
পৃথিবীর যেকোন নির্বাচনে জয় এবং পরাজয় কখনই শুধু একটি কারণের জন্য হয়না। বিবিধ কারণ নিহিত থাকে যেকোন রাজনৈতিক দলের জয় পরাজয়ের ক্ষেত্রে। সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা যাইহোক না কেন।
এবারে বিহারের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়েও প্রথমেই বলব যে, কেন নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে এনডিএ বিপুল সংখ্যক ভোটে জিতল? যে এনডিএ জোটের প্রধান শরিক বিজেপি, জেডিইউ থেকে বেশি আসন সংখ্যা গতবারের মত এবারেও পেল। অন্যদিকে কেন রাহুল গান্ধী তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বে মহাজোট কেন এরকম ভাবে করুণ ফলাফলের শিকার হলো? সেটার জন্যও একটা কারণকে দায়ী বলা চলবে না। বুফে সিস্টেমে খাওয়ার সময় যেমন বিরিয়ানিও থাকে, লুচিও থাকে আবার ভাতও থাকে। যার যেমন পছন্দ সে তেমন খায়। স্যালাডও থাকে আবার আইসক্রিমও থাকে। সেরকম বিবিধ কারণ থাকে নির্বাচন জয় পরাজয়ের অনেকটা বুফের বিভিন্ন উপাদানের মত।
কাজেই এটা বলা যাবে না যে, নীতীশ কুমার একদম নির্বাচনের মুখে মেয়েদের দশ হাজার করে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাই এনডিএ জিতল। বলা যাবে না, বিহারে এস আই আর অর্থাৎ (স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন) ভোটার তালিকার স্পেশালে নিবিড় সংশোধনের জন্যই এবার জিতল। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে, মুসলিম বিরোধী সুর বিজেপি চড়িয়েছে। বিশেষত দিল্লি বোমা বিস্ফোরণের পর দ্বিতীয়দিন ভোটের সময় পাকিস্তান বিরোধিতা, জঙ্গি বিরোধিতা। এমনকি যে জঙ্গিদেরকে ধরা হয়েছে বা আইডেন্টিফাই করা হয়েছে তাদের পরিবারের সঙ্গে বিহারের যোগসাজগ, সেখানে মিডিয়া পৌঁছে যাওয়া এসবের জন্যই বিজেপি জিতেছে এমনটা বলা যাবে না। একথা বলা যাবে না যে, উন্নয়নের জন্য জিতেছে। আবার একথাও মানতে হবে যে নীতীশ কুমারকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদপ্রার্থী ঘোষণা না করার রাজনৈতিক কৌশল। সেটাও বিজেপিকে ভোট বৈতরণী পার করতে সাহায্য করেছে।
অবশ্য নরেন্দ্র মোদি এই মুহূর্তে বিজেপির সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস। তাঁর ব্র্যান্ড ইক্যুইটি সাংঘাতিক। সেই ব্র্যান্ড ইক্যুইটি যেটাকে মোদী গ্যারান্টি যা কিনা মোদি নিজেই বলেন, সেই আশ্বাসের ওপর এখনও মানুষের ভরসা আছে। নবীন প্রজন্মের একটা বিপুলসংখ্যক ভোটার হয়েছে এবার। তারা লালুর জঙ্গলরাজ দেখেন নি। কিন্তু মোদির ওপর আস্থা রেখেছে। মোদি সুকৌশলে প্রচারের সময় বলেছেন, যে লালুর জঙ্গলরাজ নবীন প্রজন্ম দেখেনি। কিন্তু তাদের বাবা-মায়েরা দেখেছে। তিনি বাবা-মাদের অনুরোধ করেছেন, সেদিনের জঙ্গলরাজের দিনগুলোর কথা ছেলেমেয়েদের জানান। টি.এন.শেষন কীভাবে লালুপ্রসাদ যাদবের বুথ ক্যাপচারিংকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল, সেসব কাহিনি বিজেপি নেতারা জেলায় জেলায় প্রচার করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, জাতপাতের সমীকরণ এবার প্রথম বিজেপি ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে যাতে ওখানে যাদব ভোট ভাঙ্গা যায়। সেটা অনেকটা সম্ভবও হয়েছে। যাদব এবং মুসলমান ভোট যেটাকে এম.ওয়াই.