হাত গুটিয়ে রিজার্ভ ব্যাংক

মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দাম পড়তে পড়তে এখন এক ডলারের মূল্য ৯০ টাকারও বেশি।ফলে ডিজেল, ভোজ্যতেল সহ যাবতীয় পণ্যের আমদানি খরচ আরও বেড়ে যাবে, তাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। বাজারে সব কিছুর চাহিদায় প্রভাব পড়বে, ফলে উৎপাদনে কাটছাঁট হবে, নতুন নিয়োগ কমার আশঙ্কা, অর্থনীতিতে যার প্রতিক্রিয়া বলাবাহুল্য খুবই খারাপ।
আশ্চর্যের ব্যাপার,এমন ঘটনার পরেও সরকার ও রিজার্ভ ব্যাংক নিস্পৃহ। টাকার এমন বিপুল দাম পড়ার পরেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার বক্তব্য, আমরা নিজেরা ব্যবস্থা নিয়ে টাকার দাম নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি না।বাজারের গতিতে টাকার দাম ঠিক হোক।এর আগেও টাকার দাম ৮৯ হয়েও পরে ৮৪ তে উঠে এসেছিল। আমরা দেখতে চাইছি কোথায় গিয়ে থামে ।
রিজার্ভ ব্যাংকের এই হাত গুটিয়ে বসে থাকার নীতি সব থেকে বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে। কারণ ডিসেম্বরের প্রথম দিকে, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার । বিপুল এই বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় তার ভাঁড়ারে, এই পরিস্থিতিতে সেই সঞ্চয় থেকে চিরাচরিত নিয়ম,ডলার দিয়ে বাজার থেকে ডলার কিনে টাকার দাম পড়ায় নিয়ন্ত্রণ করা রিজার্ভ ব্যাংকের প্রথম কাজ। সেটা তারা করছে না। ফলে ইতিমধ্যে টাকার অবমূল্যায়ন (ডেপ্রিসিয়েশন) হয়েছে ৪.৮ শতাংশ। শুধু ডলারই নয়, বিশ্বের অন্য চার প্রধান কারেন্সি পাউন্ড-ইউরো - ইয়েনের তুলনায়, টাকার বিনিময়দর হুহু করে পড়েছে, যা গত এক বছরে সর্বাধিক।নভেম্বরে ডলারের বিনিময়দরের নিরিখে ০.৮% নেমে সর্বকালীন তলানিতে নেমেছিল টাকা। , শেষ ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮.২ শতাংশ ! তারপরেও মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য আরো কমে হয়ে গেল ৮৯.৫৪ টাকা।
সকলেই জানেন, টাকার এই পতনের পিছনে অন্যতম মূল কারণ ট্রাম্পের শুল্ক নীতি।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা দ্রুত সেরে না ফেললে, রিজ়ার্ভব্যাঙ্কের পক্ষেও টাকার পতন আটকানো শক্ত! গত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলারের বিদেশি লগ্নি এই দেশের বাজার থেকে তুলে নিয়ে চলে গেছে লগ্নিকারীরা। আরও বিদেশি লগ্নি ভারতের শেয়ার বাজার ছেড়ে চলে গেলে চলতি খাতে ঘাটতি আরো বাড়বে, তাতে টাকার দাম আরো কমবে, আশঙ্কা এমনই ।
এখন প্রশ্ন:
তাহলেও রিজার্ভ ব্যাংক এভাবে হাত গুটিয়ে বসে কেন? সর্বশক্তি দিয়ে সঞ্চয়ের ডলার দিয়ে বাজার থেকে ডলার কিনে ওপেন মার্কেট অপারেশন করে টাকার দাম আটকাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?
২ সরকার জানালো জি ডিপি ৮ % হারে বেড়েছে শেষ ত্রৈমাসিকে, তারপর আই এম এফ দিল C রেটিং, তারপরেও টাকার দাম কমল কেন? এর তাৎপর্য কি?
