
১৯২৫ থেকে ২০২৫। একশোটা বছর। একশোয় পা রাখলেন ঋত্বিক ঘটক। শতবর্ষের প্রেক্ষিতে সমকালীন সময় এবং সমাজের নিরিখে বিশিষ্ট পরিচালক তথা বাংলার এই দামাল, রাগী, একগুঁয়ে চিন্তাবিদের অন্তরের নীরব রক্তপাতটিকেই অনুভব করলেন বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচণ্ড রাগ, একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা, চিৎকার, হতাশা, অবসাদজনিত একগুঁয়েমি, অথচ এই অসহায়তার পায়ে সমর্পণ নয়, সংগ্রামী জেদ নিয়ে ফিরে ফিরে আসা। ট্রেনের কামরায় ডিউটিরত পুলিশকে বলছেন ‘লাথি মেরে নামাব… ঋত্বিক ঘটকের নাম শুনেছ ?’ আবার পরক্ষণেই ট্রেনের জানলা দিয়ে আপনভোলা স্মৃতির সরণি বেয়ে পদ্মা, হাওড়বিল, কাশবন, রাজশাহী, পাবনার পালতোলা নৌকা, কোজাগরীর আগের রাতের আবছা বিল, আশ্বিনের বিবাগী দ্বিপ্রহর…। ‘এদেশের কমিউনিস্টরা…! সব শালা অশিক্ষিতের দল…’ বলা মানুষটিই বসন্ত কেবিন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওয়েলিংটন হয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে হাজরার ভাঙা চেয়ার-টেবিলের প্যারাডাইস কাফেতে বসে সলিল চৌধুরী, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, তাপস সেন, মৃণাল সেনদের যখন গল্প শোনাচ্ছেন তখন সেই গল্প-বলা পরিপাট্যতা এবং সম্পূর্ণতায় এক-অসামান্য। প্রথম প্রেমের চিঠিতে সুরমা ঘটককে লিখছেন ‘মাসিক একটা আয়ের সংস্থান করা প্রথম কর্তব্য। নইলে জীবনে স্নিগ্ধতা আসবে না।’ সলিলবাবুর সহায়তায় বোম্বের ফিল্মিস্তানে একটা চাকরি পাবার পর বিমল রায়ের ‘মধুমতী’ ও হৃষিকেশবাবুর ‘মুসাফির’-এর চিত্রনাট্য লেখার ফাঁকেই সুরমা ঘটককে তিনিই লিখছেন ‘দশটা-পাঁচটা গিয়ে বসে থাকতে হবে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু পয়সার জন্য এখন চেষ্টা করা।… দেখো লক্ষ্মী, এ জীবন আমাদের নয়।…এসব ছেড়ে দেব।…এ হবে না।’ চাকরি ছেড়ে দিলেন। স্বস্তিহীন এক অস্থিতির আগুন যেন লেগেই আছে, যা থিতু হতে দেয় না। দেশভাগোত্তর এক-পদ্মা জলও বোধহয় পর্যাপ্ত ছিল না সেই আগুন নেভানোর জন্য।
এক-জীবনের দায় অনেক — তাঁর এই অনুভূতিটা ছিল বড়ো আন্তরিক। চারপাশের ঘটনাপ্রবাহের আঁচের ছোঁয়াতেই তাঁর কলম থেকে ফর্ম-নিয়ে-পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা গল্পগুলির নির্মাণ। লাভের লোভে মেতে ওঠা ‘কমরেড’ বাব্বুর বদলে যাওয়ার গল্প, আবার ধনীর গৃহিণী হয়ে ওঠা ‘শিখা’র একদা পৃথিবীর অন্নহীনদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করার মনটা হারিয়ে যাওয়ার গল্প, এছাড়াও ‘গাছটি’, ‘অয়নান্ত’--- এই গল্পগুলো আসলে ভবা’র সেই সীমাহীন অ-স্বস্তি, অস্থিতি, ছটফটানির শুরুর ক্ষেত্র প্রস্তূত করেছিল। থিয়েটার ছিল আক্ষরিক অর্থেই সেই ক্ষেত্রে বীজধান। কিছুসংখ্যক পাঠকের গল্প পড়া, তারপর তাদের গভীরে সেই গল্পের নাড়া লাগা, সে বড়ো সময়ের ব্যাপার। এর চেয়ে হাজার