
একসময় যখন হাওয়া বদলে পশ্চিমে যেত বাঙালি, শিমুলতলা - মধুপুর - গিরিডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যেত রাজগীরেও। আর রাজগীর মানেই তো নালন্দা দর্শন। গাড়ি আর কজন চাপত, টাঙ্গায় টগবগ আওয়াজ তুলে জয় রাইডে মিনিট চল্লিশেক দূরে সেই প্রাচীন খন্ডহর। শুধু টাঙ্গাওয়ালাদের সুদিন গিয়েছে বললে ভুল হবে, রাজগীরও আর বাঙালি ট্যুরিস্টের পছন্দের তালিকায় নেই। যাঁরা যান, তাঁরা গাড়িতে হুশ করে চলে যান নালন্দা, পথে সিলাওয়ে বিখ্যাত খাজার টানে দশ মিনিটের বিরতি। ভাল ব্যাপার হল, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও ভারত সরকারের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সৌধের তালিকাভুক্ত হওয়ার সুবাদে আর্কেওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া চমৎকারভাবে সংরক্ষণ করে নালন্দাকে। এই ঐতিহ্যশালী মহাবিহার এখন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বড় তীর্থস্থান। বিদেশী ট্যুরিস্টদের দৌলতে আশেপাশের হোটেল- রেস্তোরাঁ- স্যুভেনির শপের ব্যবসা মন্দ চলে না।তাছাড়া বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের আদি বাড়ি এই জেলায় হওয়াতে বিশেষ গুরুত্ব পায় নালন্দা।


পঞ্চম শতাব্দীতে তৈরি শিক্ষার এই পীঠস্থান সারা পৃথিবীর বিস্ময়। কেউ কেউ বলেন, এর স্থাপত্য অনুকরণ করেছে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা মহাবিহারের গর্বের পথচলা প্রায় হাজার বছরের। ৪২৭ থেকে ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দ। তখন বিহার ছিল মগধ আর রাজগীর ছিল রাজগৃহ। গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত স্থাপন করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়, যদিও প্রথাগত অর্থে একে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আপত্তি আছে ইতিহাসবিদদের একটা বড় অংশের। কারণ নালন্দা তৈরি হয়েছিল মূলত মহাযান বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়নের কেন্দ্র হিসেবে। পরবর্তীকালে অবশ্য অন্যান্য নানা বিষয় পড়ানো হত সেখানে। গণিত থেকে মহাকাশ বিজ্ঞান, ব্যাকরণ থেকে অ্যালকেমি, জ্ঞান আর গবেষণার আধার ছিল নালন্দা। ১২০০ শতাব্দীতে বখতিয়ার খিলজী মারাত্মক আক্রমণ হানেন মহাবিহারের উপর। প্রায়
ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও দু'তিনশো বছর নালন্দা তার কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছিল।

নভেম্বরের পড়ন্ত বেলায় নালন্দা মহাবিহার কমলা রোদে মাখামাখি । ৪০ টাকার টিকিট কেটে টাইম মেশিনে পিছিয়ে গেলাম হাজার দেড়েক বছর। পোড়া ইঁটের গাঁথুনি কত শত শতাব্দীর ঝড়ঝাপটা সামলে আজও কী মজবুত। ছাত্রদের হস্টেল বলুন কি খোলা আকাশের নিচে অ্যাম্ফিথিয়েটার, সে আমলে এভাবে ভাবলেন কী করে স্থপতিরা? রীতিমত আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার নিয়ম মেনে মাঝখানে বড় জায়গা ছেড়ে একপাশে শিক্ষাঙ্গন,অন্যপাশে স্তূপ। ৫৭ একর জায়গা জুড়ে এগারোটা মঠ আর ছটা মন্দির পাওয়া গেছে খনন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া তিন নম্বর মন্দির - সাতটা স্তরে বিন্যস্ত। নালন্দায় জলের কুয়ো থেকে নিকাশী ব্যবস্থা, হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়োর কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই, চীন ও তিব্বতের জ্ঞানীগুণীদের পদধূলি ধন্য নালন্দার ঐতিহ্য অনুসরণ করে ২০১০ সালে কাছেই তৈরি হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম থেকেই নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে সেই ক্যাম্পাস। অভিযোগ ওঠে আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির। কেন্দ্রীয় সরকারের ছড়ি ঘোরানোর বিরুদ্ধে সরব হন প্রথম উপাচার্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। আশার কথা, পরবর্তীকালে উন্নতির চেষ্টা চলছে। তবে এটুকু বলা যায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দূর অস্ত।