তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
দুর্গা: শক্তিরূপে চিরন্তন আলোকসত্তা

                  যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, /নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।

                                                — দেবী-মাহাত্ম্যম, মার্কণ্ডেয় পুরাণ

দুর্গা মানে শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি ভয়ংকর নয়, মাতৃময়। তাঁর ক্রোধে আছে করুণা, তাঁর যুদ্ধে আছে শান্তির বীজ...   রাত যত গাঢ় হয়, প্রভাত তত কাছে আসে। অন্ধকারের অন্তরালেই জন্ম নেয় আলোর প্রতিশ্রুতি। সেই আলোর প্রতিমূর্তি হলেন দেবী দুর্গা—যিনি একাধারে মা, যোদ্ধা ও চিরন্তন শক্তি। তিনি কেবল দেবতাদের আরাধ্যা নন, তিনি সমস্ত জগতের অন্তর্গত প্রাণস্পন্দন। মানুষের মধ্যে যতটুকু সাহস, প্রতিবাদ, মমতা—সবই তাঁরই বিস্তার। মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী-মাহাত্ম্যম বা চণ্ডী দেবীর তিন মহারূপের কথা বলা হয়েছে— ১.মহাকালী — সময়ের বিনাশ ও পুনর্জন্মের শক্তি, ২.মহালক্ষ্মী — ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি ও ন্যায়ের প্রতীক, ৩.মহাসরস্বতী — জ্ঞান, আলো ও চেতনার প্রতীক। শাস্ত্র অনুযায়ী, এই যে তিনটি রূপ, এই তিনটি মিলিয়েই তৈরি হয় এক অবিচ্ছিন্ন ত্রিবেণী—সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। লক্ষ্য করা যাক,চণ্ডীতে দেবতারা যখন অসুরদের দ্বারা পরাভূত, তখন তাঁদের সম্মিলিত তেজ থেকে যে আলোর রেখা ধীরে ধীরে আকার নেয়, সেটিই রূপ নেয় মহামায়া দুর্গায়। বলা হয়েছে, ‘তাসাং তেজঃসম্ভবতা দেবী ত্রৈলোক্যপূজিতা।’ অর্থাৎ তিনি তখন কেবল দেবতাদের রক্ষাকর্ত্রী নন, তিনি নিজেই ব্রহ্মাণ্ডের রক্ষাশক্তি। এক কথায় রক্ষয়িত্রী। তন্ত্রশাস্ত্র বলে ‘শিবঃ শক্ত্যাযুক্তো যদি ভবতি শক্তঃ প্রভবিতুম,/ ন চেদেবং দেবো ন খলু কুশলঃ স্পন্দিতুমপি।’ (তন্ত্রসার) অর্থাৎ—শক্তি ব্যতীত শিবও স্থবির, নিষ্প্রাণ। শক্তি হল গতি, প্রাণ, সৃষ্টির প্রবাহ। দেবী দুর্গা হলেন  সেই চেতনা, যিনি শিবের ধ্যানস্থ নৈঃশব্দকে প্রাণের ভাষা দেন। শিব নিস্তব্ধ, দুর্গা গতিশীল; শিব ধ্যান, দুর্গা প্রেরণা। এই দুইয়ের সংলগ্নতাতেই সৃষ্টি টিকে আছে। চণ্ডীতে দেবী যখন মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, তখন সেটি কেবল এক পৌরাণিক যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধ মানুষের মনের মধ্যে চলা শাশ্বত সংগ্রামের প্রতীক  --- এ প্রতীক ভয় ও সাহসের, অন্ধকার ও আলোর, মায়া ও মুক্তির মধ্যে শাশ্বত সংগ্রামের। শাস্ত্রে দেবী ত্রিনেত্রা, দশভুজা, সিংহবাহিনী— তাঁর প্রত্যেক অস্ত্র এক একটি তত্ত্ব, এক একটি প্রতীক। ত্রিশূল মানে ত্রিকালজ্ঞান, চক্র মানে চেতনার গতি, খড়্গ মানে সংকল্পের তীব্রতা, পদ্ম মানে করুণার নরম স্পর্শ। এই সমস্ত রূপ মিলেই গড়ে ওঠেন আমাদের দেবী দুর্গা— এক অনন্ত শক্তি, যিনি মন্দকে বিনাশ করে নতুন আলোর সূচনা করেন। এবার বলার যে, এই যে দেবী দুর্গা ইনি কেবল পুরাণের দেবী নন,  আমাদের