মানুষের মনে immediate reaction সম্ভব নাট্যপ্রযোজনার মাধ্যমে। এই যে মাধ্যম থেকে মাধ্যমে সুইচ ওভার, তা নেহাতই খ্যাতিমানদের তালিকাভুক্ত হওয়ার বাসনা থেকে নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে সৃজনশীল বক্তব্য পৌঁছে দেবার জ্বলন্ত খিদের থেকেই। হ্যাঁ, বক্তব্য। কোনো সরলরৈখিক গল্প নয়। সময়ের সত্য বক্তব্য। গল্পের যুগ যে শেষ হয়ে আসছে তা ঋত্বিক ঘটক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সেই গত শতকের ছয়ের দশকেই। বিচ্ছিন্নভাবে ছিন্নমূল মানুষের বক্তব্যও শুধু নয়, একটা গল্পে একটা মঞ্চে একটা ফ্রেমে এক বাংলার বক্তব্য, এক বাংলার সাংস্কৃতিক বক্তব্য। এক বাংলা, বাংলার আবার এপার ওপার হয় নাকি ? এই প্রত্যয়ী ধারণা প্রতিষ্ঠা করবার জন্যই আপাত গন্তব্যহীন মনে হলেও গল্প, থিয়েটার, সিনেমা, একটার থেকে আরেকটা মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটকের পা ফেলা ছিল এক-স্থির লক্ষ্যেরই ঋত্বিক-যাত্রা। এই চলন একশো শতাংশই শিল্পীসুলভ, গতানুগতিক পথের তোয়াক্কা না-করা এক-বিদ্রোহী শিল্পীসত্তার প্রকাশ, নিঃসন্দেহে এক-ক্রান্তদর্শীর সময়োপযোগী সাবলীল পদক্ষেপ। থিয়েটার নামক মধ্যবর্তী স্টেশনটিতে ঋত্বিক ঘটকের সেই অস্থিতিশীল সত্তাটিরই তুমুল প্রকাশ। পরবর্তী যাত্রাপথের পদে পদে যে দ্রোহের সংকেত, তা প্রাথমিক রূপ পায় এই পথ-মঞ্চনাটকেই, সত্য ইতিহাসের চোখে চোখ রেখে প্রশ্নে প্রশ্নে দেশকালকে সজাগ করবার এবং নিজেকে রক্তাক্ত করবার যে বিদ্রোহী রক্তের কল্লোল, তার অনুরণনের শুরু এই স্টেশনটিতেই।
সেই বালকবয়সে বালীগঞ্জ গভর্নমেন্টে চন্দ্রগুপ্ততে চাণক্য থেকে শুরু করে বাড়ির ছাদে বা কারও বাগানে টিনের তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ, অতঃপর রাজশাহীর পাবলিক লাইব্রেরিতে ছাত্রজীবনে (১৯৪২-৪৩) ‘অচলায়তন’, ‘ডাকঘর’, ‘পরিত্রাণ’, ‘বিসর্জন’, ‘ফাল্গুনী এবং ‘রাজা’র উষ্ণতা হৃদয়ে নিয়ে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে স্নাতকোত্তর করতে কলকাতায় এসে গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়েছিলেন। নাট্যজীবনপ্রবাহ বয়ে চলল বীরু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঢেউ’, পানুপালের ‘ভাঙাবন্দর’, ‘ভোটের ভেট’, ‘ঠাকুরের বিসর্জন’, প্র না বি’র অনুবাদে(পরে ঋত্বিকবাবু নিজেই এটির অনুবাদ করেন) ‘অফিসার’ পার করে করে। ‘অফিসার’-এর তুমুল জনপ্রিয়তায় মাসে বাহান্নটি শো করতে হয়েছিল, যাতে ঋত্বিক ঘটকের অভিনয় নিঃসন্দেহে উল্লেখনীয় ছিল। শহরের থিয়েটারমহলে রীতিমতো সাড়া জাগিয়েছিল ‘বিসর্জন’-এ তাঁর রঘুপতি চরিত্রে অভিনয়। অভিনয় করেছেন শ্রীরঙ্গমে উৎপল দত্তের নির্দেশনায় ‘ম্যাকবেথ’-এও। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অভিনয় করেন নাট্যচক্রের ‘নীলদর্পণ’ এবং শম্ভু মিত্রের ‘নবান্ন’-তেও(তখনও বহুরূপী নামকরণ হয়নি)। ‘নবান্ন’-ই তাঁর নাট্যজীবনযাপনকে অনেক বেশি সচেতন, বিস্ময়াভিভূত এবং সুদৃঢ় করে দেয়। