
বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী ! কিন্তু সত্যিই লক্ষ্মী আসবেন কি ?
কী রাজ্যে কী কেন্দ্রে সর্বত্রই লক্ষ্মী আসার বদলে এখন আশঙ্কা, ভাঁড়ে মা ভবানী হয়ে না যায় ! বছর ঘোরার আগেই অর্থনীতিতে চাপ আসতে চলেছে, ইঙ্গিত অন্তত তো তেমনই। মা দুর্গা ফিরেছেন এবার দোলায়, জ্যোতিষ বিচারে তার অর্থ মহামারী বা মড়ক আসার আশঙ্কা। জ্যোতিষ কতটা সত্যি কথা বলে জানি না, তবে অর্থনীতির আকাশে ঈশান কোণে মেঘ ! মমতা কিংবা মোদি যতই নিজের ঢোল নিজেরাই পেটান, বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়ছে এবং আরও বাড়ার আশঙ্কা।
২০২৫-এর পুরাণ কথায় নির্ঘাত অসুর একজনই, তিনি ট্রাম্প। মার্কিন অধীশ্বর মানেই দুনিয়ার চালক ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চলে আসা নিজেদেরই তৈরি নিয়মের খোল নলচে ফেলে দিয়ে উল্টো গাওনা গাইছেন ট্রাম্প। ফলে মার্কিন ভরকেন্দ্রিক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা বেসামাল ! প্রবল ধাক্কা ভারতের রপ্তানির ক্ষেত্রে, সংকুচিত হচ্ছে দেশের বৃদ্ধির হার !' বন্ধু ' ট্রাম্প পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধ চালানোর পিছনে রুশ তেল কেনায় মোদীর হাত দেখছেন, তাই সবক শেখাতে ভারতের পণ্যে চাপিয়ে দিয়েছেন অতিরিক্ত ২৫% শাস্তি শুল্ক ! মোট ৫০ শতাংশ আমদানি মাশুলের গুঁতো সামাল দিতে মোদি রাতারাতি দেশে জি এস টি কমাতে বাধ্য হলেন, নইলে তাঁদের রপ্তানি সহ দেশের শিল্প উৎপাদন ও মুদ্রার মূল্যে আঘাত আসবে, কোষাগারে লোকসান করেই জি এস টি কমালেন, কিন্তু তাতে হল কী ? টাকার দাম তো কমছেই। এদেশে লগ্নিকারী বিদেশি পুঁজি দ্রুত হারে পুঁজি তুলে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এদিকে ঘরোয়া বাজারে ব্যাপারীদের উপর ডবল চাপ ! ঘরে তো পুরোনো মাল মজুত রয়েছে, তার কী হবে ? ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে পুরোনো দামের পণ্য ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ পর্যন্ত বিক্রির অনুমতি দেওয়া হল, তাতে বাড়ছে কি চাহিদা ? খরিদ্দার জেনে গেছে জিএস টি কমেছে,তাই দাম কমে তাঁরা পণ্য চাইছেন। গাড়ি ইলেক্ট্রনিক্স আর কিছু ভোগ্যপণ্য শিল্পে দাম কমায় সাময়িক চাহিদা বেড়েছে পুজোর মরশুমে, কিন্তু চাকরির বাজারে নিয়োগ না বাড়লে এসব সাময়িক রামধনু কতক্ষণ ? নতুন ক্রেতা না বাজারে এলে নতুন চাহিদা স্থায়ী হিসেবে বাড়ে না। কিন্তু নতুন ক্রেতা কোথায় তৈরি হবে ? সেখানেই তো আসল গেরো। গাড়ি ও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংক সহজেই খুচরো ঋণ দেয়। ফলে সাময়িক চাহিদা তৈরি করা গেছে। বিক্রি বেড়েছে এই পুজোয়। কিন্তু মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। বৃদ্ধির হার যদি বাড়াতেই হয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা বাড়লে চলবে না। ভারতীয় অর্থনীতির সমস্যা এইখানেই। এটা জানে শিল্প মহলও। তাই ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নগদ জমিয়ে রেখেও লগ্নি করছে না বেসরকারি পুঁজি। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ভূ-রাজনৈতিক কারণে আরও বেড়েছে। এদেশের শিল্প বাণিজ্য মহলে লগ্নি গুটিয়ে রয়েছে, ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রী , তাতেও হেলদোল নেই। জি এস টি কমিয়ে দেবার পর সত্যিকারে সুফল আসবে তখনই যদি শিল্প বাণিজ্য মহল লগ্নি বাড়ায়। এদেশে জিডিপি বাড়ার পিছনে এখনো পর্যন্ত অন্যতম বড়ো কারণ গত চার পাঁচ বছর ধরে উচ্চহারে লাগাতার সরকারের মূলধনী লগ্নি ঘটেছে ,তুলনায় বেসরকারি লগ্নির হার ১৯.৮% মাত্র। ফলে নতুন চাকরি হচ্ছে কম, ফলে নতুন ক্রেতাও বাড়ছে কম, স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায় 'লক্ষ্মী'-ও আসছেন কম।
এদিকে জিএসটি কমে যাওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে তার ধাক্কা পড়বে। কোষাগারে জি এস টি বাবদ প্রাপ্তি কম আসবে । পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু মোট উৎপাদন এমনিতেই প্রতি বছর কমছে। কমতে কমতে দেওয়াল ছুঁতে চলেছে। আগে এই রাজ্যের সঙ্গে তুলনা হত মহারাষ্ট্রের, এখন বাংলার স্থান নিয়েছে তামিলনাড়ু। কর্ণাটক গুজরাট তো দূর অস্ত, বিহার অসমেরও পিছনে বাংলা, সাম্প্রতিক হিসেবে জানা গেল, মহারাষ্ট্রের মতো অন্য শিল্পোন্নত রাজ্যে যেখানে AI নিয়ে নতুন হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, তখন ৬৮৮০ টা শিল্প সংস্থা এ রাজ্য ছেড়ে গেছে। পরিণাম ? এরাজ্যের দল দল যুবক রোজ চলেছে ভিন রাজ্যে, তো সে নির্মাণ শ্রমিক হোক আর ইঞ্জিনিয়ার বা তথ্য প্রযুক্তি শিল্প - হসপিটালিটি কর্মী হোক। মা লক্ষ্মী আর কি করে এরাজ্যে আসবেন ? তাঁকে তো আর ভাতা দিলে হবে না !