
১১ অক্টোবর আবার এল একটি আন্তর্জাতিক শিশুকন্যা দিবস। অথচ সারা পৃথিবীর শিশুকন্যারা আক্রান্ত। ভালো নেই তারা। বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও-এর স্লোগানের ফ্লেক্স-এর আড়ালে মুখ লুকোচ্ছে এই সত্য, যে, ভারতের বুকে আজ বালিকারা কেউ সুরক্ষিত নয়। বালিকাদের দিকে ধেয়ে আসছে ত্রিফলা আক্রমণ। এক, অশিক্ষা, দুই, বাল্যবিবাহ আর তিন, যৌন আক্রমণ।
প্রতিটি রাজ্যে লাফিয়ে বাড়ছে অশিক্ষা ও অকালে বিবাহ। বাল্যবিবাহের আইনগুলি গোলানো। তাই, আইনি ফাঁক গলে শুধু নয়, বাড়ির অমতে রিল ও শর্টস দেখে, স্মার্ট ফোনের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করছে অজস্র মেয়ে। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটা রীতিমতো ভয় ধরানো। আঠারোর নিচের বালিকারা অনেকেই বাড়িতে বড়ো কাকামামাদাদাদের কাছেও যৌন নির্যাতিত, তারাই পালিয়ে বিয়ে করে নিচ্ছে সমবয়সীদের অথবা বয়সে বড়ো কোনো পুরুষকে, মোহাবিষ্ট হয়ে। সেই মোহের বশে তারা পাচারও হয়ে যাচ্ছে হিল্লিদিল্লিদুবাই।
তবে যৌন নির্যাতনের তালিকায় শুধু বালিকারাই নয়, বালকেরাও আছে।
যৌন আক্রমণের জন্য রয়েছে নতুন এক আইন। পকসো। যা ১৬ অনূর্ধ্ব বালক বালিকা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। ২০২৪ এর পরিসংখ্যান বলছে, দেশ জুড়ে ৭৫০ টি ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট , যার ভেতরে ৪০৮ টি শুধুমাত্র পকসোর জন্য রচিত, বিচার করেছে তিন লক্ষ প্রায় শিশু নির্যাতন কেসের। তার মধ্যে প্রায় দু লাখ কেস পকসোর অধীনে রেজিস্টারড হয়েছিল।
এই হল সেই সব কেস, যেগুলি রিপোর্টেড হয়েছিল। ২০১২ সালে রূপায়িত হয় পকসো অ্যাক্ট। জেন্ডার নির্বিশেষে শিশুদের যৌন সুরক্ষা দেবার আইন। প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট।
অথচ এইসব আইনের প্রয়োগের পথে আজো বাধা আমাদের মানসিকতা বা মাইন্ডসেট ! ২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ভারতের এক আদালত, মুম্বই হাই কোর্ট , একটি মামলায় এক বয়স্ক ব্যক্তিকে একটি বালিকা কন্যার নিগ্রহের ব্যাপারে পকসো আইনের একটি ধারা প্রয়োগ করতে গিয়ে থতোমতো খেলেন। প্রশ্ন তুললেন, জামাকাপড়ের ওপর থেকে কি যৌন নিগ্রহ হয় নাকি ? বরঞ্চ দেওয়া যাক ওটাকে 'নারী অবমাননা’-র তকমা। তাতে যা শাস্তি তা সহনীয়। পকসোর শাস্তি কড়া, তিন বছরের জেল। কেন বাপু। এই যে , ত্বকের সঙ্গে ত্বকের সংযোগ হল না, পেয়ারা খাওয়াবার লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে জামাকাপড় পরা অবস্থায় বুক ছোঁয়া হল, এতে তো শাস্ত্রমতে যৌননিগ্রহ হচ্ছে না বাপু।
