
তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন সমীক্ষা এবং বিভিন্ন কাজকর্ম দেখার ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা আই-প্যাক। প্রতীক জৈন সেই আই-প্যাক-এর কর্ণধার। এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সমীক্ষা-সহ সাংগঠনিক নানা কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আই-প্যাক নামক সংস্থাকে, যেটির আগে প্রশান্ত কিশোর ছিলেন প্রধান, কিন্তু এখন পিকে সরে গিয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন কো ফাউন্ডার প্রতীক জৈন। সম্প্রতি প্রতীক জৈনের বাড়িতে এবং অফিসে ইডি হানা হয়। আর যে বিষয়ে তদন্তের জন্য ইডি হানা হয়, সেটি হল বহু প্রাচীন এবং অনেক দিনের পুরনো কয়লা চুরির মামলা। সেই কয়লা চুরির মামলায় কোন এক ব্যক্তিকে ধরা হয়েছে। তার সঙ্গে প্রতীক জৈনের কোন সম্পর্ক আছে কিনা, সেটা নিয়ে ইডি হানা হয়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রতিবাদ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ইডি হানা চলাকালীন হাজির হন তাঁর অফিসে। সেখানে গিয়ে তিনি দলীয় সাংগঠনিক বেশ কিছু কাগজপত্র সেখান থেকে নিয়ে আসেন।
এটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইডি সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত চলে গেছে। তারা বলছে, মুখ্যমন্ত্রী অনেক নথি চুরি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, কোনও চুরি তিনি করেননি এবং সেখানে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যাননি, তিনি গেছিলেন দলের প্রধান হিসেবে। আর পুলিসের লোকেরা তাঁর নিরাপত্তা দেখার জন্য যেতে বাধ্য। যেমন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও দলীয় কার্যালয়ে পুলিসের লোকেরা যান। এটার মানে এই নয় যে, ইডির তদন্তে বাঁধা পড়েছে এবং ইডিও বাঁধা দেয়নি এবং মুখ্যমন্ত্রী চলে আসার পরেও ইডি ওখানে কাজ করেছে।
ঘটনাটা এইরকম। এটা নিয়ে ইডি-র থেকেও বেশি মুখ খুলেছে বিজেপি। আসলে বিজেপি নির্বাচনের সময় এটাকে একটা মস্ত বড় ইস্যুতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছে।
ইডির ভূমিকাতে অনেক প্রশ্ন উঠছে। তার কারণ, ভোটের একদম মুখে কেন ইডি হানা হয়? আর ভোটের আগে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভোট হয়ে যাওয়ার পরে জামিনে তারা ছাড়া পেয়ে যায়। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে এরকম হয়েছে। সুতরাং, ভোটের আগে ইডি এবং ভোটের পরে জামিন। এখন এটাতে বিগত নির্বাচনে কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর কোনও প্রভাব পড়েনি।বিষয়টা হচ্ছে, তাহলে একই পথে কেন যাচ্ছে ইডি?
