
না। এ পাড়ায় শ্রাবণের চিহ্ন নেই। বাইশ বলে, বিদায় বলাও নেই। আছে অনেকদিন বাদে দেখা ঝলমলে রোদের দর্শন। ইদানীং বাইশ তারিখ মেঘ সব ছুটি নেই। আলো ওঠে মিলিয়ে যেতে থাকা মেঘের ওপাড় থেকে। যতই সে যাওয়ার কথা বলুক, মেঘ অবশ্য থাকে। রোদ্দুরের আনাচে কানাচে সে থাকে দুষ্টু শিশুর মতো। সেবার, ২২শে শ্রাবণের দিন, সকালে রোদ্দুর উঠেছে দেখে, এই ক’দিনের জমা জামাকাপড় ওয়াশিং মেশিনে দেওয়া হল। ভেজা দিনে, কাপড় শোকায় না বলে, জমেছেও অনেক। সারা বর্ষাকাল, বারান্দা ভ’রে থাকে কদমরেণুতে। আমাদের ঘরের সামনে কদম গাছের সারি। কদমের কুঁড়ি আর ফুল আসর জমায় খুব। রাতের শিশিরে রোদ পড়ে ঝলমল করে সকালে। সকালে আজকাল রাগ হয়। ঘুম পায়। পরপর চা-কফি খেতে খেতে এক সময় চোখ জ্বালা করে। ঘুম বেশি করে পায়। রাতের সিম্ফনিতেও রবি ঠাকুর উপস্থিত - আষাঢ়ের গান বাজে পরপর। লেখার টেবিল থেকে উঠে দেখি, শ্রাবণও শেষের দিকে। বাইশের ধারে কাছে বিষাদের পর্দা ছেয়ে থাকে, অথচ রোদ দেখে, পাড়ার জলসায় লোক হয় খুব। সাদা শাড়ি, কালো/ নীল/ হলুদ/ বাদামি নক্সাকাটা – মন্দির পাড়ের মেয়েরা যায় – যায় সাদা পাঞ্জাবি ও জিন্স।
আজ ২২শে শ্রাবণ, ১৪৩২ । তিন দিন বাদে মেঘ কাটল। মেঘের অভ্যাস কাটানো শক্ত। তার ওপর আমার রোদ্দুর ভালো লাগে না।
আষাঢ় চলে গেছে ২১দিন আগে। আর বৃষ্টি গতকাল – পরশু – তার আগের দিন। পেছোতে পেছোতে দেখি, বাদলের দিন ছিল সবই প্রায়।
আজ নাকি কড়া রোদে সবাই ভেজা বেড কভার শুকিয়ে নেবে ভেবেছিল।
আমরা যারা কোনোদিন শ্রাবণ মাসের ২২ তারিখে বোলপুর যাইনি। নিমতলা যাইনি। আপিস গেছি শুধু – তারা আজ ঘরে ঘরে গাছ সাজিয়েছি। কাচের পুরনো শিশি থেকে কুয়াশা মুছে, এঁকেছি মাছ – পুতুল আর অনেক অনেক ঝাউগাছ। আলপনা দিতে পারি না বলে, গীতবিতানের শব্দ তুলে এঁকে দিয়েছি বোতলের দেওয়ালে। দূরের পাড়ার মাইকে যখন কবিতা বলে গেছে বাচ্চারা, ধূপ জ্বেলেছি আমরা। সামনের চায়ের দোকানের নীল প্লাস্টিকের ছাওনির তলে, রেডিও বাজছে আজ। অথবা ইউ টিউবও হতে পারে। মোট কথা, গান হচ্ছে খুব। অস্ত রবির দিন, ধীরে ধীরে মনে করাচ্ছে – আসলে কবির মৃত্যু নেই।
মনে করাচ্ছে, বাইশে শ্রাবণ, আমাদের বারান্দায় যে গাছের শিশু থাকে, সেই 'ছোটু' গাছের মাথা দোলানোর দিন। গত কয়েক দিন বড্ড ভেজাভিজি করে ফেলেছে সে। এসবের মধ্যে বৈশাখ চলে গেছে বলে সে আবার ভুলে টুপিও খুলে রেখেছিল। আমাদের কন্যার সঙ্গে তার দোস্তি দেখে – হাসছে ফুলদল। তারপর , তারা ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেলেছে বেখেয়ালে। দুজনেই। দুজনেই প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে রং মশাল নিয়ে খেলা করছে আজকাল। আজকাল তারা চরকির গল্প জানছে – হইহই করে পড়ছে সহজপাঠ, শিশু ভোলানাথ । জানছে, রবি ঠাকুর নামের জোব্বাপরা ‘মানুষ’টি আসলে কিন্তু ‘ঠাকুর’। ছোটোদের কথা থাক!
আজ মহীরূহের কথা হোক। তারপর হল কী, হালকা অন্ধকার নেমে এল আবার। সেই রাজন্য ও চির-প্রণম্য ‘ঠাকুর’-এর বিদায় তিথিতে দুপুরে ঘনিয়ে এল মেঘ। অস্তাচলে গেলেন দিন-মণি। মধ্যাহ্নের রোদ্দুর নিভে এল। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম আমরা। ছাদ থেকে নামিয়ে আনা হল, বস্ত্রের স্তূপ। বাতাস বইতে লাগল হেমন্তের ধর্ম মেনে। বর্ষা যে কীভাবে রং বদলাতে পারে, দেখিয়ে দেয় বাইশে শ্রাবণ। একটি দিনে, যেন একশো দিনের সমাবেশ বসে।- এক বাদলে, হাজার ঋতুর আনাগোনা -। এক রাজার যাওয়া যেন অসংখ্য মৃত্যুর একত্র প্রস্থান। এ কেবল, রবি ঠাকুরেরে ম্যাজিক। এ কেবল ২২শে শ্রাবণের ঘোষণা পত্র।
‘আজ ২২শে শ্রাবণ।‘
আজ সব চারা গাছেদের কান্না শেখার দিন।“ – এই লেখা পর কেটে গেছে সাত-সাতটা বছর। বয়েস বাড়ছে যত, তত দেখি রবি ঠাকুর ঘনিয়ে আসছেন। সকাল শুরু হয় তাঁর গানে – কথায় কথায় ভেসে যায় ফাল্গুন থেকে অগ্রহায়ণ। মাঝের শ্রাবণটুকু আমরা সাজিয়ে নিই। বাইশকে বাদ দিই – ২৫শে বৈশাখের গল্পে, ২২শের জায়গা রাখা ঠিক কি ?