দেশ জোড়া তুমুল প্রতিবাদ, প্রায় ঝড় বয়ে গেল আমাদের মতো অনেকের মনে। আমরা, যারা শিশুবয়সের থেকে জানি, কাকে বলে যৌন নিগ্রহ। এ মোর দুর্ভাগা দেশ, পাঁচ , ছয় , সাত বছরের অবুঝ বয়সে জেনেছিলাম বাড়িতে কাজের লোক বা দূর সম্পর্কের আত্মীয় কুটুমের নোংরা স্পর্শ, অথবা বাসে ট্রামে সিনেমা হলে বারোয়ারি পুজোয় রাস্তায় বা রবীন্দ্র সদনের টয়লেটের কাছটায় অযাচিত নোংরা স্পর্শ, পুরুষের ।
শেষমেশ ওই রায় স্থগিত। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে। আর তার দিন কয়েক পরেই , ৪ ফেব্রুয়ারিতেই, সংবাদ পত্র খুলেই কাহিনি । নির্মম সে কাহিনি সবিস্তারে পড়তে পারলাম না। চা বিস্কুট উঠে আসছিল। কলকাতার জোড়াবাগানে মামার বাড়িতে বেড়াতে আসা এক নয় বছরের বালিকা খুন। যৌন নির্যাতনের পরে খুন। কেননা সে জানত না অল্প চেনা পুরুষের কী থাকে চাওয়ার, ছাতের সিঁড়িতে নিয়ে যায় যে জন্য। প্রতিবাদ করলে, চেঁচিয়ে উঠলে , কাঁদলে প্রাপ্য হয় গলা টিপে বা পিটিয়ে মৃত্যু। সেদিনই আবার ছত্তিশগড়ে পেলাম আরেক খুনের গল্প। একই কাহিনির এদিক ওদিক। মেয়েটিকে ধর্ষণ করা ও মেয়েটি ও তার আত্মীয়দের মেরে ফেলার গল্প।
হ্যাঁ এখন সব গল্প কথাই।
সাধারণ যৌন হেনস্থা, নির্যাতন বা ধর্ষণের ধারাগুলি আদালতে শিশুদের বাড়তি নির্যাতনের কারণ হয়ে উঠছে বলেই পকসো এসেছিল কিন্তু। মনে করে দেখুন নিজেদের কিশোর বয়স। স্কুলে যাওয়া আসার পথে ট্রেনে বাসে যারা নির্যাতন করেছিল, তারা জামা সরিয়ে টেপেনি, কারণ সে অবকাশ ছিল না৷ তার মানে সেগুলো যৌন নির্যাতন ছিল না ?
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বজায় আছে ৩৫৪র মতো ধোঁয়াশাযুক্ত আইন যা 'মডেস্টি অফ উইমেন' ধরনের প্রাগৈতিহাসিক ভাষা ব্যবহার করে। একটা বারো বছরের মেয়ে, যাকে পেয়ারার লোভ দেখিয়েই অন্তরালে যৌন উৎপীড়নের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে 'মডেস্টি'-র কী বোঝে ? সে কেন এই বার্তা পেল না একটা উচ্চ আদালত থেকে, যে, টেপাটেপি দূরস্থান, তার বুকে হাত দেওয়াও জামিন-অযোগ্য অপরাধ?