ইডি'র বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তবে এটা খুব পরিষ্কার, ইডি যে নিরপেক্ষ নয়, সেটা কিন্তু স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সিবিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ অফিসার শান্তনু সেন বলেছিলেন, সিবিআইয়ের তদন্তের পদ্ধতি হওয়া উচিত Covert, Overt নয়। তদন্ত হয়ে যাওয়ার পর আদালতে যখন সিবিআই চার্জশিট দাখিল করল তখন সেই চার্জশিট প্রয়োজনে প্রকাশ্যে আনা যেতে পারে। কিন্তু তদন্ত চলার সময় সিবিআই সংবাদ মাধ্যমকে কোথায় রেড করছে, কখন রেড করছে, কীভাবে রেড করছে- এসব জানায় না। পূর্ণ তদন্তের রিপোর্ট জানার আগেই আংশিকভাবে তল্লাশির খবর প্রচারিত হলে, বিশেষত রাজনৈতিক নেতা বা দলের তদন্তের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিপক্ষের নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এমনকী নির্বাচন না থাকলেও প্রমাণ ছাড়া খবর হলে রাজনৈতিক দলগুলো কাদা ছোড়াছুড়ি করার সুযোগ খুঁজে পায়।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত অরুণ জেটলি আমাকে বলেছিলেন, আগে অর্থমন্ত্রীর অধীনে এনফোর্সমেন্ট আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে নিজের মত করে তদন্ত করত। আর সিবিআই ফৌজদারি দুর্নীতি নিয়ে স্বাধীন ভাবে তদন্ত করত। পরবর্তীকালে নরেন্দ্র মোদীর সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, এনফোর্সমেন্টের যেকোন তদন্তে সিবিআইয়ের সহায়তা নেওয়া হবে। সিবিআইও যেকোন তদন্তে এনফোর্সমেন্টের সহায়তা নেবে। কারণ, যেকোন আর্থিক দুর্নীতিতে ফৌজদারি ইস্যু জড়িয়ে থাকে। আবার সিবিআইয়ের যেকোন ক্রিমিনাল মামলায় আর্থিক দুর্নীতি দেখতে পাওয়া যায়। এই কাণ্ডজ্ঞান থেকে মনে হয়, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু নির্বাচনের মুখে যখন কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ইডি হানা দেয়, তখন তার কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যামেরাম্যান এবং সাংবাদিকদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ওই বাড়িতে আমরা আসছি। ইডি পৌঁছনোর আগেই সাংবাদিকরা পৌঁছে যায়। তখন মনে হয়, এটা তদন্ত নয়, এটা রাজনীতি।
ইলেকট্রনিক চ্যানেলের এক সক্রিয় সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, ইডি আগাম জানিয়ে দিলে আমরা আমাদের ক্যামেরা নিয়ে ফিল্ডিং সাজিয়ে নিই। আমরা সাংবাদিকরা ইডির এই জানিয়ে দেওয়া পছন্দ করি। কারণ আমাদের আর খবর খুঁজতে যেতে হয় না। আমাদের কোন পরিশ্রম করতে হয় না। ইডি এবং সিবিআই আমাদের ট্রে-তে করে খাবার সাজিয়ে দেয়।
এবার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দপ্তরে ইডি তল্লাশি চালাতে যাবে সেটাও কিন্তু Covert অপারেশন ছিল না। টিভির পর্দায় আমরা তাদের অভিযান লাইভ দেখছি। সম্ভবত এই পদ্ধতিকেই বলা হয় মিডিয়া ট্রায়াল। সংবাদ মাধ্যম ঠিক করে দেয় কে সৎ আর কে অসৎ, কে দোষী আর কে নির্দোষ। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, ইডি-র রেড হওয়ার আগেই বিজেপি নেতারা বলে দিচ্ছে, অমুক নেতার বাড়িতে এবার ইডি যাবে। ইডির জুজু দেখিয়ে বিজেপি নেতারা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, গোটা দেশ জুড়ে প্রতিপক্ষের কাছে একটা আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করছে।

আমি এতক্ষণ যে আমার অভিজ্ঞতার কথা লিখলাম, তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি সিবিআই প্রতিষ্ঠানটিকে তুলে দেওয়ার পক্ষে। জওহরলাল নেহরুর সময় '৬৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু নেহরু '৬৪ সালে চলে গেলেন। দুর্নীতি দমনের জন্য একটা পৃথক সংস্হার প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্র নায়কেরা অনুভব করেছিলেন। দুর্নীতি সেদিনও ছিল, আজও আছে। এখন দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারিতে টাকার অঙ্কের পরিমাণ হয়ত বেড়েছে। সমাজ নামক পিরামিডের শিখর থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিরও গণতান্ত্রিকরণ হয়েছে। দুর্নীতি আরও বিকেন্দ্রীভূত হচ্ছে। কিন্তু সিবিআইকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। দুর্নীতি সমর্থন যোগ্য নয়। তবে দুর্নীতিকে মূলধন করে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেল কি সমর্থন যোগ্য? বাবু জগজীবন রামের বিরুদ্ধে জীবনবীমা কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছিল। টাকার পরিমাণ ছিল অনেক অল্প। ইন্দিরা গান্ধী সেই ফাইলটি তাঁর ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি বাবু জগজীবন রামকে সেই ফাইল দেখিয়ে বলেছিলেন, এই দেখো, তোমার ব্যাপারে এইসব রিপোর্ট এসেছে। একটু সাবধানে থেকো। বাবু জগজীবন রামের বিক্ষুব্ধ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এটিই ছিল যথেষ্ট। নেহরুর যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণ মেননের মত প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তাঁকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। তিনি পরে অবশ্য আবার মন্ত্রীসভায় ফিরে এসেছিলেন।
প্রয়াত সমাজবাদী পার্টির নেতা, আমাদের কলকাতার অমর সিং আমাকে বলেছিলেন, আপনাকে একবার যদি সিবিআই ছুঁয়ে ফেলে তাহলে সেই ফাইল বন্ধ হয় না। সেই ফাইল অগ্রাধিকার পাবে কি পাবে না, সেটা আলোয় আসবে কি আসবে না, কতটা প্রচারিত হবে- এগুলো নির্ধারিত হবে শাসক প্রভুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম থাকছে তার ওপর। মুলায়ম সিং যাদবের সিবিআই তদন্তগুলো মেটানোর ব্যাপারে অমর সিং খুব সক্রিয় ছিলেন। মুলায়ম সিংয়ের আয়ুর্বেদ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে মায়াবতীর তাজ-করিডরের মামলা, সবেতেই রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেল অব্যাহত ছিল।
আমি মনে করি, যদি কারোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি থাকে, সিবিআই যদি সে দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারে আদালতের সামনে, তবে তাকে গ্রেফতার করা হোক, শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ পত্র তৈরি করে, সেটি সংবাদ মাধ্যমকে খাইয়ে দিয়ে ভোটের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। আর সেই কাজটাই কিন্তু আজও হয়ে চলেছে।

নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ'র বিরুদ্ধে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময় যদি সেই ধরনের ব্ল্যাকমেলিং তদন্ত অন্যায়ভাবে হয়ে থাকে, আর সেটা কংগ্রেস করে থাকে তবে সেটাও কংগ্রেস গর্হিত অন্যায় করেছিল। সেদিন বিজেপি সিবিআইয়ের নাম দিয়েছিল ‘কংগ্রেস ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’। আর আজ কংগ্রেস করেছিল বলে বিজেপিও সেই একই অন্যায় করবে, যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের দল বিজেপি তাই?
সেদিনের সিবিআই যদি 'কংগ্রেস ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন' হয়ে থাকে তবে আজ সেটি বিবিআই-তে পরিণত। 'বিজেপি ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন'-এ পরিণত হওয়াটাও গণতন্ত্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।
লালকৃষ্ণ আডবাণীকে যখন উপপ্রধানমন্ত্রী করা হল, ক্যাবিনেট সচিব বিজ্ঞপ্তি জারি করে বললেন যে, আডবাণীর পোর্টফোলিওতে পার্সোনাল এবং পাবলিক গ্রিভেন্সও থাকবে, যেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পাশাপাশি উপপ্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকবে। সেদিন আমি আডবাণীর সামনে বসেছিলাম। আডবাণীর কাছে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব কমল পান্ডে এসে ফাইলটি দিলেন। আডবাণী পড়ে কমল পান্ডেকে বলেছিলেন, পাবলিক গ্রিভেন্সস থাক কিন্তু পার্সোনাল দপ্তরটা আমি নেব না। কারণ অযোধ্যার মামলায় এখনও চার্জশিটের খাঁড়া আমার ওপরে ঝুলছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি না হলেও যখন রাজনৈতিক ইস্যুতে একটা চার্জশিট আছে তখন এই দায়িত্ব নেওয়া অনৈতিক হবে। তখন বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ব্রজেশ মিশ্রের সঙ্গে কমল পান্ডে কথা বললেন।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় দল যাইহোক, মতাদর্শ যাইহোক রাজধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা কিন্তু আজও মূল্যবান।
আর আজ বিজেপি যা করছে সেটি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান না ভোটের আগে কালি ছেটানো ? আম জনতার কাছে নেতা ও দলের ভাবমূর্তি কালিমা লিপ্ত করা ?
ইয়ে পাবলিক হ্যায় -পাবলিক সব জানতা হ্যায় !