(MY) ভোট বলা হয়, সেই ভোটটাকে ভাঙ্গা এত সোজা নয়। গতবারেও ভাঙ্গা যায় নি। এবারে কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে। নীতিশ কুমার এবং বিজেপি জোটের এবং রামবিলাস পাসওয়ানের পুত্র চিরাগ পাসওয়ানসহ আরও অনেকগুলি দলের যে জোট, তাদের যে ভোটব্যাঙ্ক সেটা হচ্ছে মূলতঃ ওবিসি এবং ইডিসি, অতি পিছড়েদল এইসমস্ত। সেখানে নীতীশ কুমারের কুর্মি ভোটের পরিমাণ শতকরা বাড়ল। কিন্তু অন্যান্য ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। সবমিলিয়ে এই যে, নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে এনডিএর যে ভোটব্যাঙ্ক সেটা তেজস্বী যাদব এবং রাহুল গান্ধীর মুসলমান এবং যাদব ভোটের থেকে শতকরা পরিমাণ বেশি। সেই জন্যই যে শুধু জিতেছে তা নয়। যাদব ভোটে ভাঙ্গন ধরেছে সেটা একটা ব্যাপার। এটা তো প্রথম হলো। এমনকি তেজস্বী যাদব তাঁর নিজের নির্বাচন কেন্দ্র সেখানেও হারতে হারতে জিতেছেন । এটা তো কখনও ভাবিনি যে তেজস্বী জিতবেন না হারবেন সেটা আমরা ভোট গণনার সময় আলোচনা করব। মুসলমান ভোটও ভেঙ্গেছে। অনেকে বলছেন, যে মিম(MIM) অর্থাৎ ওয়াইসি তিনি ঘোষণা করেছিলেন, মুসলমানদের একটা আলাদা পার্টি হওয়া উচিত। তারফলে মুসলমানদের আলাদা পার্টি ঘোষণা করে অনেক জায়গায় মুসলমান ভোট টেনেছেন তিনি। তিনি নিজে হয়তো আসন পাননি। কিন্তু তিনি ভোট কেটেছেন। মুসলমান ভোটও ভেঙ্গেছে।
প্রশান্ত কিশোর কিছু করতে পারলেন না। প্রশান্ত কিশোর তৃতীয় শক্তি হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। একজন ব্রাহ্মণ মুখ্যমন্ত্রী পাবে বিহার। একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল, যে নির্বাচনী বিশ্লেষক, পোলস্টার রাজনৈতিক নেতাদের উপদেশ দিতে পারেন। তারা সবসময় রাজনীতিতে সফল হলে তারাই মুখ্যমন্ত্রী হবেন এমনটা হয় না। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির পরামর্শদাতা ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তো নরেন্দ্র মোদি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। প্রশান্ত কিশোর বুদ্ধি দিয়েছেন। প্রশান্ত কিশোর নিজে এখানটায় ভুল করেছেন যে, এটা বিসমিল্লায় গলদ। কখনও উপদেষ্টাই যে রাজনীতিতে সফল হয় তা নয়। তাহলে তো ক্রীড়া সাংবাদিক তিনি সুনীল গাভাস্কারের স্কোয়ারকাট নিয়ে অনেককিছু হয়তো লিখেছেন। কিন্তু তিনি তো সুনীল গাভাস্কার হতে পারেন না। আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে পারি। আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক হতে পারি। তবে রাজনীতিতে জয়েন করে আমি যে রাজনীতিতে সফল হয়ে যাব এমনটা হয় না। পিকে নিজে নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? সেটা দেখে অনেকের মনে হয়েছিল পিকে নিজে হাওয়া ভাল বুঝছেন। পিকে সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছেন। যেটা সাধারণত পিকে করেন না। সেটা দেখেও অনেকের মনে হয়েছিল তাহলে পিকে নিজে হাওয়া ভাল বুঝছেন না। সেটাই বাস্তবে হলো। পিকে পারলেন না। এমন প্রবল পরাক্রান্ত দুটো ভোটব্যাঙ্কের লড়াই যে সেখানে তিনি নখ ফোটাতে পারলেন না। পরিস্থিতি সব উলটপালট হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি উৎসাহিত। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিও উৎসাহিত। এর পরবর্তী গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ হবে বলে তারা অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন।
এটা বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির মধ্যে যে নানান কারণে হতাশা আসছিল সেটা থেকে বিজেপি কিছুটা ওঠার চেষ্টা করবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ আর বিহার কিন্তু এক নয়। রাহুল গান্ধী, তেজস্বী যাদব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নয়।
সুতরাং যেটা বিহারে সম্ভব হয়েছে সেটা প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সম্ভব হবে এমন বলাটা কিন্তু অতি সরলীকরণ হবে।