিন্তু ছবিটা হুবহু একই রকম। ক্যারেক্টার অ্যান্ড কন্টিনিউটি, চরিত্র, ধারা এবং ধারাবাহিকতা। কোনো ব্যতিক্রম নেই। অন্যথা নেই কোনো...' অসামান্য এই ক্রনিকলের পাঠক হিসেবে বলতে দ্বিধা নেই ‘পাতাল পুরাণ’ পাঠককে টানবে আমাদের কালপর্বের মধ্যেই বসে ইতিহাসের একটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতাকে অত্যন্ত সুচারু ভাবে চিহ্নিত করাই কেবল নয়, সেই সঙ্গে তাকে আরও বড়ো একটা ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে আন্তর্জাতিক একটা চেহারায় উন্নীত করার জন্যও, অনেকটাই।   পাতাল পুরাণ : সুপ্রিয় চৌধুরী, কাফে টেবল বুকস, ৪৫০ টাকা    

Scroll to Top