পরিসংখ্যান বলছে সারা ভারতের ৫৩% শিশু, কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। আর শুধু কন্যাশিশু নয়। বালিকাদের প্রায় সমান সংখ্যক বালকও নির্যাতিত হয় কখনো না কখনো। শিশুরা কতটা আদৌ সংরক্ষিত ইশকুলের মতো একটা চৌহদ্দিতে, সে প্রশ্নও তো উঠে গেছে।
যা যা চাইতে পারি তেমন একটা উইশলিস্ট করি বরং।
১। সবাইকে, জনে জনে, বিজ্ঞাপিত করে জানানো হোক, পকসো-র কথা। যা আমরা অনেকেই জানি না। বেশিদিন নয়, এই তো, ২০১২ তেই আইনে পরিণত হয়েছে পকসো - ‘প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন এগেন্সট সেক্সুয়াল অফেন্সেস’। আইনটি নতুন বলেই এখনো অনেকেরই জানা পর্যন্ত নেই এই আইনের পরিধি ও প্রয়োগ। অথচ এ আইন আনাই হয়েছিল আগেকার ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা ভারতীয় দণ্ডবিধির কিছু সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে। একটা সীমাবদ্ধতা অবশ্যই ছিল এই , যে, দণ্ডবিধির যেসব ধারায় বিচার চাওয়া যেত সেগুলো বেশিরভাগই শিশুকন্যাদের জন্য প্রযোজ্য এবং চিরাচরিত ধর্ষণের সংজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নতুন আইনে, শিশুপুত্রদেরও অত্যাচারিত শিশুর আওতায় আনা হয়েছে, আর যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞার আওতায় নানা ধরনের বিকৃতকাম ব্যবহারকেও আনা হয়েছে।
২। পকসো-র নাগালে যে কোনো অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হোক। যাতে মানুষ রিপোর্ট করতে ভয় না পান, মানুষ এগিয়ে আসেন বিচার চাইতে। যেমন আমার ছোটোবেলায় যে সব নির্যাতন চলে যেত ফিসফিস করে বলা নিষিদ্ধ গসিপের আওতায়, আজ তা সর্বসমক্ষে আনছেন শিশু ( কন্যা বা পুত্র) দের বাবা মায়েরাই। এটা একটা সদর্থক দিক। অনেকেই বলছেন, এই তো ! যত বেশি আইন হচ্ছে ততই বাড়ছে অপরাধও ! এটা ভুল, আসলে, আমার তো মনে হয়, অপরাধ বাড়ছে না, আগেও এইসব অপরাধ সংঘটিত হয়েই চলত। আজ, অপরাধগুলো সামনে আসছে মাত্র। আশৈশবের অভিজ্ঞতায়, কত যে ঘটনা মনে পড়ে যায় , যেখানে কোনো না কোনো শিশুকে দেখেছি মারাত্মকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে। আমাদের দেশের কথা এ নয়, সারা পৃথিবীতে পিডোফিলিয়া নামক মানসিক বিকারের ভূরি ভূরি নিদর্শন তো আছেই। বিকৃতকাম কিছু মানুষের কাছে নরম , রোমহীন, কচি মাংসগুলি বেশি আকর্ষক।
৩। ইস্কুল হোক বা যে কোনো পাবলিক প্লেস, যেমন পার্ক বা ময়দান বা বাজার-শপিংমল-সিনেমাহল-অডিটোরিয়াম... কোথাও কোনো অন্ধকার টয়লেট এরিয়া করিডোর বা হলঘরের বাতি নেবার পরবর্তী নির্জনতা… এসবের সুযোগে কেউ কোনো অপকর্ম করামাত্র, তাকে এক্সপোজ করা বা ধরিয়ে দেবার জন্য, ছোটোরা নিজেরা সমর্থ না-ই হতে পারে। সেই সুযোগটা নিয়েই তো অপকর্মটি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বড়োদের সচেতনতা বাড়ার অসম্ভব প্রয়োজন।
৪। এখানেই আসি চতুর্থ ও সবচেয়ে বড়ো চাহিদাটায়। ডিনায়াল বা অস্বীকার আমাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। স্কুলের নাম খারাপ হবে তাই প্রিন্সিপাল বললেন, বাচ্চাটা বোধ হয় মিথ্যে বলেছে, প্রমাণ দেখান। সংস্থার নাম খারাপ হবে তাই সি ই ও বললেন, ওটা ছোটো ঘটনা। রাজ্যের প্রধানেরাও মাঝেমধ্যে একই কাজ করেন। এখনই এগিয়ে এসে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে।