
পুরুলিয়ার পথে মাথায় ভূত এল টুকটুক করে ৷ ফট করে নেমে পড়লাম বিকনা গ্রামে ৷ অন্য নাম ডোকরা গ্রাম ৷ ন দশটি পরিবার নিয়ে একটি গ্রাম ৷ ছেলে বুড়ো এমনকি বাড়ির যুবতী বউও এখানে ডোকরা মূর্তি গড়ে ৷ বউটিই প্রথম ডাকল ৷ সে নিজেই এক বাচ্চা ...তার ওপর কোলে নিয়েছে সদ্যজাত ৷ পাঁচ মাস হল সে বাচ্চা বিকনা গ্রামের হয়েছে ৷ বউটিই মূর্তিগুলো সাজিয়ে দিচ্ছিল ৷ তার পাশে তার শাশুড়ি ননদ ৷ একটা পালকি পছন্দ করলাম ৷ বাঙালির পালকি নয় ৷ সাহেবরা বিশেষ করে পর্তুগিজরা একসময় গ্রাম থেকে গ্রাম যেত পালকি চড়ে ৷ সে পালকির গঠন বেশ আলাদা ৷ চৌকোর বদলে নিটোল ডিম ৷ দাম জিজ্ঞেস করতে বউটি খুব চড়া একটা দাম বলল ৷ চড়া মানে অস্বাভাবিক চড়া ৷ চলে যেতে গিয়েও বারবার ফিরছিলাম শ্বেতমানবের যানের কাছে ৷ বউ বোধহয় বুঝতে পেরেছিল আমার ভীষণ পছন্দ ওই পালকি ৷ আমার লোভ তাকে লোভী করল ৷ কী আশ্চর্য দেখুন ! নদীর মতো লোভও কেমন এঁকেবেঁকে ছড়ায় ! স্পষ্ট বুঝলাম তার চোখ হাসছে ! হাসতে হাসতেই বলল ..
দাম কমাব না ৷ নেবে নাও ...নাহলে যাও অন্য দোকান ৷ এটি পাবে না ৷
হঠাৎ কেমন রাগ হল ৷ লোভ ছেড়ে অন্য দোকানে গেলাম ৷ সেখানে এক বৃদ্ধা সরস্বতী গড়েছেন। ডোকরার মূর্তিতে এমন ভাষাময় চোখ আমি আগে দেখিনি ৷ পালকির চারগুণ দাম মূর্তির ৷ কিন্তু ন্যায্য দাম ৷ কিনে নিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি কেমন অস্বস্তি হল ৷ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম বউটা ৷ দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে ৷ দুটো ড্যাবা চোখ আমার সরস্বতী দেখছে ! ঠোঁট টিপে রয়েছে ৷ বোধহয় বুঝতে পারেনি এতবার নিতে চেয়েও শেষমেশ তার পালকি ছেড়ে দেব !

অত ভিড়ে তাকে কী ভীষণ একা লাগছিল ! জগতবিচ্ছিন্ন ৷ হৃদয় অনেকসময় অন্যায্যের মোহে পড়ে ! নাকি সে মুহূর্তে বউটির বেশি দাম চাওয়ার পিছনের গল্পটা সামনে আসছিল , বলতে পারি না ৷
গাড়ি ছাড়ার পর মনে পড়ল , প্রায় কুড়ি মিনিট তার দোকানে দরদাম করেছি ৷ দাম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসেও পড়েছি ৷ একটি মুহূর্তের জন্যও তাকে শাশুড়ি ননদ ছাড়া একা দেখিনি। আবার একটি মুহূর্তের জন্য তার কোলের বাচ্চাটাকেও কেউ নেয়নি ৷ বউয়ের একহাতে পর্তুগিজের পালকি তো আর এক হাত বাচ্চা আঁকড়ে ৷
নীরব গল্প দেরীতে শোনা যায় রে খুকী ...
