
‘ফ্যামিলি ম্যান’ ৩ সিরিজে, মনোজ বাজপেয়িকে যেভাবে সামনে আনা হল, তাতে তিনি যে মানুষ নন, বলতে গেলে সুপারম্যান – তা জেনে কিন্তু মোটেও দর্শকদের পুলক জাগেনি। মানুষ নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিমানবিক কাজকর্ম করলে, তার প্রতি বিশ্বাসের বদলে অবিশ্বাস জাগে। ‘ফ্যামিলি ম্যান’-এর সাম্প্রতিক সেশনে সেই ব্যাপারটাই দেখানো হয়েছে। ফলে অবাস্তব হয়ে উঠেছে ছবিটি। মনোজ বাজপেয়ীর মতো অভিনেতাও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। পরিবার নিয়ে সারা ভারত তিনি যেভাবে দৌড়ে বেড়িয়েছেন, তাও যথেষ্ট ক্লান্তির উদ্রেক করে। অযথা দীর্ঘ সব দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দর্শকের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে বাধ্য। ভারতীয় ওটিটি সিরিজগুলোর অন্যতম দুর্বলতা হল – অহেতুকভাবে টেনে বড়ো করা হয় পর্বগুলিকে এবং তার ফলে গল্পের বুনন অনেকক্ষেত্রেই হালকা হয়ে যায়। তবে সদ্য রিলিজ হওয়া ‘দিল্লি ক্রাইম’-এর তৃ্তীয় সেশন এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। প্রতিটি পর্ব অত্যন্ত যত্ন নিয়ে নির্মিত – অভিনেতাদের যোগ্য সংগত করেছে চিত্রনাট্য। দুর্দান্ত প্রেজেন্টেশন, সেই সঙ্গে ছবির মূল চরিত্র ডিসিপি বর্তিকা চতুর্বেদি চরিত্রটিকে অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন শেফালি শাহ। ২০১২ সালে ঘটা বেবি ফলক-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘দিল্লি ক্রাইম’ সেশন তিনের প্লট লেখা হয়েছে। পুরো সেশনই শিশু নিগ্রহ এবং নারী পাচারের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে গড়া। শেফালির মতোই খুব ভালো কাজ করেছেন রসিকা দুগগল। পুলিশ অফিসার নীতি সিং- এর ভূমিকায় তাঁকে ছাড়া যেন অন্য কাউকে কল্পনাও করা যায় না। ‘ফ্যামিলি ম্যান’-এর তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবের কাছাকাছি এই সিরিজ। সেই সঙ্গে সমকালের এই জ্বলন্ত সমস্যাকে যথাযথ ভাবে প্রকাশ করার জন্যেও পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য।
প্রায় একই বিষয় নিয়ে হইচই-তে এসেছে ‘অনুসন্ধান’। পরিচালক অদিতি রায়ের এই সিরিজটির চিত্রনাট্য লিখেছেন সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভশ্রী গাঙ্গুলি ভালো কাজ করছেন – সাহেব চট্টোপাধ্যায় চেনা ছকের বাইরে নেগেটিভ রোলেও নিজেকে চমৎকার মানিয়ে নিয়েছেন বটে, কিন্তু ছবিটির ক্লাইম্যাক্স একেবারেই অবাস্তব এবং এই জাতীয় ছবি করার জন্য আরও বেশি হোমওয়ার্ক করার প্রয়োজন ছিল। তবে বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে ‘অনুসন্ধান’ প্রশংসার দাবি রাখে।
নেটফ্লিক্সে ‘দ্য বিস্ট ইন মি’, একটি অসাধারণ থ্রিলার। এক লেখকের কাহিনি এই সিরিজের প্রতিপাদ্য। ইনি বেস্ট সেলার লেখক তবে সেই সঙ্গে নিজের জীবন নিয়ে জেরবার। সন্তানের দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং তার পরে, স্ত্রীর ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁদের সমকামী দাম্পত্যকে চুরমার করে দেয়। আর ভেঙেচুরে দেয় লেখকের আত্মবিশ্বাস। এই ঘটনার পরেই পাশের বাড়িতে প্রতিবেশি হিসেবে আসেন এক কুখ্যাত ধনী। এবার আরম্ভ হয় গা ছমছম করা সব ঘটনাবলি। এই সিরিজের কিছু কথোপকথন খুব গুরুত্বপূর্ণ – যেমন একজায়গায় ধনী ব্যক্তিটি, লেখককে শারীরিকভাবে চাইছেন এবং সমকামী জেনেও জিজ্ঞাসা করছেন, তিনি হেটরোসেক্সুয়াল আসঙ্গ চাইবেন কি না? লেখক জানাচ্ছেন, না। কারণ, খুব ছোটোবেলা থেকেই তিনি অনুভব করে আসছেন, মেয়েরাই তাঁকে শারীরিকভাবে উত্থান দেয়, পুরুষ নয়। কীভাবে তিনি এটা জানলেন? অনুভূতি দিয়ে। এখানে কামাতুর পুরুষ তা বিশ্বাস করেও যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। তথাপি, তিনি মেয়েটিকে ছেড়ে উঠেও যান, এবং এখানেই নাকি তাঁর পৌরুষ জিতে যায়। একেবারে আলাদা ঘরানার ছবি, ‘দ্য বিস্ট ইন মি’ – ধীর গতির বিষের মতো এর চলন – সেভাবেই এই সিরিজ আমাদের মুহ্যমান করে ফেলে।
ইদানীংকালের সেরা ওটিটি রিলিজ, ‘হোমবাউন্ড’। ভারতীয় এই ছবিটি অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে। পরিচালক নীরজ ঘাওয়ান, অসামান্য দূরদর্শিতায় ভারতবর্ষের জাত-পাত, ধর্মীয় বিভাজনের ফলে আম জনতার দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন এক হিন্দু নিম্নবর্গীয় তরুণের সঙ্গে এক মুসলমান যুবকের বন্ধুত্ব – এই ছবির গল্পের মাঝখানে। এই দুই বন্ধুর জীবনযাত্রার বাধা- বিপত্তির আসল কারণই হল – সামাজিক ছুঁৎ মার্গ, অন্ধতা, কুসংস্কার। দুর্দান্ত স্ক্রিন-প্লে – অপূর্ব অভিনয় করেছেন বিশাল জেঠোয়া, ঈশান খাট্টার। জাহ্নবী কাপুরও যথাযথ। ৯৮ তম অস্কার পুরষ্কারের জন্য ‘হোম বাউন্ড’ সেরা আন্তর্জাতিক ছবি- বিভাগে এন্ট্রি পেয়েছে। চলতি বছরে এটিই সম্ভবত সেরা ওটিটি রিলিজ।