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও প্রতীয়মান সেই কাঁটাতারের রক্তের ছোপ, পদ্মাপারের জনপদের স্মৃতিমেদুরতায় সংবেদনশীল মনের অস্থিরতা। সমসাময়িক বিদগ্ধজনেদের আন্তরিক এবং তির্যক মন্তব্যে যার প্রমাণ মেলে। যেমন বিজনবাবুর বয়ান : ‘একটা ডিমিনিক ক্রিমিনালিটি, একটা ম্যাসোকিজম ওকে পেয়ে বসেছিল।’ আবার উৎপল দত্তের মন্তব্যটি ছিল এরকম ‘ঋত্বিক যখন বাঙালি কৃষকের ভূমিকায় অভিনয় করত, তখন তার ধরণটা ছিল আইজেনস্টাইনের আলেকজান্ডার নেভস্কি ও আইভান’র চেরকাসভের অভিনয়ের অনুসারী। সেই ব্রড বিগ এগজ্যাজেরেটেড জেশচার্স, শরীর দুমড়ে, ঘাড় বেঁকিয়ে, হাত ছুঁড়ে অভিনয়, যা এখানকার পরিস্থিতিতে মানাত না।’ কিন্তু মানুষটির নাম ঋত্বিক ঘটক, এক ক্লান্তিহীন সত্তা, শিল্পীসুলভ দুর্বিনীত ব্যাবহারের অহংকারে মত্ত এক-বেপরোয়া স্রষ্টা, রাজেশ খান্নার মতো স্টারের অফারও যিনি অবলীলায় প্রত্যখ্যান করে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিতে পারেন স্ক্রিপ্ট। তাঁর মনে সমূহ সমালোচনা বা অভিজ্ঞান, কোনোকিছুই খুব একটা মানে রাখতে পারে না। আর সেজন্যই ‘ফেলে আসা গ্রাম, নদী, আর্কিটাইপাল চরিত্র, এসব নিয়ে থিয়েটার হয় না’ তাপস সেনের এ-হেন মন্তব্য সত্ত্বেও ‘খড়ির গণ্ডি’ এবং ‘গ্যালিলেও’-র অনুবাদ ব্যতিরেকে মাত্র যে পাঁচটি মৌলিক নাটক লিখেছেন ঋত্বিক ঘটক, বারবার তাতে তিনি উপজীব্য করেছেন সমকালীন সময় এবং সমাজের নিরিখে তাঁর অন্তরের নীরব রক্তপাতটিকেই — ‘বাংলারে কাটিবারে পারিছ, কিন্তু দিলটাকে কাটিবারে পার নাই!’ ‘জ্বালা’, ‘দলিল’, ‘সাঁকো’, ‘জ্বলন্ত’ এবং ‘সেই মেয়ে’। ‘দলিল’ প্রথমে লিখতে শুরু করলেও ‘জ্বালা’-ই তাঁর লেখা প্রথম নাটক। তৎকালীন পার্টি সেক্রেটারি পি সি যোশী শহরে ঘটা একত্রিশটি স্যুইসাইডের ভয়াবহ ঘটনা অ্যাজ এ করেসপন্ডেন্ট ঋত্বিক ঘটককে রিপোর্ট করতে বলেছিলেন। ‘স্যুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ শিরোনামে পাঠানো সেই রিপোর্ট নিয়ে যথেষ্ট প্রশংসা এবং চর্চা হয়েছিল। কিন্তু এটুকুতেই ঋত্বিকবাবুর রাগ-ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। তাঁর করা রিপোর্টে থেকে ছ’টি স্যুইসাইডের ঘটনার চরিত্রকে বেছে নিয়ে লিখলেন ‘জ্বালা’। তাঁর নিজেরই বয়ান ‘ ইচ ওয়ান ইজ এ ট্রু ক্যারেক্টার। ‘জ্বালা’ ইজ এ ডকুমেন্টারি।’ নাটকটিতে ঋত্বিকবাবু স্বয়ং অভিনয় করেছিলেন। বেতার নাট্য হিসেবে সেটি খুবই জনপ্রিয় হয়। বাংলা ছাড়াও অনুদিত হয় হিন্দিতে, এবং পাটনা ও দিল্লি রেডিওতেও সম্প্রচারিত হয়। সমাজ-অর্থনীতির কুটিল ঘেরাটোপে জর্জরিত মানুষের জীবনে অনিবার্য মৃত্যুর হাতছানির মধ্যেও নাটকে জীবনকেই জয়ী করেন নাটককার ঋত্বিক। একদিকে চরম প্রতিকূলতা অন্যদিকে তুমুল ইচ্ছাশক্তিকে নিয়ে নিয়তির অভিমুখে বহতা