সদ্য কেনা ধাতুমূর্তিটি আমার কানে কানে বলল ৷
যতীন মাহাতো আজ আমার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি এল ৷
বারডি গ্রামের বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করব বলে আসছিলাম ৷ রাতে থাকবও পলাশবনীতে ৷ এখানের বাচ্চারা পলাশের মালা গেঁথে পয়সা রোজগার করে ৷ একটা টিলার ওপর বসে মালা গাঁথছিল ন দশ বাচ্চা ৷ বসন্তের দুপুরে পুরুলিয়ার রোদ সাংঘাতিক ৷ আমাদের গাড়ি দেখে সব কটা বাচ্চা স্লিপ কেটে নীচে ৷ নিজেদের গাঁথা মালা নিজেরাই গলায় পরে হাসছে ...
লাও ...ফটো তোল রে ...দশ বাচ্চার হাতে দশ করে মোট একশত টাকা দিবি ৷
বুঝলাম শহরের ফটোক বাবুদিগের মহান কীর্তি ৷ দারিদ্র্য পিকরাইজেশনের জন্য এখন মালা গলায় ভুখা বাচ্চার পোজ সিলেক্ট করেছে এরা ৷ এখন এ পোস্ট বেশ ক বছর চলবে ৷
যতীন অবশ্য তখনই বাচ্চাদের শাসন করে দিল ৷
মালা গাথ্যে টাকা নে ৷ নিজের মালা নিজে পরে লাচলে উকে আনন্দ বলে ৷ আনন্দের পয়সা কী রে ! নিজেদের লোক বিরোধিতা করছে দেখে বাচ্চারা চুপ ৷ এই ফাঁকে যতীন বলল ...
বারডি যাচ্ছ ? আমাকে লিয়ে চল ৷ পথ দেখাব ৷
সারাটা পথ কত কথা যতীনের ..
আমি যতীন মাহাতো ৷ পারমেন্ট রেল স্টাফ ৷ পোস্টিং হাতিয়া ৷ এখন আর আদ্রা স্টেশনের কোনো মার্কেট নেই ৷ হাতিয়া খুব বড় স্টেশন হয়ে গেছে ৷
মাহাতোর গায়ের বুনো গন্ধ ..আগুনে পলাশ সব কিছু আজ বড়ো তৃপ্তি দিচ্ছিল ! জিজ্ঞেস করলাম বারডিতে কে থাকে ৷
শাশুড়ি শুধু ৷ বারুডি শ্বশুরবাড়ি আমার ৷
আমি বললাম - বউকে আনতে যাচ্ছেন ?
হেসে কূল পায় না যতীন ..
বউ তো বরের কাছে থাকে ৷ বারডি শ্বশুরবাড়ি ৷ বুড়ির দেখ্যাশুনো করতে হয় ৷ শাশুড়ি জানে আমি পারমেন্ট রেল স্টাফ ৷ আমার কাছে দাবিদাওয়া আছে তার ...
বারডি আসতেই ঝপ করে নেমে গেল যতীন ৷ এতক্ষণ তার সঙ্গে বকবক করলাম ,তাকে জল খাওয়ালাম খুব বেশি খেয়াল ছিল না লোকটার ৷ ধন্যবাদও জানাল না ৷
এরা রোদে তপ্ত মানুষকে যানে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম মনে করে ৷
বেশ করে ৷
পিছন থেকে দেখছিলাম এক মাথা কালো চুল আর হদ্দকালো শরীরের লোকটা কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ছে ৷ আসলে রোগা শরীরে দ্রুত দৌড়কে দূর থেকে কাঁপন দেখায় ৷
তাও চেঁচালাম ...
আজই ফিরবেন বউয়ের কাছে ? হাতিয়াতে আপনার নিজের বাড়ি তো ....!
নয় যতীন উত্তর দেয়নি ৷
নয় আমি শুনিনি ৷
ছবি : অতনু ঘোষ