প্রতিদিনের নারীও বটে,  যিনি সংসারের ক্লান্তিতে অবিচল, যিনি প্রতিদিন হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসেন নিজের শক্তিতে। যে নারী নিঃশব্দে পরিবারের ভার বহন করে, আবার প্রয়োজন হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করে—সেই নারীই দুর্গা। অতএব, প্রতিটি মায়ের মুখে, প্রতিটি শ্রমজীবী নারীর ঘামে, প্রতিটি কন্যার চোখের দীপ্তিতে—দুর্গা জেগে আছেন। তিনি আর মূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন, তিনি আমাদের রক্তে, শ্বাসে, স্বপ্নে।  কুমোর যে মাটি কেটে গড়ে তোলেন মূর্তি, সেই মাটি তো আসে সমাজের আঙিনা থেকে— পথের ধুলো, ঘরের মাটি, মাঠের মেঠো ঘ্রাণ—সব মিলেই দেবীর দেহ। অতএব দুর্গা কেবল দেবী নন, তিনি আমাদেরই রক্তমাংসে নিহিত শক্তির প্রতীক। আজকের সমাজে তাই ‘দুর্গা’ মানে কেবল দেবী দশভূজা নন। তিনি প্রতিবাদের কণ্ঠ, প্রতিরোধের আগুন, আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। যে নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, যে যুবক অন্ধকারে থেকেও আলো খোঁজে, যে মানুষ পরাজয়ের পরেও আবার উঠে দাঁড়ায়—সেই প্রতিটি মানুষই দুর্গার সন্তান। এই সময়ের দুর্গা তাই মন্দিরে বন্দি নন, তিনি অফিসে, মাঠে, রাজপথে, শ্রেণিকক্ষে— যেখানে লড়াই আছে, সেখানে আছেন তিনি। যিনি কাঁদতে জানেন, অথচ ভাঙতে জানেন না— তিনিই আধুনিক দুর্গা। দুর্গা মানে শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি ভয়ংকর নয়, মাতৃময়। তাঁর ক্রোধে আছে করুণা, তাঁর যুদ্ধে আছে শান্তির বীজ। তাই তো চণ্ডীর শেষে দেবতারা তাঁকে বলেন—‘সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে,/ শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমো’স্তুতে।’ লক্ষ্য করতে হবে, এই মন্ত্রে তিনি কিন্তু কেবল বিনাশিনী নন, তিনি আশ্রয়দাত্রী ; তিনি সেই শক্তি, যা ধ্বংসের মধ্য দিয়েই নবসৃষ্টির জন্ম দেয়। বছরের এই কদিন, যখন ঢাকের শব্দে বাতাস কাঁপে, যখন নদীর ধারে কাশফুল দুলে ওঠে, তখন আমরা কেবল উৎসব করি না—আমরা আমাদের শক্তিকে স্মরণ করি। মৃন্ময়ী দুর্গাকে প্রতিষ্ঠা করে আসলে আমরা নিজের অন্তরের মহাশক্তিকেই আহ্বান জানাই। অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়া মানে তাই কেবল প্রার্থনা নয়, এ যেন এক আত্মসমর্পণ— নিজের ভয়ের সামনে মাথা নত করা, আর তারপর সেই ভয়কে জয় করা। বিজয়ার দিনে যখন প্রতিমা বিসর্জন হয়, তখন আসলে মাটি ফেরে মাটিতে, কিন্তু শক্তি থেকে যায় আমাদের ভেতরে। দেবী ফিরে যান, কিন্তু রেখে যান আলোর সেই কণা, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অন্ধকারে চিরজাগরূক হয়ে থাকার জিনিস। দুর্গা মানে তাই আলো। আলো মানে বেঁচে থাকা, ভালোবাসা, লড়াই। তিনি সেই অনন্ত, যিনি প্রতিটি প্রজন্মে, প্রতিটি ভাষায়, প্রতিটি দেহে নতুন করে জন্ম নেন। দুর্গা কেবল পুরাণের কাহিনি নয়, তিনি মানবমনের পরম প্রতিশ্রুতি— যতদিন অন্ধকার থাকবে, ততদিন আলোর জন্ম হবে, আর সেই আলোই দুর্গা—শক্তিরূপে, চিরন্তন, অপরাজেয়।

Scroll to Top