পদ্মাকে ঘিরে যে ঘাত-প্রতিঘাতের ঘটনাপ্রবাহ, তা-ই ‘দলিল’ নাটকটির উপজীব্য বিষয়। গণনাট্য সংঘের সেন্ট্রাল স্কোয়াডের এই প্রযোজনা ২০৬ সার্কুলার রোডে ভূপতি নন্দীর বাড়িতে প্রথম অভিনীত হয়। পদ্মার ভূমিকায় ছিলেন তৃপ্তি মিত্র। নাটকটি ১৯৫৩-তে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। অপ্রতিরোধ্য পদ্মা-স্রোতের মতো ‘দলিল’-এর চলন যেন অগণিত ওপার বাংলার মানুষের ঘটি-বাটি-চাটি হারিয়ে নিয়তিনির্ভর পথে বেঁচে থাকবার তুমুল স্পৃহাকে শুধু সম্বল করে চলারই জীবনছবি। ‘সাঁকো’ — দেশভাগ এবং সাম্প্রদায়িক রক্তক্ষয়ের মর্মন্তুদ পরিণতিকে মঞ্চে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জীবন্ত করেছে এই নির্মাণ।
দুই বাংলার ভাগাভাগি নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের আজীবনের সংবেদনশীল মাতামাতির বিষয়ে কেউ তির্যক মন্তব্য করলেই জবাব দিতেন : ‘মাতামাতি ! বাংলাকে ভেঙে চুরমার করে দিল, আর
মাতামাতি ! বিক্ষুদ্ধ সময়ে মুজরো করব ?’ বাংলাভাগ তাঁর মনোভূমিকে যেভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে, সেই যন্ত্রণাকে পরম ভালোবাসায় তিনি লালনপালন করেছেন। সেই অবিরাম রক্তপাত তাঁকে ভারাক্রান্ত করতে পারেনি, শুধু ছুটিয়েই চলেছে। হৃদয়গ্রন্থির বিমূর্ত এক-সুতোর টানে যেন একটি বাঁধনের বেঁধে রাখতে চেয়েছেন দুই বাংলাকে চিরটাকাল, আঁকড়ে থেকেছেন এপার-ওপার নয়, এক অখণ্ড বাংলার লোকায়ত ঐশ্বর্যকে। দেখাতে চেয়েছেন তা এক গল্পে, এক মঞ্চে, এক ফ্রেমে। হিন্দু মুসলিম নয়, মানুষ মারছে মানুষকে এ ছিল তাঁর কাছে অসহনীয়। তাই সব শেষে তাঁর হৃদয়োৎসারিত সম্প্রীতি ও ঐক্যের আলোতেই ধুয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন মানবধর্মের বার্তা, জীবনের জয়গানে অনুরণিত সভ্যতার যাত্রা।
এরপর তেরো বছর অনেক ওঠনপড়ন। 'অন দ্য কালচারাল ফ্রন্ট' নামক প্রস্তাবনায় পার্টিলাইনের অন্তঃসারশূন্য সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনাকে দ্বিধাহীন ভাষায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সম্ভাব্য পরিণতির পরোয়া না-করেই। তেইশটি চার্জ, ওয়ান ম্যান প্রমোদ দাশগুপ্ত কমিশন, পার্টি-আই পি টি এ সবাই ঋত্বিক ঘটকের বিরুদ্ধে… ফল ? এক্সপেলড্। কমিউনিস্ট পার্টি তথা গণনাট্য সংঘের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি। এরপরেও বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি সংগ্রামী মানসিকতায়। এরই মধ্যে মুক্তি পায় ‘অযান্ত্রিক’, আসমূদ্রহিমাচলের সিনেমামহলের শ্রদ্ধার নজরে আসেন ঋত্বিক ঘটক। দীর্ঘসময় নাট্যজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর ১৯৭৫-এ তাঁর পরবর্তী প্রযোজনা ‘জ্বলন্ত’। বিষ্ণুপ্রিয়া নামক সিনেমার চিত্রনাট্য থেকেই এই নাট্যনির্মাণ। দেশের সেই উত্তাল সময়ে তৈরি-হওয়া মস্তানরাজের শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ এক-নিষ্পাপ মেয়ের কাহিনি ‘জ্বলন্ত’। প্রাচীতীর্থের প্রযোজনায় নাটকটি একাডেমিতে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৭৫ এর ১৪ আগস্ট। সংগীত, ডিজাইন, লাইট, ডিরেকশন সবেতেই ঋত্বিক ঘটক স্বয়ং। শেষ মৌলিক নাটক ‘সেই মেয়ে’। কলকাতার গোবরা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন দিন পাঁচেকের মধ্যে লেখা এই নাটকের অভিনয় হয় সেখানকার চিকিৎসাধীন রোগীদের নিয়েই। সেই নাটকের একটি গানের কথা ও সুর করেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। নাটকটির এক ডাক্তার-চরিত্রের সংলাপে ঋত্বিকের প্রত্যয়ী জীবনবোধের ছাপ স্পষ্ট — ‘মানুষ ব্যথা পায়, কষ্ট পায়, তরঙ্গে তরঙ্গে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ভাবে মৃত্যু এল বুঝি। কিন্তু মৃত্যুর ছদ্মবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে নবজীবন… সব জন্মই তো তাই।’ এই সংলাপেই নিহিত ঋত্বিকের স্বরচিত ‘মানুষ তোমাকে ভালোবাসি।/ এইভাবে,/পৃথিবীর ইতিহাস বারবার/ বদলে গেছে,/ তবুও মানুষ, সবসময় বেঁচেছে। মানুষ, তোমাকে ভালোবাসি।’ সংখ্যার নিরিখে সমসাময়িক অন্যান্য নাটককারদের তুলনায় ঋত্বিকের মৌলিক নাটক অনেক অনেক কম হলেও 'জ্বালা' থেকে 'সেই মেয়ে' --- এই দীর্ঘকালীন নাট্যপথচলার তথা সামগ্রীক ভাবে একজন কমিউনিস্ট শিল্পীসত্তার আসল শক্তি হল ওই 'মানুষ, তোমাকে ভালোবাসি'ই। লক্ষ লক্ষ মানুষের বাংলাভাগজনিত যন্ত্রণা যেন একার বুকে বহন-করে-চলা এই মানুষটির বাংলা থিয়েটারে অবদান সামান্য-সাধারণ না কি অসামান্য-অসাধারণ, তর্কসাপেক্ষে সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ না-করেই এই নিবন্ধের লেখক হিসেবে আমার দ্বিধাহীন ঘোষণা ‘বাংলা থিয়েটারে ঋত্বিক ঘটকের অবদানকে অগ্রাহ্য করা যায় না।’ কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর অনুশাসনে বাধাপ্রাপ্ত-হওয়া শিল্পীর স্বাধীন সত্তা এবং জীবনের একটা ব্যাপক সময়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলার পথের অনুকূলে না-থাকা সত্বেও যা দিয়ে গিয়েছেন ঋত্বিক ঘটক, তাকে অসাধ্য সাধন বললে অতিরঞ্জন হবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
গণনাট্য সংঘে যোগদানের পূর্বেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানসিকতার একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট ঋত্বিক ঘটক আরেক প্রবীণ প্রথিতযশা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর সত্যের জোরেই বলেছিলেন ‘আমি কোনোদিন কালচারালি বিট্রে করিনি’। তাই একজন সামান্য অভিনয়শ্রমিক হিসেবে আমারও প্রত্যয়— আমার মতো বহু অভীষ্ট লক্ষ্য পেরিয়েও কল্পনাতীত কোনো এক-অলোকপ্রভার দিশা মিলতে পারে এ-জীবনেই, যদি এটা হৃদয়ে রাখি যে, আমাদের একজন ঋত্বিক আছেন, যিনি পাশ্চাত্যের নয় আমাদের প্রাচ্যেরই রবীন্দ্রানুসারী।