এই দুটি প্রশ্নের উত্তর পেতে কিছুটা গভীরে প্রবেশ করতে হবে।
ট্রাম্প টারিফ এর কুপ্রভাব শুরু হয়ে গেছে। সরকার বুঝেছে, রপ্তানিতে যে বিপুল ঘাটতি হতে চলেছে তাকে সামাল দিতে ভারত অপারগ।ফলে টাকার দামের উপর চাপ বাড়বে।দাম আরো কমবে। এটা বুঝেই দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। নিট ঘাটতি সামাল দিতে দেশের মধ্যে ব্যয় ( কনজামশন) বাড়িয়ে,বৃদ্ধির হার বাড়াতে চাইছে। দুই, ডলারের যে সঞ্চয় আছে সেটা থেকে সুদ ও নানাভাবে আয় বাড়াতে রিজার্ভ ব্যাংক যেভাবে বিনিয়োগ ,সেটা অব্যহত থাকুক, তাতে বিপুল পরিমাণে একটা বাৎসরিক ডিভিডেন্ড আসছে যা বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে খুবই কাজে লাগছে।তাই সঞ্চয় থেকে খরচ করে টাকার দাম ঠেকাতে ডলার ব্যবহার করতে চাইছে না। রিজার্ভ ব্যাংকের ভাবনায় ডলার কিনে টাকার দাম পড়ায় নিয়ন্ত্রণ করার চিরাচরিত পদ্ধতিতে সাময়িক হয়ত কিছুদিন অবমূল্যায়ন আটকে রাখা যাবে তাতে দীর্ঘমেয়াদে ফের টাকার দাম পড়বেই। তুলনায় রেপো রেট কমিয়ে সুদের হার কমিয়ে যদি অভ্যন্তরীন বাজারে চাহিদা বাড়ানো যায় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে টাকার মূল্য যাইই হোক, অর্থনীতিতে ক্ষতি হবে কম।এই জন্যেই রিজার্ভ ব্যাংক এখন মুদ্রানীতিতে জোর দিচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে সুদের হার কমিয়ে রাখতে।এভাবেই সরকারও জিডিপি রেট ঊর্ধ্বমুখী ধরে রাখতে চাইছে।
কিন্তু এইভাবে জিডিপির হারবৃদ্ধিকে সুনজরে দেখছে না আই এম এফ। কারণ,প্রাপ্ত হিসেবে দেখা গেছে, ভারতের উপর ট্রাম্পের শুল্ক বৃদ্ধিতে নতুন রপ্তানি অর্ডার বৃদ্ধির হার নেমেছে গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে। ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে শিল্পমহলের আত্মবিশ্বাস গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। গত মাসে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রের কার্যকলাপ গত ন'মাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। বিক্রি ও উৎপাদন বৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার পাশাপাশি বাজারে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।এইচএসবিসি ইন্ডিয়া ম্যানুফ্যাকচারিং পার্চেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) নভেম্বরে ৫৬.৬ পয়েন্টে নেমেছে। অক্টোবরে তা ৫৯.২ পয়েন্টে ছিল। পিএমআই সূচক ৫০ পয়েন্টের উপরে থাকলে তা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়, ফলে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে এখনও ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলেও বৃদ্ধির গতি যে কমেছে, তা স্পষ্ট।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, বা ব্রিটেনের মতো কিছু দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হলেও দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা এক প্রকার মরিয়া ভাবনা। মোদি সরকার সেটাই চেষ্টা করছে । অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকে লগ্নিপত্র, সোনা ও ডলারে রিজার্ভ ব্যাংক বিপুল পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা ( মূলত মার্কিন ডলার)খাটাচ্ছে , যাতে দেশের ঘাটতি বাজেট কমাতে বড় অংকের ডিভিডেন্ড কাজে লাগে। কিন্তু এতে অর্থনীতির মৌলিক সমস্যা মিটবে না।
নিরুপায় মোদি সরকারের এখন এটাই ভাবনা, রিজার্ভ ব্যাংককে সেটাই মেনে নিতে চাপ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাতেই রিজার্ভ ব্যাংক হাত গুটিয়ে,আর টাকার মূল্য কমছে বাধাহীন ভাবে, এর জন্য বেশি দাম চুকোতে বাধ্য হবে সাধারণ মানুষ,শিল্প মহল সকলেই।নতুন বছরে আশার বদলে অর্থনীতিতে আশঙ্কার কালো মেঘ জমেছে।বাস্তব এটাই।